KMC

সোহরাওয়ার্দির নামে থাকা রাস্তার নাম পরিবর্তন করল কলকাতা পুরসভা, গোপাল মুখোপাধ্যায়ের নামে সিলমোহর, জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

রাস্তাটি অভিবক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দির কাকা হাসান সোহরাওয়ার্দির নামে হয়েছিল। হাসান সোহরাওয়ার্দির কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলমান উপাচার্য ছিলেন। ১৯৩২ সালে কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (কেআইটি) কর্তৃক এই রাস্তাটি নির্মাণের পর নামকরণটি করা হয়।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২১ জুন ২০২৬ ০৭:৪৫

সোরহাবর্দির নামে থাকা রাস্তার নাম পরিবর্তন নিয়ে সিপিএম বা তৃণমূল পরিচালিত সরকার— কারো সেই ইচ্ছা ছিল না। পালাবদল হতেই পার্ক সার্কাস সংলগ্ন রাস্তা, সোহরাওয়ার্দি অ‍্যাভেনিউয়ের নাম পরিবর্তন করে দিল রাজ‍্য সরকার। গতকাল পশ্চিমবঙ্গ দিবসের দিনে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত কলকাতা পুরসভা নিয়েছে। সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে রাজ‍্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কলকাতা পুরসভা সেই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন।

শনিবার কলকাতা পুরসভা তরফে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। যাতে লেখা রয়েছে, এত দিন পর্যন্ত ওই রাস্তাটির নাম ছিল সোহরাওয়ার্দি অ‍্যাভেনিউ। এ বার থেকে ওই রাস্তার নাম হবে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’। পুরসভার আইন অনুযায়ী, যখন থেকেই এই নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে, তখন থেকেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়ে গিয়েছে। পুরসভা সূত্রের খবর, এর পরে ওই রাস্তা সংক্রান্ত নাম বদলের যাবতীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে।

রাস্তাটি অভিবক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দির কাকা হাসান সোহরাওয়ার্দির নামে হয়েছিল। হাসান সোহরাওয়ার্দির কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলমান উপাচার্য ছিলেন। ১৯৩২ সালে কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (কেআইটি) কর্তৃক এই রাস্তাটি নির্মাণের পর নামকরণটি করা হয়।

১৯৪৬ সালের কলকাতার দাঙ্গায় একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সোরাহওয়ার্দির মদতে এই দাঙ্গা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। তাই ওই রাস্তাটি নিয়ে বিতর্কও ছিল। গত কাল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পশ্চিমবঙ্গ দিবস উপলক্ষে তারকেশ্বরে বক্তব্য রাখার সময় জানান, পশ্চিমবঙ্গ দিবসের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে কমিউনিস্টরা ইতিহাসের পাতা থেকে ‘হোয়াইট ওয়াশ’ করে দিয়েছে। ১৯৪৬ সালে নোয়াখালি এবং কলকাতার দাঙ্গায় অনেক বাঙালি (হিন্দু) প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমানের যুবসমাজের সেই ইতিহাস জানার প্রয়োজন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, তোষণের রাজনীতি করবে বলেই কমিউনিস্টরা ইতিহাসকে বিকৃত করেছে। সিপিএম এবং তৃণমূল এই রাজ‍্যকে বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারীদের আড্ডা বানিয়ে দিয়েছে। 

ওই রাস্তাগুলির নাম পরিবর্তন করার জন্য সাধারণ মানুষের দাবি ছিলই। সিপিএম বা তৃণমূল কোনও সরকারই এই সদিচ্ছা দেখাতে পারেনি। বিজেপির বক্তব্য ছিল, একটি বিশেষ ধর্মকে খুশি করবে বলেই তাঁরা এই সিদ্ধান্ত নেয়নি।

