Sand Smuggling

পালাবদলের পরেও বালি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য অব্যাহত! মাদারিহাটে রয়্যালটি ঘিরে কোটি টাকার কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ

অন্য দিকে, কার্যত মুখে কুলুপ এঁটেছেন আলিপুরদুয়ার জেলার মাইনিং ও মিনারেল দফতরের ওসি সম্রাট রায়। তিনি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। শুধু বলেন, ‘সরকারি মূল্য কত, তা সরকারি ওয়েবসাইট দেখলেই জানা যাবে।’

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, মাদারিহাট
  • শেষ আপডেট: ২৭ মে ২০২৬ ১০:৪৮

পালাবদলের পরেও বালি পাচার অব্যাহত। কিছু দিন ঘাপটি মেরে বসে থাকার পরে মাদারিহাটের বিভিন্ন এলাকায় বালি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য আবার বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সেখানে সরকারি নিয়মকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বালি মাফিয়াদের সিন্ডিকেট চলছে।

মাদারিহাটে বিভিন্ন ব্লকের নদীগুলি বালি মাফিয়াদের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। রাজ‍্য সরকারের নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় আকাশছোঁয়া দামে লিজ হোল্ডারদের থেকে মানুষ বালি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। বিগত কয়েক বছর ধরেই কারবার চলে আসছে। কোনও সরকারি নজরদারিও নেই। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কার্যত বালি মাফিয়ারা চারণভূমিতে পরিণত করেছে।

অভিযোগ, এই বেপরোয়া লুটের নেপথ্যে সক্রিয় রয়েছে মোটা কাটমানির চক্র। বালির ঘাটের লিজ হোল্ডারদের বিপুল আয়ের একটি বড় অংশ নিয়মিত কলকাতার এক প্রভাবশালী মহলের কাছে পৌঁছে যেত। পাশাপাশি বিগত সরকারের স্থানীয় স্তরের একাংশ নেতার পকেটেও কাটমানির টাকা ঢুকত বলে অভিযোগ উঠেছে। এই প্রকাশ্য দুর্নীতি নিয়ে সরকারি দফতরগুলির চরম উদাসীনতাও সামনে এসেছে। এই চালান একাধিক বার ব‍্যবহার করে বালি পাচার করে দেওয়া হয়েছে। এই চক্রের মধ‍্যে ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দফতর এবং পুলিশের একটি অংশ জড়িত রয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

যদিও ঘটনার দায় এড়িয়ে মাদারিহাট ব্লকের ভূমি ও ভূমি রাজস্ব আধিকারিক নবীন ইয়োনজন বলেন, “গাড়িতে রয়্যালটি আছে কি না, আমরা শুধু সেটাই পরীক্ষা করি। অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব আমাদের নয়। সেটা জেলা মাইনিং ও মিনারেল দফতরের কাজ।”

অন্য দিকে, কার্যত মুখে কুলুপ এঁটেছেন আলিপুরদুয়ার জেলার মাইনিং ও মিনারেল দফতরের ওসি সম্রাট রায়। তিনি এ বিষয়ে বিশেষ কোনও মন্তব্য করতে চাননি। শুধু বলেন, “সরকারি মূল্য কত, তা সরকারি ওয়েবসাইট দেখলেই জানা যাবে।”

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, ২০০ ঘনফুট বালির নির্ধারিত মূল্য মাত্র ৯০০ টাকা। কিন্তু অভিযোগ, লিজ হোল্ডারেরা ক্রেতাদের কাছ থেকে প্রায় তিন হাজার টাকা করে রয়্যালটির নামে আদায় করছে। ফলে বাড়ি নির্মাণ বা অন্য কোনও নির্মাণকাজের জন্য বালি কিনতে গিয়ে পরিবহণ খরচ মিলিয়ে সাধারণ মানুষকে খরচ করতে হচ্ছে অন্তত নয় থেকে ১০ হাজার টাকা। নদী থেকে গন্তব্যস্থলের দূরত্ব বাড়লে এই খরচের অঙ্ক আরও বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

