KMC Election

পুরভোটের আগে তৃণমূলে অনীহা! ১৩৭ প্রাক্তন কাউন্সিলরের মধ্যে ৩৭ জনও লড়তে নারাজ, পদ্মের টিকিটের দৌড়ে জমা পড়েছে পাঁচ হাজারেরও বেশি বায়োডাটা

কলকাতা পুরভোটের আগে তৃণমূলের অন্দরে অনিশ্চয়তা! নিরাপত্তা, আর্থিক সমস্যা ও আইনি জটিলতার কারণে প্রাক্তন কাউন্সিলরদের একাংশ ভোটে লড়তে অনাগ্রহী। অন্যদিকে, বিজেপির টিকিটের দৌড়ে জমা পড়েছে পাঁচ হাজারেরও বেশি বায়োডাটা।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০২ নভেম্বর ২০২৬ ০৪:৫৩

কলকাতা পুরভোটের প্রস্তুতি যত এগোচ্ছে, ততই বদলাচ্ছে রাজনৈতিক সমীকরণ। একসময় পুরভোটে তৃণমূলের টিকিট পেতে নেতা-নেত্রীদের বাড়িতে যাঁদের নিয়মিত আনাগোনা ছিল, তাঁদের অনেকেই এবার ভোটে লড়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। কেউ ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলছেন। কেউ আবার আর্থিক সমস্যার কথা জানিয়ে নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। অন্যদিকে, প্রাক্তন কাউন্সিলরদের একাংশের বিরুদ্ধে বিজেপির টিকিট পাওয়ার চেষ্টা চালানোর অভিযোগও উঠছে।

প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের পুরভোটে তৃণমূলের টিকিটে জয়ী ছিলেন ১৩৭ জন কাউন্সিলর। তাঁদের মধ্যে এখনও পর্যন্ত ৩৭ জনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের হয়ে ফের লড়তে আগ্রহ প্রকাশ করেননি। নেতৃত্বের একাংশের দাবি, এবার নির্বাচনে নামতে হলে নিজেদের আর্থিক সামর্থ্যেই প্রচারের খরচ সামলাতে হবে। আগের মতো দলের ঘনিষ্ঠ মহল বা সমর্থকদের কাছ থেকে অর্থসাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা কম। সেই কারণেও অনেকেই প্রার্থী হতে চাইছেন না বলে জানা যাচ্ছে।

‘মমতা তৃণমূল’-এর রাজ্য সাধারণ সম্পাদক বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার প্রবণতা থেকেই প্রাক্তন কাউন্সিলরদের একাংশ বিজেপির টিকিট পাওয়ার চেষ্টা করছেন। আবার কয়েকজন বিজেপির হামলা এবং পুলিশি হেনস্তার আশঙ্কায় পুরভোটে অংশ নিতে চাইছেন না।

এদিকে বিজেপির প্রার্থী হওয়ার দৌড়েও বাড়ছে ভিড়। কলকাতার ২০৯টি ওয়ার্ডে প্রার্থী হওয়ার জন্য রাজ্য দফতরের ড্রপবক্সে ইতিমধ্যেই পাঁচ হাজারের বেশি বায়োডাটা জমা পড়েছে। সেগুলি খতিয়ে দেখার কাজ চলছে। সময় যত এগোচ্ছে, শমীক ভট্টাচার্য, সুকান্ত মজুমদার, তাপস রায়, সজল ঘোষ এবং রীতেশ তিওয়ারির বাড়িতে টিকিটপ্রত্যাশীদের আনাগোনাও বাড়ছে। চিকিৎসক, আইনজীবী-সহ বিভিন্ন পেশার পরিচিত মুখেরাও পদ্মশিবিরের প্রার্থী হতে আগ্রহী। বিজেপির দাবি, কলকাতার অন্তত ১৮০টি ওয়ার্ডে জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে তাদের। এই পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য মেয়র এবং মেয়র পারিষদদের নাম নিয়েও দলের অন্দরে আলোচনা শুরু হয়েছে।

তবে তৃণমূলের প্রাক্তন মেয়র এবং মেয়র পারিষদদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা স্পষ্ট। দীর্ঘদিন কলকাতা পুরসভার দায়িত্ব সামলানো দুই প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় এবং ফিরহাদ হাকিম এখনও ভোটের ময়দানে নামার কথা জানাননি। শোভন আপাতত সক্রিয় রাজনীতির বাইরে। অন্যদিকে, ফিরহাদ প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন, তিনি কিংবা তাঁর মেয়ে এবার পুরভোটে প্রার্থী হবেন না।

