IAS Officer Utkarsh Khandal

‘কেমন আছ দাদা, চিনতে পারছ?,’ মিষ্টির দোকানে তল্লাশি চালাতে গিয়ে মহকুমাশাসককে প্রশ্ন ক্ষুদে শিল্পীর, বাড়ির পরিস্থিতি দেখে হতবাক

সেই সময় ভিড়ের মধ্যে থেকে এক নাবালিকা চিৎকার করে ওঠে। সেই সময় তল্লাশি, জিজ্ঞাসাবাদ চলছিল। এমন গুরুগম্ভীর পরিবেশে নাবালিকার এমন প্রশ্ন করায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিলেন মহকুমাশাসক উৎকর্ষ খন্ডাল।

অরুণিমার বাড়িতে মহকুমাশাসক।
নিজস্ব সংবাদদাতা, মালবাজার
  • শেষ আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০২:০৬

‘ও সাহেব কেমন আছ? আমাকে চিনতে পারছ?’ ওই নাবালিকা মহকুমাশাসকের দফতরে অঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিল। এর পরেই মহকুমাশাসক উৎকর্ষ খন্ডালকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়। তাঁর বাড়ির অবস্থা দেখে কার্যত হতবাক মহকুমাশাসক। কার্যত চোখে জল চলে আসে উৎকর্ষের।

অনলাইনে বেশি দামে দই বিক্রি হওয়ার অভিযোগ আসছিল। সেই মতো শুক্রবার জলপাইগুড়ির মালবাজার ব্লকের নেতাজি কলোনিতে একটি মিষ্টির দোকানে অভিযান চালাতে গিয়েছিলেন মহকুমাশাসক উৎকর্য খন্ডাল। সেই সময় ভিড়ের মধ্যে থেকে এক নাবালিকা চিৎকার করে ওঠে। সেই সময় তল্লাশি, জিজ্ঞাসাবাদ চলছিল। এমন গুরুগম্ভীর পরিবেশে নাবালিকার এমন প্রশ্ন করায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিলেন মহকুমাশাসক উৎকর্ষ খন্ডাল।

নাবালিকার নাম অরুণিমা ভাদুড়ী। ১২ বছর বয়স। ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। জানা গিয়েছে, স্বাধীনতা দিবসের দিন মহকুমাশাসকের দফতরে একটি অঙ্কন প্রতিযোগিতা হয়েছিল। সেই প্রতিযোগিতায় অরুণিমা প্রথম হয়েছিলেন। অরুণিমার হাতে পুরস্কার তুলে দিয়েছিলেন মহকুমাশাসক উৎকর্য খন্ডাল। সেই দিনটি স্মরণ করানোর চেষ্টা করে ক্ষুদে শিল্পী অরুণিমা। মহকুমাশাসককে অরুণিমা বলে, “১৫ অগস্ট তোমার অফিসে ছবি এঁকে আমি প্রথম হয়েছিলাম না?”

উৎকর্য খন্ডাল ২০২২ ব‍্যাচের আইএএস অফিসার। তিনি পদার্থবিদ‍্যা নিয়ে পড়াশুনা করেছেন। প্রশাসনিক মহেলে খবর, তিনি ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। পরবর্তীতে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আইএএস হন। বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ায় মাত্র কয়েক দিন আগের পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে যায় উৎকর্ষের। উৎকর্ষ পুরস্কৃত করার সময় অরুণিমার আঁকা ছবির ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। তবে মহকুমাশাসকেপ পাল্টা উত্তরের অপেক্ষা করেনি অরুণিমা। উৎকর্ষকে বলে, “এখানেই আমাদের বাড়ি। আমার সঙ্গে চলো।”

ক্ষুদে শিল্পীর এমন আবদারে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারেননি মহকুমাশাসক উৎকর্ষ। মিষ্টির দোকানের পাশ দিয়ে এসডিওর হাত ধরে বাড়িতে হাজির হয়। বাড়ির ভিতরে গিয়ে ভগ্নদশা দেখে কার্যত অবাক হয়ে যান প্রশাসনিক কর্তা। বুঝতে পারেন, তাঁদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। ভাদুড়ী পারিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। অরুণিমার বাবা তপন ভাদুড়ী পুরোহিতের কাজ করেন। মা সোমা ভাদুড়ী সপ্তাহে একদিন এলাকার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ছবি আঁকা শেখান। সেখান থেকে অর্জিত অর্থ দিয়েই কোনওক্রমে তাঁদের সংসার চলে।

মেয়ে মহকুমাশাসক সাহেবকে ঘরে ডেকে নিয়ে এসেছে, সবই ঠিক আছে। কিন্তু তাঁকে বসতে কোথায় দেবেন? মহকুমাশাসক বাড়িতে আসতেই আশেপাশের বাড়ি থেকে চেয়ার জোগাড় করার চেষ্টা শুরু করেন তপন। উৎকর্ষ আর সময় নষ্ট করেননি। বসে পড়েন ঘরের মেঝেতেই। অরুণিমার সঙ্গে পড়াশোনার কথা আলোচনা করতে করতে তাঁর আঁকা খাতা দেখেন। পাতা উল্টে কার্যত মুগ্ধ হয়ে যান মহকুমাশাসক। ক্ষুদে শিল্পীর দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “তোমার ছবিগুলি সত্যি খুবই সুন্দর। আমি সব ছবি কিনে নেব। তুমি আমাকে ছবিগুলি বিক্রি করবে?” এর পাল্টা যে উত্তর নাবালিকা দিয়েছে, তা শুনে আরও চমকে ওঠেন উৎকর্ষ। শিশুসুলভ সারল্য নিয়ে ছবি বিক্রির প্রস্তাব মাকে করে দেয়। অরুণিমা উত্তর দেয়––“আমি তোমাকে ছবি বিক্রি করব না। ছবিগুলি এমনিই আমি দিয়ে দেব। তুমি অফিসে রেখে দিও।”

একদিকে যখন নাবালিকার সঙ্গে কথা বলেছেন মহকুমাশাসক। অন‍্য দিকে, বাড়ির বাইরে ততক্ষণে ভিড় জমে গিয়েছে। তপনবাবুর পড়শিরা করে দূর থেকে তাঁকে ইশারা করে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, “সাহেবকে হাতের কাছে পেয়েছ, তোমার ঘরের দুর্দশার কথা বলে দাও। তিনি ব‍্যবস্থা নিয়ে সব ঠিক করে দেবেন।” কিন্তু পরিস্থিতির কারণে কিছুই বলে উঠতে পারেননি তপনবাবু। উদাস হয়ে উৎকর্ষের দিকে চেয়ে থাকেন। শুধু একবার বলেন, “মেয়ে বড় হোক এই টুকুই চাই স্যার।”

মালবাজার মহকুমাশাসকের তপনবাবু এমন পরিস্থিতি দেখে কার্যত চোখে জল চলে আসে। আইএএস উৎকর্ষ খন্ডাল বেরিয়ে যাওয়ার আগে তপনের উদ্দেশে শুধু বলেন, “কোনও রকম অসুবিধা হলে আমায় বলবেন। সরাসরি দফতরে চলে আসবেন। কোন অগ্রিম অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার প্রয়োজন নেই।”


Share