Malda Flood

গঙ্গার জল বিপদসীমার ৭৫ সেন্টিমিটার উপরে, জলে ভাসছে ভূতনি! ৮০টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত, যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে উদ্ধারকাজ

ত্রাণ বিলি ও উদ্ধারকাজে গতি আনতে উত্তর চণ্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত কার্যালয়ে একটি জোনাল রিলিফ অফিস খোলা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, ভূতনির উত্তরাংশ এবং গঙ্গার তীরবর্তী দুর্গম এলাকাগুলিতে দ্রুত সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই অফিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

বন্যায় কবলিত ভূতনি।
নিজস্ব সংবাদদাতা, মালদহ
  • শেষ আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:২৭

গঙ্গার জলস্তর বাড়তে থাকায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে মালদহের মানিকচক ব্লকের ভূতনি দ্বীপাঞ্চলে। একাধিক গ্রাম জলমগ্ন হয়ে পড়ায় দুর্গতদের কাছে দ্রুত ত্রাণ ও জরুরি পরিষেবা পৌঁছে দিতে জেলা প্রশাসন তৎপরতা বাড়িয়েছে। ত্রাণ বিলি ও উদ্ধারকাজে গতি আনতে উত্তর চণ্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত কার্যালয়ে একটি জোনাল রিলিফ অফিস খোলা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, ভূতনির উত্তরাংশ এবং গঙ্গার তীরবর্তী দুর্গম এলাকাগুলিতে দ্রুত সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই অফিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

জেলাশাসক রাজনবীর সিং কাপুর জানিয়েছেন, ভূতনি ব্রিজ থেকে দূরবর্তী এবং বন্যার জেরে যাতায়াত ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া এলাকাগুলির জন্য এই জোনাল রিলিফ অফিসকে কার্যকরী ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হবে। সেখান থেকেই দুর্গতদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া, উদ্ধারকাজ চালানো-সহ বিভিন্ন জরুরি পরিষেবার সমন্বয় করা হবে। দুর্গম এলাকাগুলিতে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়িয়ে দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, মানিকচক ঘাটে গঙ্গার জলস্তর বর্তমানে ২৬.০৫ মিটার। সেখানে চরম বিপদসীমা ২৫.৩০ মিটার। অর্থাৎ বিপদসীমার প্রায় ৭৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছে গঙ্গা। মানিকচক, বিশেষ করে ভূতনি এলাকা, বর্তমানে মালদহের বন্যা পরিস্থিতির অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, ভূতনিতে পাঁচটি গ্রাম পঞ্চায়েতের ৮০টি গ্রাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দুর্গতদের কাছে ‘শেষ মাইল’ পর্যন্ত ত্রাণ পৌঁছে দিতে বুথ এবং বসতি-ক্লাস্টারভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করেছে প্রশাসন। শুকনো খাবার, ডিএম রিলিফ কিট, ত্রিপল, ওষুধ, মশারি এবং পশুখাদ্য-সহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী দুর্গত এলাকার কাছাকাছি মজুত করা হচ্ছে। সেখান থেকেই পরিস্থিতি অনুযায়ী তা বিলি করা হচ্ছে। পাশাপাশি উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ পরিবহণের জন্য নৌকা, বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য জেনারেটর, পানীয় জল এবং চিকিৎসা পরিষেবাও দুর্গত এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

ভূতনি এলাকাতেই বর্তমানে ১১টি ত্রাণশিবির এবং ১৫টি গ্রুয়েল কিচেন বা লঙ্গরখানা চালু রয়েছে। উদ্ধার এবং ত্রাণ পরিবহণের কাজে ইতিমধ্যেই ১১১টি নৌকা নামানো হয়েছে। পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে আরও ৩০টি নৌকা যুক্ত করা হচ্ছে। ফলে মোট নৌকার সংখ্যা দাঁড়াবে ১৪১টি। প্রশাসন জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ভূতনি এলাকা থেকে ৪ হাজার ৫৯৫ জনকে উদ্ধার করে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দুর্গম ও জলমগ্ন এলাকাগুলিতে ত্রাণ, চিকিৎসা এবং অন্যান্য জরুরি পরিষেবা যাতে দ্রুত পৌঁছোয়, সে দিকে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।