অভিযোগ উঠেছে, এই অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কোনও কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। যদিও এই পরিস্থিতির জন্য বিগত সরকারের নীতি ও দুর্নীতিকেই দায়ী করেছেন আলিপুরদুয়ারের বিজেপি সাংসদ মনোজ টিগ্গা এবং মাদারিহাটের বিধায়ক লক্ষ্মণ লিম্বু। মনোজ টিগ্গা বলেন, “চোরাপথে বালি, পাথর পাচার বন্ধ করতে মাদারিহাট ভূমি ও ভূমি রাজস্ব আধিকারিককে কড়া পদক্ষেপ করতে বলা হয়েছে। সরকারি নিয়ম মেনে বালি, পাথরের রয়্যালটি বিক্রি করতে হবে। অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হলে আমাদের সরকার উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।”

যদি নিয়ম মানতে বলা হয়ে থাকে তাহলে সরকারি রাজস্ব এবং অবৈধ ভাবে তোলা টাকা মিলিয়ে বালির দাম আরও বাড়িয়ে দেওয়া বলে দাবি করছে কেউ কেউ।

যদিও ইজারাদের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাদারিহাট ব্লকের ডিমডিমা, পাগলি ও গারুচিরা নদীর লিজ হোল্ডার মাফুজা বানুর স্বামী সোহেল রহমানের দাবি, কোটি টাকারও বেশি দর দিয়ে পাঁচ বছরের জন্য নদী থেকে বালি ও পাথর তোলার লিজ নিতে হয়েছে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে বহু গাড়ি রয়্যালটি না দিয়েই বালি-পাথর পাচার করে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি জানান, এই চুরির জেরেই তাদের বাড়তি দাম নিতে বাধ্য হতে হচ্ছে। প্রশাসন যদি চোরাপথে পাচার বন্ধ করতে পারে, তাহলে রয়্যালটির দাম অনেকটাই কমানো সম্ভব।

একই অভিযোগ তুলেছেন ব্লকের আরও এক লিজ হোল্ডার। তাঁর দাবি, অনলাইন অকশনে নদীর লিজ পেতে কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করতে হয়। এর পরেও যদি অবৈধভাবে বালিপাচার চলতে থাকে, তাহলে ক্ষতি সামাল দিতে বাড়তি দামে রয়্যালটি বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকে না। তবে প্রশাসন কঠোর নজরদারি চালালে কম টাকাতেও রয়্যালটি দেওয়া সম্ভব বলে মত তাদের। আর এই চরম অরাজকতার সরাসরি প্রভাব স্থানীয় পরিবহণ ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ক্রেতাদের ওপর পড়ছে।

প্রসঙ্গত, মাদারিহাটের নদীগুলির বালি ও পাথরের গুণমান এতটাই উন্নত যে, এলাকাবাসীর কাছে তা কার্যত ‘সোনার খনি’ হিসেবেই পরিচিত। প্রতিদিন রাজ্যের বিভিন্ন জেলা তো বটেই, ভিনরাজ্য থেকেও শত শত ট্রাক ছুটে আসে এই নদীগুলির ঘাটে। আর এই আকাশছোঁয়া চাহিদাকেই পুঁজি করে বছরের পর বছর ধরে চলছে কোটি কোটি টাকার রয়্যালটি কারবার। কাটমানির অভিযোগ এবং অবাধ লুটের খেলা চলছেই। তবে রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন সরকারের আমলে এই ‘বালির মাফিয়া সাম্রাজ্যে’ কতটা লাগাম টানা সম্ভব হবে, আদৌ দুর্নীতির রাশ টানা যাবে কি না এখন সেদিকেই তাকিয়ে সাধারণ মানুষ। সময়ই বলবে, ‘সোনার খনি’ ঘিরে জমে ওঠা এই অন্ধকার কারবারে সত্যিই পরিবর্তনের হাওয়া লাগে কি না।


Share