Nepal Flash Flood

‘চালক এক মুহূর্তও দেরি করেননি’, নেপালে হড়পা বান আছড়ে পড়ার ঠিক আগে ঘুরিয়ে নেওয়া হয় বাস, অভিজ্ঞতার কথা জানালেন বসিরহাটের দম্পতি

শনিবার পোদ্দার দম্পতি তাঁদের দলের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে নেপালের বিরাটনগর থেকে বিহারের রক্সৌল পৌঁছোন। সেখান থেকে তাঁরা মিথিলা এক্সপ্রেসে ওঠেন। রবিবার ভোরে তাঁদের হাওড়া স্টেশনে পৌঁছনোর কথা রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

পোদ্দার দম্পতি।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬ ০৬:৫৬

বাসচালকের এক মুহূর্তের সিদ্ধান্তে প্রাণে বাঁচলেন পশ্চিমবঙ্গের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও তাঁর স্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, তিব্বতের উদ্দেশে যাওয়ার পথে নেপালের কেরুং সীমান্তে আচমকা হড়পা বান নেমে আসায় ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়েছিলেন তাঁরা। বাসের চালককে তিনি ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

বুধবার সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ নেপালের অভিবাসন কেন্দ্রে পৌঁছনোর প্রায় এক ঘণ্টা আগে বাস থামিয়ে দেন চালক। হড়পা বান নামার কথা জানতে পেরে তিনি বাস নিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে অস্বীকার করেন। এরপর তাঁদের অন্য রাস্তা দিয়ে কাঠমান্ডুর দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই যে জায়গায় বাসটি থেমেছিল, সেই এলাকা জলের তোড়ে ভেসে যায় বলে ওই দম্পতি জানিয়েছেন।

৬৬ বছরের অনুকূল পোদ্দার ও তাঁর স্ত্রী রেবা পোদ্দার উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের বাসিন্দা। তাঁরা ‘চলো যাই’ নামে একটি পর্যটন সংস্থার সঙ্গে কৈলাস-মানস সরোবরের উদ্দেশে যান। গত ২১ অগস্ট কলকাতা থেকে তাঁরা রওনা দিয়েছিলেন। বুধবার তাঁদের তিব্বতে প্রবেশ করার কথা ছিল।

অনুকূল বলেন, “আমরা শুধু দেখতে পাচ্ছিলাম, নীচের গিরিখাতের দিক থেকে যেন একটা মেঘ নেমে আসছে। সঙ্গে ছিল হিসহিস শব্দ হচ্ছিল। কেরুং-এর নেপালের অভিবাসন দফতরের কী ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা নিয়ে আমাদের কোনও ধারণাই ছিল না। বাসচালক এক মুহূর্তও দেরি করেননি। অন্য রাস্তা দিয়ে সরাসরি আমাদের কাঠমান্ডু নিয়ে যান। ওই জায়গাটি থেকে কাঠমান্ডু যেতে প্রায় দু’ঘণ্টা সময় লাগে।”

কী ঘটেছিল, ভয়াবহ সেই পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি আরও জানান, কিছু ক্ষণ পর তাঁরা দেখেন স্কুলপড়ুয়া, স্থানীয় বাসিন্দা এবং গাড়ির চালকরা আতঙ্কে পাহাড়ের ওপরের দিকে ছুটছেন। অনুকূল বলেন, “সবাই ভয়ে চিৎকার করছিলেন, কাঁদতে কাঁদতে দৌড়চ্ছিলেন”।

পরে পোদ্দার দম্পতি জানতে পারেন, তাঁদেরই শহরের আর এক দম্পতি অন্য একটি দলের সঙ্গে ভ্রমণ করছিলেন। হড়পা বান আসার আগেই তাঁরা অভিবাসন কেন্দ্রে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তারপর থেকেই তাঁদের কোনও খোঁজ নেই। তাঁদের নাম স্বপন মণ্ডল ও তাঁর স্ত্রী মৌ মণ্ডল। স্বপন মন্ডল বসিরহাটেরই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তাঁরাও কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় গিয়েছিলেন। হড়পা বান নেমে আসার পর থেকে তাঁরাও নিখোঁজ বলে অনুকূল জানিয়েছেন।

