GI Tag

মালদহের আমের পর এ বার আশাপুরের বেগুনের মুকুটে জিআই স্বীকৃতির পালক, দেশজুড়ে বাড়বে পরিচিতি ও দাম, খুশির হাওয়া কৃষকদের মধ্যে

চাঁচোল মহকুমাতেই এই বেগুনের সবচেয়ে বেশি চাষ হয়, আর সেখানকার সফল চাষিরাই জেলার অন্যান্য কৃষকদের কাছেও হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণা।

জিআই ট্যাগ পেল মালদহের বেগুন।
নিজস্ব সংবাদদাতা, মালদহ
  • শেষ আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬ ১২:১৭

মালদহের বিখ্যাত আমের পর এ বার জিআই স্বীকৃতি পেল চাঁচোলের আশাপুরের বেগুন। ভারত সরকারের জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই) ট্যাগ মেলায় জেলার কৃষিক্ষেত্রে যোগ হল আরও এক বড় সাফল্য। উদ্যানপালন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি পাওয়ায় আশাপুরের এই বিশেষ প্রজাতির বেগুন আইনি সুরক্ষার পাশাপাশি জাতীয় স্তরেও স্বীকৃতি অর্জন করেছে। জিআই নম্বর ৯৯২-এর অধীনে ৩১ নম্বর শ্রেণিতে পণ্যটি নিবন্ধিত হয়েছে। সম্প্রতি চেন্নাইয়ে আয়োজিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বৈঠকে এই স্বীকৃতিতে আনুষ্ঠানিক সিলমোহর দেওয়া হয়েছে।

মালদহ মার্চেন্টস চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি উজ্জ্বল সাহা বলেন, "এই জিআই ট্যাগ মালদহের কৃষকদের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এটি আশাপুরের বেগুনের বাজারমূল্য বাড়াবে, আরও ভালো অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করবে।" প্রতি মরশুমেই মালদহের বাজারে বিশেষ চাহিদা থাকে আশাপুরের বেগুনের। তুলনামূলক বেশি দাম প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা হলেও ক্রেতাদের আগ্রহে ভাটা পড়ে না। এ বার এই জনপ্রিয় বেগুন জিআই স্বীকৃতি পাওয়ায় উত্তর মালদহের চাঁচোলের চাষিদের মুখে ফুটেছে হাসি। ভবিষ্যতে আরও ভালো দাম ও বৃহত্তর বাজারের আশা করছেন তাঁরা। আশাপুরের বেগুন এখন শুধু মালদহেই নয়, পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি বিহার ও ঝাড়খণ্ডেও নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তুলেছে। স্বাদে মিষ্টি ও গুণমানে অনন্য হওয়ায় এটি কার্যত একটি স্বীকৃত 'ব্র্যান্ড'-এ পরিণত হয়েছে। চাঁচোল মহকুমাতেই এই বেগুনের সবচেয়ে বেশি চাষ হয়, আর সেখানকার সফল চাষিরাই জেলার অন্যান্য কৃষকদের কাছেও হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণা।

কৃষি দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, চাঁচোল-১ নম্বর ব্লকের মতিহারপুর, সন্তোষপুর, কুশমাই, শিবপুর, খানপুর, গালিমপুর-সহ অন্তত ২৫টি গ্রামের কৃষকরা ব্যাপকভাবে বেগুন চাষ করেন। চাষিদের দাবি, চাঁচোলের এই বিশেষ জাতের বেগুন বহুদিন ধরেই জনপ্রিয়। তবে মালদহ জেলায় আশাপুরের বেগুনেরই সবচেয়ে বেশি সুনাম রয়েছে। বর্তমানে প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে এই বেগুনের চাষ হচ্ছে, যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কৃষকদের মতে, প্রতি বিঘা জমিতে বেগুন চাষে খরচ হয় প্রায় সাত থেকে আট হাজার টাকা। আর সেই এক বিঘা জমি থেকেই গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ মন পর্যন্ত বেগুন উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, জিআই নম্বর ৯৯২, ক্লাস-৩১ (বেগুন) বিভাগে আশাপুর বেগুনের নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরের ২৭ মার্চ, ২০২৬ চেন্নাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জিআই শংসাপত্র জারি করা হয়। জেলাশাসক রাজনবীর সিং কাপুর বলেন, "আশাপুরের বেগুনের জিআই স্বীকৃতি জেলার জন্য গর্বের বিষয়। এটি চাঁচোল-১ নম্বর ব্লক ও পার্শ্ববর্তী এলাকার কৃষকদের উল্লেখযোগ্য ভাবে উপকৃত করবে।” এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলাশাসক শ্রীনিবাস পাটিল জানান, "স্থানীয় কৃষিপণ্যের উন্নয়ন এবং কৃষকদের স্বার্থরক্ষায় জেলা প্রশাসনের ধারাবাহিক উদ্যোগের এটি একটি বড় সাফল্য।" মালদহ কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের প্রধান দূষ্যান্ত কুমার রাঘব বলেন, "আকার, স্বাদ, গুণমান এবং ঐতিহ্যবাহী চাষপদ্ধতির জন্যই আশাপুর বেগুন এই স্বীকৃতি পেয়েছে। জিআই স্বীকৃতির ফলে দেশ-বিদেশে এই  পরিচিতি আরও বাড়বে। কৃষকরা উৎপাদিত বেগুনের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার পাশাপাশি সাধারণ বেগুনের তুলনায় বেশি দাম পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।"

বর্তমানে আশাপুরের বেগুন পাইকারি বাজারে প্রতি মণ এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চাঁচোল মহকুমায় উৎপাদিত এই বেগুনের চাহিদা শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ির পাশাপাশি ঝাড়খণ্ড ও অসমেও রয়েছে। গালিমপুর গ্রামের আলম শেখ, সহিদুল রহমান ও আবেদ আলির মতো বহু চাষি পাঁচ থেকে ১৫ বিঘা জমিতে এই বেগুনের চাষ করেন। তাঁদের প্রত্যেকেরই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ফলন হয় এবং উৎপাদিত বেগুনের প্রায় ৯০ শতাংশই পাইকারদের মাধ্যমে বিভিন্ন রাজ্যে রপ্তানি করা হয়। বহু বছর ধরে এই বিশেষ জাতের বেগুনের চাষ করে আসছেন স্থানীয় কৃষকেরা। গুণমান ও বাজারে ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার জেরে ‘আশাপুরের বেগুন’ ইতিমধ্যেই একটি স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সেই স্বীকৃতিতেই নতুন পালক যোগ করে এ বার ভারত সরকারের জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন স্বীকৃতিও পেল এই বেগুন।


Share