প্রাক্তন ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষের ২২ নম্বর ওয়ার্ডটি মহিলা সংরক্ষিত হওয়ায় তাঁর বা মেয়ে প্রিয়দর্শিনীর প্রার্থী হওয়া নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। একইভাবে প্রাক্তন মেয়র পারিষদ স্বপন সমাদ্দার এবং সন্দীপরঞ্জন বক্সীও এবার নির্বাচনে লড়বেন না বলে জানিয়েছেন। সন্দীপ বক্সীর ওয়ার্ড মহিলা সংরক্ষিত হওয়ায় অন্য ওয়ার্ড থেকে তিনি লড়তে চান না। আর স্বপন সমাদ্দারের বক্তব্য, তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় এখনও সম্পূর্ণ জামিন মেলেনি। নতুন ও পুরনো ওয়ার্ড মিলিয়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ ৫২ জনের বিরুদ্ধেও মামলা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আইনি জটিলতা না মেটা পর্যন্ত তাঁর ভোটে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা নেই।

অন্যদিকে, বেহালার সঞ্চিতা মিত্র, ঘনশ্রী বাগ এবং রাসবিহারীর মনীষা বসু-সহ উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার একাধিক প্রাক্তন কাউন্সিলর রাজনীতি থেকে দূরে থাকার কথা জানিয়েছেন। যদিও রত্না শূর এবং রূপক গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো কয়েকজন প্রাক্তন কাউন্সিলর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হয়ে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বেহালার প্রাক্তন বরো চেয়ারম্যান তথা প্রাক্তন মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের পাঁচবারের চিফ ইলেকশন এজেন্ট অঞ্জন দাসও প্রার্থী হতে আগ্রহী। তাঁর বক্তব্য, হামলার আশঙ্কা থাকলেও তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রার্থী হয়েই লড়বেন।

বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী চৈতালী চট্টোপাধ্যায় দু'জনেই বিদায়ী পুরবোর্ডের মেয়র পারিষদ ও বরো চেয়ারম্যান ছিলেন। তবে এবার দু'জনের কেউই প্রার্থী হতে চান না বলে জানিয়েছেন। যদিও দলনেত্রী নির্দেশ দিলে তাঁকে কোনও একটি ওয়ার্ড থেকে লড়তে হতে পারে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

এদিকে, তৃণমূলের বাইরে অন্য রাজনৈতিক শিবিরেও পুরভোট ঘিরে প্রস্তুতি চলছে। ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য যুব সভাপতি সৌরভ বসু আগে ৮৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। এবার ওই ওয়ার্ড মহিলা সংরক্ষিত হওয়ায় হাজরা-রাসবিহারী এলাকায় প্রার্থী হওয়ার তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দলের পরিষদীয় ডেপুটি লিডার তথা প্রাক্তন মেয়র পারিষদ সন্দীপন সাহার দাবি, কলকাতার ২০৯টি ওয়ার্ডেই প্রার্থী দেবে ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস।

ঋতব্রত শিবিরের ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকার প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলরদের একাংশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের হয়ে না লড়লেও ডেমোক্রেটিক তৃণমূলের হয়ে 'খাম' প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। অন্যদিকে কালীঘাটের তৃণমূলের দাবি, খিদিরপুর, গার্ডেনরিচ, তপসিয়া, তিলজলা, এন্টালি, বালিগঞ্জ এবং কসবা বিধানসভা এলাকার বড় অংশে বিজেপির সঙ্গে তাদের সরাসরি লড়াই হবে। ভোটের দিন ওই এলাকাগুলিতে ১৯৯০ সালের পুরভোটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলেও মনে করছে শাসক শিবির।

সব মিলিয়ে পুরভোটের আগে কলকাতার রাজনৈতিক মহলে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্য ও উত্তর কলকাতার একাধিক প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর এখনও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেননি। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও পরিবারের আপত্তির কথা বলে তাঁরা আপাতত প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে মন্তব্য এড়িয়ে যাচ্ছেন। ফলে পুরভোটের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কোন শিবিরে কারা থাকছেন, তা নিয়ে জল্পনা ক্রমশ বাড়ছে।


Share