Shoot Out

পুরনো শত্রুতার জের? বাবার খুনের চার বছর পর টার্গেট ছেলেকেও, গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে লাগল স্কুল পড়ুয়ার বুকে

পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, ছাত্রকে নয়, তার সঙ্গীকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছিল। পুরনো গ্যাং-শত্রুতার যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র
নিজস্ব সংবাদদাতা, খড়্গপুর
  • শেষ আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ১০:১১

রেলশহর খড়্গপুরে ফের প্রকাশ্যে গুলি চালানোর ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বুধবার সকালে ওল্ড সেটেলমেন্ট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে দ্বাদশ শ্রেণির এক ছাত্র। অক্ষয় ঝা নামে ওই ১৫ বছরের ছাত্রকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে খড়্গপুর মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে কলকাতায় পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে খবর, অক্ষয় খড়্গপুর পুরসভার ২০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তাঁর বাবা একজন রেলকর্মী। বুধবার সকাল ১১টা নাগাদ বন্ধু সাগর প্রসাদের স্কুটিতে চেপে একটি দোকানে অক্ষয় নাস্তা করতে যাচ্ছিল। ওল্ড সেটেলমেন্ট এলাকায় রেলের একটি অনুষ্ঠান ভবনের পিছনের গলি দিয়ে যাওয়ার সময় আচমকাই স্কুটিতে থাকা অক্ষয় রাস্তায় পড়ে যায়। প্রথমে বন্ধু বিষয়টি বুঝতে পারেনি। পরে স্কুটি থামিয়ে তিনি স্থানীয়দের সাহায্যে বন্ধুকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। তখনই জানা যায়, অক্ষয়ের বুকের বাঁ দিকে গুলি লেগেছে।

কিন্তু কেন এক স্কুলছাত্রকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হল? তদন্তে নেমে পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, অক্ষয়কে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়নি। আততায়ীদের আসল নিশানায় ছিল তার বন্ধু সাগর প্রসাদ। আর সেখান থেকেই তদন্তে উঠে আসছে খড়্গপুরের পুরনো গ্যাং-শত্রুতার প্রসঙ্গ।

সাগরের বাবা ভেঙ্কট প্রসাদ রাও। ২০২২ সালের ২৭ জুন রাত ১০টা নাগাদ তাঁকে গুলি করে খুন করা হয়েছিল। তিনি জমির কারবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই খুনের ঘটনার সঙ্গে খড়্গপুরের পুরনো মাফিয়া গোষ্ঠীর বিবাদের যোগ রয়েছে বলে পুলিশের অনুমান। এবার সাগরকে লক্ষ্য করেই হামলা হয়েছিল কি না, তা তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন।

ঘটনার পর সাগর জানিয়েছেন, প্রতিদিনই তিনি অক্ষয়কে সঙ্গে নিয়ে নাস্তা করতে বেরোন। বুধবারও দু’জনে একসঙ্গে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু আচমকাই বন্ধুর শরীরে গুলি লাগে।

পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, সাগরের বাবা ভেঙ্কটের সঙ্গে একসময় ‘রেলমাফিয়া’ হিসেবে পরিচিত শ্রীনু নাইডুর ঘনিষ্ঠতা ছিল। খড়্গপুরে রেলের ছাঁট লোহার কারবারে নব্বইয়ের দশকে বাসব রামবাবুর প্রভাব ছিল। খুনের মামলায় যাবজ্জীবন সাজা পেয়ে সে জেলে যাওয়ার পর শ্রীনু নাইডুর উত্থান ঘটে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।

২০১৭ সালে খড়্গপুরের নিউ সেটেলমেন্ট এলাকার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে গুলিবিদ্ধ হয়ে শ্রীনু খুন হয়। সেই সময় তার বয়স ছিল ২৯ বছর। অন্যদিকে, ২০২২ সালে খুন হওয়া ভেঙ্কট প্রসাদ রাওয়ের হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তরা এখনও জেলে রয়েছে। ভেঙ্কটের খুনে শ্রীনু-বিরোধী ‘শুভ গ্যাং’-এর সদস্যদের নামও উঠে এসেছিল বলে পুলিশ সূত্রে খবর।

তদন্তকারীদের অনুমান, পুরনো সেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের রেশ থেকেই বুধবারের হামলা হয়ে থাকতে পারে। পাশাপাশি জমি সংক্রান্ত কোনও বিবাদ ছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, বুধবার আততায়ীরা পরপর দু’টি গুলি চালায়। প্রথম গুলিটি কারও গায়ে লাগেনি। দ্বিতীয় গুলিটি গিয়ে লাগে স্কুটির পিছনে থাকা অক্ষয়ের বুকের বাঁ দিকে।

ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েক জনকে আটক করেছে পুলিশ। প্রথমে পাঁচ জনকে আটক করা হয়। পরে আরও দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। একজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে বলেও পুলিশ সূত্রে খবর। ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা বলেন, ‘‘একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছে খড়্গপুরে। এক ছাত্র গুলিবিদ্ধ হয়েছে। চিকিৎসার জন্য তাকে কলকাতায় পাঠানো হয়েছে।’’

পুলিশ সুপার জানান, প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে পুরনো দুই গোষ্ঠীর শত্রুতার জেরেই এই ঘটনা ঘটতে পারে। যাদের নাম তদন্তে উঠে আসছে, তাদের খোঁজে তল্লাশি শুরু হয়েছে। খড়্গপুর শহরের বাইরে অভিযুক্তরা যাতে পালিয়ে যেতে না পারে, সে জন্যও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

একসময় মাফিয়া-দ্বন্দ্বের জন্য বারবার খবরের শিরোনামে আসা খড়্গপুরে সাম্প্রতিক সময়ে সেই ধরনের ঘটনা কিছুটা কমেছিল। কিন্তু ফের প্রকাশ্যে গুলি চালানোর ঘটনায় পুরনো গ্যাং-দ্বন্দ্বের ছায়াই দেখছেন তদন্তকারীরা। এখন প্রশ্ন, বুধবারের হামলার আসল নিশানা কি সত্যিই সাগরই ছিলেন? সেই উত্তরই খুঁজছে পুলিশ।


Share