Dengue

ডেঙ্গির মরশুমে ওষুধ-স্যালাইনে টান! উৎপাদন বন্ধ তিন সংস্থার, ওড়িশা-উত্তরপ্রদেশের দিকে তাকিয়ে রাজ্য

ডেঙ্গি মোকাবিলায় চিকিৎসা পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে পড়শি রাজ্য ওড়িশার সহায়তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে রাজ্য। পাশাপাশি, ওষুধের ঘাটতি মেটাতে উত্তরপ্রদেশের উপরও ভরসা করছে রাজ্য।

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:১৩

ডেঙ্গির প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কায় তৎপর প্রশাসন। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে মঙ্গলবারই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে বসছেন। ডেঙ্গি মোকাবিলায় চিকিৎসা পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে পড়শি রাজ্য ওড়িশার সহায়তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে রাজ্য। পাশাপাশি, ওষুধের ঘাটতি মেটাতে উত্তরপ্রদেশের উপরও ভরসা করছে রাজ্য।

ডেঙ্গির নির্দিষ্ট কোনও চিকিৎসা এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। রোগীর উপসর্গ এবং শারীরিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই চিকিৎসা করা হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘সিম্পটোম্যাটিক ম্যানেজমেন্ট’ বলা হয়। এই চিকিৎসায় মূলত নর্মাল স্যালাইন (এনএস), রিঙ্গার ল্যাকটেট (আরএল) এবং জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ঘটনাচক্রে, ডেঙ্গি চিকিৎসায় ব্যবহৃত এই গুরুত্বপূর্ণ ওষুধগুলির জোগান দেওয়া রাজ্যের তিন সংস্থা পশ্চিমবঙ্গ ফার্মাসিউটিক্যালস, ফার্মা ইমপেক্স এবং নিভি রেমিডিজকে উৎপাদন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোল। ফলে ডেঙ্গির মরশুমে ওষুধের জোগান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সাধারণত বৃষ্টি থামার পরই ডেঙ্গির প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। স্বাস্থ্য দফতরের মন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ও জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর এই তিন মাসই রাজ্যে ডেঙ্গির মরসুম। ডেঙ্গির জীবাণু বহন করে মূলত দুই ধরনের মশা-এডিস ইজিপ্টাই এবং এডিস অ্যালবোপিক্টাস। এই দুই প্রজাতির মশার বংশবিস্তার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে মুখ্যমন্ত্রী এ দিন স্বাস্থ্য ভবনে বৈঠক ডেকেছেন। সেখানে স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকদের পাশাপাশি পুর ও নগরোন্নয়ন, সেচ এবং পরিবহণ দফতরের প্রতিনিধিদের থাকার কথা। কলকাতা ও হাওড়া পুরনিগম ছাড়াও রাজ্যের ২১টি পুরসভার আধিকারিকদেরও বৈঠকে ডাকা হয়েছে। ডেঙ্গির চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলা ওড়িশা এবং উত্তরপ্রদেশের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা হবে। এই বিষয়ে স্বাস্থ্য ভবনের একটি রিপোর্ট বৈঠকে পেশ করা হবে বলে জানা গিয়েছে।

২০২৪ সালে কর্নাটকে প্রসূতি মৃত্যুর জেরে ‘পশ্চিমবঙ্গ ফার্মাসিউটিক্যালস’কে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। উত্তরবঙ্গের চোপড়ায় তাদের প্লান্ট পরিদর্শন করে রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোল ফ্লুইড উৎপাদন চলাকালীন জীবাণুমুক্তকরণের প্রক্রিয়ায় ত্রুটি দেখতে পায়। ১০ ডিসেম্বর তাদের উৎপাদন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই নির্দেশ এখন‌ও বহাল।

