Industrial Development

টাটার ন্যানোর পর সিঙ্গুরে অশোক লেল্যান্ড! শিল্প ফেরার আশায় নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন সিঙ্গুরবাসী

টাটার ন্যানো কারখানা ঘিরে বিতর্ক ও আন্দোলনের প্রায় ২০ বছর পর সিঙ্গুরে নতুন করে শিল্পের সম্ভাবনা। ভারী বাণিজ্যিক গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থা অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে কারখানা গড়ার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে বলে জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

সিঙ্গুরে শিল্প তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
নিজস্ব সংবাদদাতা, সিঙ্গুর
  • শেষ আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ ০৭:০২

দীর্ঘ ২০ বছরের অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে? সিঙ্গুরে কি এবার ফিরতে চলেছে শিল্প? টাটার ন্যানো কারখানা ঘিরে যে জমিতে একসময় শিল্পের স্বপ্ন দেখেছিলেন এলাকার মানুষ, সেখানেই নতুন করে শিল্পের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ভারী বাণিজ্যিক গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থা অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে সিঙ্গুরে কারখানা গড়ার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে বলে জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার নিউটাউনে রাজ্যের নতুন শিল্পনীতি ঘোষণার পর এই কথা জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার পরই নতুন করে আশার আলো দেখছেন সিঙ্গুরবাসী।

২০০৬ সালে টাটার এক লক্ষ টাকার ন্যানো গাড়ি তৈরির কারখানা গড়তে সিঙ্গুরে প্রায় ৯৯৭ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল তৎকালীন বাম সরকার। ১৮৯৪ সালের জমি অধিগ্রহণ আইন মেনে এই প্রক্রিয়া শুরু হলেও জমি দেওয়া নিয়ে তৈরি হয় তীব্র বিরোধ। কৃষিজমি অধিগ্রহণের প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জমিদাতাদের একাংশ কারখানার পক্ষে থাকলেও অন্য একাংশ জমি দিতে রাজি ছিলেন না। তাঁদের নিয়েই এগিয়ে চলে আন্দোলন।

অনিচ্ছুক কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন ক্রমশ জোরদার হয়। ২০০৮ সালে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের ধারে টানা অবস্থান ও ধরনা শুরু করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রায় ৪০০ একর জমি ফেরানোর দাবিতে আন্দোলনকারীরা পথে নামেন। বিভিন্ন সংগঠনও এই আন্দোলনে সামিল হয়। পরিস্থিতি একাধিকবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের জেরে সিঙ্গুর থেকে কারখানা সরিয়ে গুজরাটের সানন্দে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় টাটা গোষ্ঠী।

সিঙ্গুর আন্দোলন এবং নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন রাজ্যের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। এরপর ২০১৬ সালে সিঙ্গুর জমি অধিগ্রহণ মামলায় ঐতিহাসিক রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট। আদালত জানায়, অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া আইনসম্মত ছিল না। জমি কৃষকদের ফিরিয়ে দিতে হবে এবং যাঁরা ক্ষতিপূরণ পাননি, তাঁদেরও প্রাপ্য অর্থ দিতে হবে। সেই নির্দেশ মেনে কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দেয় রাজ্য সরকার।

কিন্তু জমি ফেরত পেলেও সিঙ্গুরের শিল্প ও কৃষি—কোনও সম্ভাবনাই সেভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। গোপালনগর, বাজেমেলিয়া, খাসেরভেড়ি, বেরাবেড়ি ও সিংহেরভেড়ি—এই পাঁচটি মৌজার বিস্তীর্ণ জমির বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে অনাবাদি অবস্থায় পড়ে রয়েছে। একসময় যাঁরা জমি দিতে চাননি, তাঁদের একাংশও এখন এলাকায় শিল্প স্থাপনের পক্ষে। অন্যদিকে, যাঁরা কারখানার আশায় স্বেচ্ছায় জমি দিয়েছিলেন, তাঁদের প্রত্যাশাও এখনও পূরণ হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা ঘিরে সিঙ্গুরে নতুন করে শিল্পের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের আশা, এবার অন্তত এলাকায় বড় শিল্প গড়ে উঠবে। শুধু কর্মসংস্থান নয়, শিল্পকে কেন্দ্র করে এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিকাঠামোরও উন্নতি হবে। বদল আসবে বহু পরিবারের আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে।

টাটার কারখানা হলে যাঁদের সেখানে কাজ পাওয়ার কথা ছিল, তাঁদের অনেকেই প্রশিক্ষণ নিয়েও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাননি। দুই দশক পেরিয়ে যাওয়ায় তাঁদের অনেকের পক্ষেই নতুন করে সেই সুযোগ পাওয়া কঠিন। তবে স্থানীয় তরুণ- তরুণীদের জন্য নতুন শিল্পে কর্মসংস্থানের দরজা খুলতে পারে বলে আশা করছেন বাসিন্দারা।

২০০৬ সালে যে শিল্পের স্বপ্নকে ঘিরে সিঙ্গুরে এত বিতর্ক ও আন্দোলন হয়েছিল, ২০ বছর পর সেই শিল্পের সম্ভাবনাই আবার সামনে। তবে প্রাথমিক আলোচনা থেকে বাস্তবে কারখানা তৈরি পর্যন্ত পথ এখনও বাকি। আপাতত অশোক লেল্যান্ডকে ঘিরে নতুন আশায় বুক বাঁধছেন সিঙ্গুরবাসী।


Share