কলকাতা পুরসভার এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, “পশ্চিমবঙ্গ দিবসের শুভক্ষণে সোহরাওয়ার্দী অ‍্যাভেনিউ-এর নাম পরিবর্তন করে স্বর্গীয় গোপাল মুখোপাধ্যায়ের নামে ‘গোপাল মুখার্জী রোড’ নামকরণ করার জন্যে কলকাতা পুরসভার গৃহীত এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে আন্তরিক ভাবে সাধুবাদ জানাই।”

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর বক্তব্য, এটি শুধুমাত্র একটি নাম পরিবর্তন নয়। বরং ইতিহাসের এক অন‍্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে এমন এক ব্যক্তির নাম বহন করা হয়েছে, যাঁর ভূমিকা বিভাজন ও রক্তক্ষয়ের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। আজ সেই অধ্যায়ের সংশোধন করে সাহস, আত্মত্যাগ ও রক্ষকের প্রতীক গোপাল মুখোপাধ্যায়কে যথাযোগ্য সম্মান জানানো হল।”

শুধু সোরাহওয়ার্দি অ‍্যাভেনিউ নয়, কলকাতায় লেনিন সরণি, হোচিমিন, কার্ল মার্ক্সের নামেও রাস্তা রয়েছে। কমিউনিস্টদের শাসনকালের এই সমস্ত রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে। এ বার এই সমস্ত বিদেশি রাজনীতিবিদদের নামে থাকা রাস্তার নাম কবে বদল কবে হবে তা-ই দেখার। 

রাজ‍্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে রাজ‍্য  বিজেপির মুখপাত্র তথা অধ‍্যাপক বিমলশঙ্কর নন্দ বলেন, “গোপাল মুখোপাধ্যায়, শ‍্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নাম ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে। তাঁরা না থাকলে বাঙালি হিন্দুদের আর কোনও স্থান ছিল না যাওয়ার। তাই রাজ‍্য সরকার তাঁকে সম্মান দিয়েছে।” তিনি তৃণমূল, সিপিএম এবং কংগ্রেসকে এই বিষয়ে আক্রমণ করেছেন। বাকি রাস্তার নাম পরিবর্তনের বিষয়ে বিমলবাবু বলেন, “আমরা ইতিহাসের গুরুত্ব বিবেচনা করব। সেই সিদ্ধান্ত এখনই চূড়ান্ত হবে না।” ধীরে ধীরে তা কার্যকর করা হবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

যদিও বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ কলকাতা পুরসভার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। কুনালের দাবি, কলকাতা পুরসভা এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বড় ভুল করেছে। রাস্তাটির নামকরণ হাসান সোহরাওয়ার্দির নামে করা হয়েছিল। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ছিলেন। তৃণমূল বিধায়ক কুনালের এ-ও দাবি করে বলেন, “তিনি নাকি সেই সময়কার ‘প্রখ‍্যাত’ চিকিৎসক ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের চিফ মেডিকেল অফিসারও ছিলেন। পরে তিনি রাজনীতিতেও এসেছিলেন। রাজনীতিতে এসে পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন।

কুনাল ঘোষ আরও বলেন, “হোসেন শহিদ সোহরাবর্দি সেই সময়ের প্রশাসনিক প্রধান ছিলেন। তাঁকে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর সঙ্গে জোড়া হয়েছে। হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দি হাসান সোহরাবর্দির ভাইপো ছিলেন। তাঁরা এক ব্যক্তি নন। মুখ্যমন্ত্রীর উচিত সত্যতা যাচাই করা এবং পুরসভাকে পুরোনো রেকর্ড দেখতে বলা। ভুলবশত ভাইপোর জায়গায় কাকাকে শাস্তি দেওয়া দুর্ভাগ্যজনক।”

তবে যে নতুন যে নামটি বসানো হয়েছে, তা নিয়ে কিছু বলার নেই বলে জানিয়েছেন কুনাল ঘোষ। তাঁর দাবি, কিন্তু বিশেষ কারণ দেখিয়ে যে নামটি মোছা হল, তা ঠিক করে দেখা উচিত।


Share