ত্রাণ বিলিতেও বড়সড় পরিসরে কাজ চালাচ্ছে প্রশাসন। এখনও পর্যন্ত ভূতনিতে ৩৩ হাজার ৯৬৫টি ত্রিপল, চার হাজার ১৭০টি ডি এম রিলিফ কিট এবং ৩৭৬ কুইন্টাল বিশেষ জি আর চাল বিলি করা হয়েছে।

বন্যা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য পরিষেবা সচল রাখতেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। মানিকচকে ১৫টি মেডিকেল টিমের পাশাপাশি নৌকাভিত্তিক মোবাইল মেডিক্যাল ক্যাম্প কাজ করছে। এখনও পর্যন্ত ওই দলগুলির মাধ্যমে সাত হাজার ৪৮২ জনকে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, প্রয়োজন অনুযায়ী ২৪৬ জন গর্ভবতী মহিলাকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সাপের কামড়-সহ বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৩১০টি অ্যান্টি-ভেনম কিটও মজুত রাখা হয়েছে।

দুর্গত এলাকায় পানীয় জল ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। মানিকচকে মোতায়েন রয়েছে ছ'টি জলের ট্যাঙ্কার। রয়েছে ৩০৮টি টিউবওয়েল, ৬৬ হাজার ৫০০টি জলপাউচ, এক হাজার ৬০০টি পানীয় জলের জার এবং ১৯৬টি অস্থায়ী শৌচাগার। ত্রাণ শিবির এবং অন্যান্য জরুরি পরিষেবা সচল রাখতে ৫৮টি জেনারেটর সেটও মোতায়েন করা হয়েছে।

বন্যার প্রভাব পড়েছে গবাদি পশুর উপরেও। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভূতনিতে ৬৫টি পশু-স্বাস্থ্য শিবির চালু করা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত ওই শিবিরগুলিতে সাত হাজার ৪৭২টি পশুর চিকিৎসা করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পশুপালকদের জন্য ৫০০ কুইন্টাল পশুখাদ্যও মজুত রাখা হয়েছে।

জেলাজুড়ে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জোরকদমে চলছে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ। মালদহে ইতিমধ্যেই ২১টি ত্রাণশিবির এবং ২৫টি গ্রুয়েল কিচেন চালু করা হয়েছে। দুর্গতদের উদ্ধারে ১৭৫টি নৌকা মোতায়েন রয়েছে। প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত আট হাজার ২৪৬ জনকে উদ্ধার করে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় ৪২ হাজার ৩৪৭টি ত্রিপল, পাঁচ হাজার ৪০৩টি ডিএম রিলিফ কিট এবং ৬৪৩ কুইন্টাল বিশেষ জিআর চাল বিতরণ করা হয়েছে।

পরিস্থিতির উপর নজরদারি এবং দুর্গতদের চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিত করতে ৪৪টি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। পাশাপাশি ২১টি জলের ট্যাঙ্কার এবং ৬৮টি জেনারেটর মোতায়েন করা হয়েছে। দুর্গত এলাকাগুলিতে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়াতে তিন জন অতিরিক্ত জেলাশাসক, পিডি-ডিআরডিসি এবং ন'জন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় নামানো হয়েছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীও। ভূতনি এলাকার জন্য রতুয়া-১ ব্লকে একটি এনডিআরএফ দল এবং মানিকচকে পৃথক একটি দল মোতায়েন রয়েছে। এর পাশাপাশি ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি উদ্ধারকারী দলও দুর্গত এলাকায় কাজ করছে।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতির উপর ২৪ ঘণ্টা নজরদারি রাখা হচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পুলিশ, স্বাস্থ্য, পিএইচই, এআরডি, সিভিল ডিফেন্স, ডব্লিউবিএসইডিসিএল, সেচ, খাদ্য ও সরবরাহ এবং পঞ্চায়েত-সহ সমস্ত সংশ্লিষ্ট দফতরকে নিয়ে সমন্বিত ভাবে কাজ চলছে। প্রশাসনের মূল লক্ষ্য, বন্যায় আটকে পড়া প্রতিটি মানুষের কাছে দ্রুত ত্রাণ, উদ্ধার-সহায়তা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া।


Share