Supreme Court

আর্থিক দুর্নীতি মামলায় সন্দীপ ঘোষকে জামিন সুপ্রিম কোর্টে, সিবিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ নির্যাতিতার পরিবারের

শীর্ষ আদালতের এই সিদ্ধান্তের পরেই সিবিআইয়ের তদন্ত ও ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আরজি করের নির্যাতিতার বাবা-মা এবং আন্দোলনকারী চিকিৎসকেরা।

সন্দীপ ঘোষকে জামিন দিল সুপ্রিম কোর্ট।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ১১:৫৭

আরজি কর মেডিকেল কলেজের আর্থিক দুর্নীতি মামলায় প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষকে জামিন দিল সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং দীর্ঘদিন বন্দি থাকার বিষয়টি বিবেচনা করে বিচারপতি এমএম সুন্দ্রেশ এবং বিচারপতি প্রশান্ত বি বরলের বেঞ্চ শুক্রবার এই নির্দেশ দিয়েছে। শীর্ষ আদালতের এই সিদ্ধান্তের পরেই সিবিআইয়ের তদন্ত ও ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আরজি করের নির্যাতিতার বাবা-মা এবং আন্দোলনকারী চিকিৎসকেরা।

আর্থিক দুর্নীতি মামলায় সিবিআইয়ের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই জেলবন্দি সন্দীপ। জামিনের আবেদন জানিয়ে প্রথমে তিনি কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর আবেদন খারিজ করে দেন বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে গত ১৮ অগস্ট সুপ্রিম কোর্টে জামিনের আবেদন করেন আরজি করের প্রাক্তন অধ্যক্ষ। শুক্রবার শীর্ষ আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করল।

সন্দীপের আইনজীবী আদালতে জানান, এই মামলায় চার্জশিট জমা পড়ার পর বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হলেও তার গতি অত্যন্ত ধীর। ১৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে এখনও পর্যন্ত মাত্র সাত জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পূর্ণ হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জেলবন্দি থাকা এবং বিচার শেষ হতে দেরি হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করেই সুপ্রিম কোর্ট জামিন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও জামিন পাওয়া মানেই মামলায় সন্দীপ নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন, এমন নয়।

আরজি করের চিকিৎসক-ছাত্রীর ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পরেই হাসপাতালের আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। সেই অভিযোগের তদন্তে নামে সিবিআই। পরে তদন্ত শুরু করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি-ও। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির অভিযোগ, হাসপাতালের অ্যাকাউন্ট থেকে ঠিকাদারদের অ্যাকাউন্টে পাঠানো বিপুল পরিমাণ টাকা পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে তাঁদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নামে চেক লেখা, সেই চেকের মাধ্যমে টাকা তোলা এবং অন্য সহযোগী সংস্থার অ্যাকাউন্টে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং অপরাধের প্রমাণ আড়াল করার চেষ্টা হয়েছিল বলে দাবি তদন্তকারীদের। সেই দুর্নীতির সঙ্গে সন্দীপের যোগ থাকার অভিযোগ উঠেছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে ইডি এই মামলায় চার্জশিট জমা দিয়েছে। তবে সন্দীপকে এই মামলায় গ্রেফতার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়নি কেন্দ্রীয় সংস্থাটি। ফলে সিবিআইয়ের মামলায় জামিন পাওয়ার পর তাঁর জেলমুক্তির সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে। তবে জামিনের নির্দেশের বিরুদ্ধে ইডি কোনও পদক্ষেপ করলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।

এর আগে সন্দীপের জামিনের আবেদন খারিজ করতে গিয়ে হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ ছিল, তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। অভিযুক্ত প্রভাবশালী হওয়ায় সাক্ষীদের প্রভাবিত করার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না বলে মনে করেছিল আদালত।

সন্দীপ ঘোষের জামিনের খবরে সিবিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আরজি করের নির্যাতিতার বাবা। তাঁর কথায়, “সিবিআই অপদার্থ সংস্থা। সেটা আরও এক বার প্রমাণ হল।” বিচার না পেলে এই কথা বলা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, “এতে যদি দল রাগ করে, তাতে আমার কিছু করার নেই।” বর্তমানে নির্যাতিতার মা পানিহাটির বিজেপি বিধায়ক।

আরজি কর আন্দোলনের অন্যতম মুখ অনিকেত মাহাতোও সিবিআইয়ের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়াকে দীর্ঘসূত্রিতার মধ্যে ফেলে দিয়ে কার্যত দুর্নীতিগ্রস্তদেরই সুবিধা করে দিচ্ছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। অনিকেতের প্রশ্ন, সন্দীপ ঘোষের মতোই সিবিআই কি দোষী নয়?

আন্দোলনের আর এক মুখ দেবাশিস হালদারও সিবিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, ধর্ষণ-খুনের মূল মামলায় সন্দীপের জামিনের পর আর্থিক দুর্নীতির মামলাতেও জামিন পাওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাঁর কথায়, “জামিন অপ্রত্যাশিত হলেও আশ্চর্যজনক নয়।” সন্দীপ ভবিষ্যতে আবার কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরে আসতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে সরকার, বিচারব্যবস্থা এবং তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন দেবাশিস।

ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের সভাপতি কৌশিক চাকী স্পষ্ট করেছেন, জামিন পাওয়া মানেই সন্দীপ ঘোষ নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন, এমন নয়। তবে তাঁর আশঙ্কা, এ বার সন্দীপের সরকারি চাকরিতে পুনর্বহাল, মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশন ফিরিয়ে দেওয়া কিংবা তাঁকে ফের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর চেষ্টা হতে পারে। তাঁর প্রশ্ন, আরজি করকে ঘিরে যে দুর্নীতি ও ‘থ্রেট কালচার’-এর অভিযোগ উঠেছিল, তা কি আবার সক্রিয় হয়ে উঠবে? সরকার বদলালেও ব্যবস্থার পরিবর্তন হবে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

অ্যাসোসিয়েশন অফ হেল্থ সার্ভিস ডক্টর্সের সম্পাদক উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, লক্ষ লক্ষ মানুষের আন্দোলন সত্ত্বেও তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। ১৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে এখনও ১৪০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ বাকি থাকায় ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। দ্রুত বিচার শেষ করা এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন উৎপল।

আরজি কর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক তাপস প্রামাণিকের কটাক্ষ, “পুজোর ছুটি পেল। এ বার ওয়াশিংমেশিনে ঢুকে দাগহীন পরিষ্কার হয়ে বার হবে।” একই সঙ্গে ২০২৪ সালের দুর্গাপুজোর আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘উৎসবে ফিরুন’ মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “উৎসবে ফিরলেন সন্দীপ ঘোষ।”

উল্লেখ্য, গত ৯ অক্টোবর আরজি করের একটি অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে নিজের মেয়ের বিচারের দাবি জানিয়েছিলেন নির্যাতিতার মা। সেই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন তাপস প্রামাণিকও। সন্দীপের জামিন ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতর শুরু হলেও নির্যাতিতার পরিবার ও আন্দোলনকারীদের মূল দাবি একটাই— দ্রুত বিচার এবং দোষীদের শাস্তি।


Share