স্বপন শেষবার সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ অনুকূলকে একটি ‘গুড মর্নিং’ মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিল অভিবাসন কেন্দ্রে স্ত্রীকে নিয়ে তোলা একটি ছবিও স্বপনবাবু অনুকূলবাবুকে পাঠিয়েছিলেন। তারপর থেকে তাঁদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যায়নি।

অনুকূল জানিয়েছেন, প্রতি বছর তাঁরা ‘চলো যাই’ ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে একসঙ্গে ভ্রমণ করেন। কিন্তু এ বার তাঁর পাসপোর্ট নবীকরণে দেরি হওয়ায় নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে তা জমা দিতে পারেননি। ফলে অনুকূল-রেবার সঙ্গে ‘চলো যাই’ দলটি গেলেও স্বপন মন্ডল এবং মৌ মন্ডলকে অন্য একটি এজেন্সির সঙ্গে যেতে হয়। দু’টি দলই অবশ্য গত ২১ অগস্ট রওনা দিয়েছিল। তাঁরা একই ট্রেনে যাত্রা করেছিলেন।

মঙ্গলবার কাঠমান্ডু থেকে স্বপনদের দল কেরুংয়ের উদ্দেশে রওনা দেয়। পরিকল্পনা ছিল, রাতে একটি হোটেলে থাকবেন। বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে অভিবাসন দফতরে পৌঁছোবেন। অন্য দিকে, পোদ্দার দম্পতির দল বুধবার ভোরে কাঠমান্ডু থেকে রওনা হয়ে সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ অভিবাসন দফতরে পৌঁছোনোর কথা ছিল বলে জানা গিয়েছে। স্বপনবাবুদের দল নির্ধারিত সময়েই অভিবাসন দফতরে পৌঁছে যায়। সেখান থেকেই সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ অনুকূলকে শেষবারের মতো ছবি পাঠান স্বপনবাবু। তারপর থেকেই নিখোঁজ তাঁরা।

রাজ‍্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বৃহস্পতিবার নিখোঁজের পরিবারের সঙ্গে ভবানী ভবন থেকে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন। তাঁদের সমস‍্যার কথা তিনি শুনেছেন। তিনি জানিয়েছিলেন, রাজ্যের অন্তত ৩৯ জনের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে। পরে পরিবারের সদস্য ও রাজ্য প্রশাসনের তৎপরতায় পোদ্দার দম্পতির সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। ৩৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

শনিবার পোদ্দার দম্পতি তাঁদের দলের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে নেপালের বিরাটনগর থেকে বিহারের রক্সৌল পৌঁছোন। সেখান থেকে তাঁরা মিথিলা এক্সপ্রেসে ওঠেন। রবিবার ভোরে তাঁদের হাওড়া স্টেশনে পৌঁছনোর কথা রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার ওই দম্পতি ট্রেনে করে বাড়ি ফিরছেন জানতে পেরে শুক্রবার অধিকারী রাজ‍্য পুলিশের ডিজি এবং জেলা পুলিশের সুপারকে তাঁদের জন্য বিমানের টিকিটের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে ততক্ষণে তাঁরা বিরাটনগরে পৌঁছে যাওয়ায় ট্রেনেই ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। বিমানে ফিরতে হলে তাঁদের ফের ৩০০ কিলোমিটার কাঠমান্ডু যেতে হত।

অনুকূল-রেবার ছেলে সত্যকী পোদ্দার নিউ টাউনে থাকেন। তিনি বলেন, “আমরা চাই না, ওঁরা কিছুদিন একা থাকুন। এখনও ওঁরা ভয়াবহ ধাক্কা ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। হয়তো আমার বোন এবং আমি ওঁদের কাছে থাকব। স্বপন মণ্ডল ও তাঁর পরিবারেরও এখনও কোনও খবর নেই। আমরা সবাই তাঁদের নিরাপদে ফিরে আসার আশায় রয়েছি।”


Share