যদিও তার পরেও ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজে ওই সংস্থার ফ্লুইড ব্যবহারের জেরে প্রসূতি মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়। ওই মাসেই স্বাস্থ্য দফতরের তরফে নির্দেশিকা জারি করে পশ্চিমবঙ্গ ফার্মাসিউটিক্যালসের বদলে ফার্মা ইমপেক্সকে নর্মাল স্যালাইন ও রিঙ্গার ল্যাকটেট সরবরাহের বরাত দেওয়া হয়। কিন্তু বারুইপুরের ওই সংস্থার সামগ্রীর গুণমান নিয়েও পরবর্তী সময়ে প্রশ্ন ওঠে। কেন্দ্রীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেন্ট্রাল ড্রাগ স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন (সিডিএসসিও) এবং রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোলের যৌথ পরিদর্শনে সংস্থাটির উৎপাদন ব্যবস্থায় ২৬ ধরনের গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়ে। এর পরই সংস্থাটির উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ জারি করা হয়। দুই সংস্থা নিষিদ্ধ হওয়ার পর বেহালার নিভি রেমিডিজ সরকারি বরাত পায়। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে খবর, সম্প্রতি সেই সংস্থাও রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোলের গুণমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এর জেরে ওই সংস্থার বিরুদ্ধেও উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ জারি হয়েছে। বেহালার সংস্থাটি ফ্লুইডের পাশাপাশি সরকারকে প্যারাসিটামল ইনফিউশনও সরবরাহ করত। সেই সরবরাহের উপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে সরকারকে প্যারাসিটামল ৬৫০ সরবরাহ করছে মাত্র একটি সংস্থা ডায়মন্ড ড্রাগস প্রাইভেট লিমিটেড।

বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ওড়িশার ইনফিউনেক্স প্রাইভেট লিমিটেড-কে বরাত দেওয়া হয়েছে। তবে ডেঙ্গির মরসুমে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবায় ফ্লুইডের বিপুল চাহিদা রয়েছে। ফলে শুধুমাত্র একটি সংস্থার পক্ষে সেই চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে এনএস, আরএল এবং প্যারাসিটামল ইনফিউশন সরবরাহের জন্য উত্তরপ্রদেশের সংস্থা কুণাল রেমিডিজের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। যদিও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, এর পরেও ফ্লুইডের ঘাটতি পুরোপুরি মিটবে কি না। স্বাস্থ্য ভবনের এক শীর্ষ আধিকারিক অবশ্য দাবি করেছেন, রাজ্যের কোথাও কোনও ঘাটতি নেই।

স্বাস্থ্য ভবনের হিসাব অনুযায়ী, সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থায় বছরে প্রায় ছ'লক্ষ ইউনিট আরএল এবং দু'লক্ষ ইউনিট এনএস প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি বছরে প্রায় আড়াই কোটি প্যারাসিটামল ৬৫০ ট্যাবলেট এবং এক কোটি প্যারাসিটামল ৫০০ ট্যাবলেটের প্রয়োজন হয়। প্যারাসিটামল ইনফিউশনের চাহিদা রয়েছে প্রায় ছ'লক্ষ ইউনিট। ইতিমধ্যেই ওড়িশার সংস্থাটি এক লক্ষ ইউনিট ফ্লুইড সরবরাহ করেছে। উত্তরপ্রদেশের সংস্থাটিও আগামী ১০ দিনের মধ্যে এনএস, আরএল এবং প্যারাসিটামল ইনফিউশন সরবরাহ করবে বলে জানিয়েছে। এর পাশাপাশি, বেহালার সংস্থাটিও কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট জমা দিয়েছে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে ড্রাগ কন্ট্রোল ছাড়পত্র দিলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলেই দাবি স্বাস্থ্য ভবনের ওই আধিকারিকের।

এ দিকে, ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে কলকাতা পুর এলাকায় চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত ভাবে পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সোমবার স্বাস্থ্য প্রশাসনের ডাকা বৈঠকে আয়ুষ্মান ভারতের পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনার নথি যাচাইয়ের কাজেও পুর চিকিৎসকদের যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত চিকিৎসকদের দাবি, কলকাতা শহরে আয়ুষ্মান ভারতের উপভোক্তার সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনার আওতায় অন্তত ১২ লক্ষ মানুষ রয়েছেন। তাঁদের নথি যাচাইয়ের দায়িত্বও চিকিৎসকদের দেওয়া হলে ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি ও চিকিৎসা পরিষেবার কাজে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এক পুর চিকিৎসক। জেলাগুলিতে প্রশাসনিক আধিকারিকেরা এই নথি যাচাইয়ের কাজ করছেন। তা হলে কলকাতায় কেন একই কাজ চিকিৎসকদের দিয়ে করানো হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মঙ্গলবার স্বাস্থ্যভবনে আয়োজিত বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।


Share