Samik Bhattacharya

কলকাতাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শহরে মধ‍্যে দ্রুত যোগাযোগ, দিল্লির ‘নমো ভারতের’ আদলে রাজ্যে দ্রুতগতির চারটি রেল করিডরের প্রস্তাব শমীকের

প্রস্তাবের সঙ্গে ওই রেল পরিষেবা চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বিস্তারিত প্রতিবেদন এবং পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষাও জমা দিয়েছেন শমীক। কলকাতাকে কেন্দ্র করে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ গড়ে তোলাই এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য।

রাজ্য বিজেপি সভাপতি তথা রাজ‍্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৫০

দিল্লির ‘নমো ভারত’-এর আদলে পশ্চিমবঙ্গেও আঞ্চলিক দ্রুতগতির রেল পরিষেবা চালুর প্রস্তাব দিলেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি তথা রাজ‍্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য। এই মর্মে তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মনোহরলাল খট্টরকে চিঠি দিয়েছেন। প্রস্তাবের সঙ্গে ওই রেল পরিষেবা চালুর সম্ভাবনা যাচাইয়ের বিস্তারিত প্রতিবেদন এবং পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষাও জমা দিয়েছেন শমীক। কলকাতাকে কেন্দ্র করে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ গড়ে তোলাই এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য।

প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় কলকাতা থেকে দক্ষিণবঙ্গের চার দিকে চারটি দ্রুতগতির রেলপথ তৈরির কথা বলা হয়েছে। প্রথম রেলপথটি হবে কলকাতা, কল্যাণী, কৃষ্ণনগর হয়ে মায়াপুর পর্যন্ত। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার। দ্বিতীয় রেলপথটি কলকাতা থেকে বর্ধমান, দুর্গাপুর হয়ে আসানসাল পর্যন্ত, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩২ কিলোমিটার। তৃতীয় রেলপথটি কলকাতা থেকে ফলতা, ডায়মন্ড হারবার, হলদিয়া হয়ে নন্দীগ্রাম পর্যন্ত, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১০২ কিলোমিটার। চতুর্থ রেলপথটি কলকাতা থেকে সাঁতরাগাছি, কলাঘাট, খড়্গপুর হয়ে মেদিনীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এই পথের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার।

শমীকের বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের নগরায়ণ এখনও অনেকটাই কলকাতাকেন্দ্রিক। অথচ দুর্গাপুর, আসানসোল, খড়্গপুর, কৃষ্ণনগর এবং হলদিয়ার মতো শহর ইতিমধ্যেই শিল্প, শিক্ষা, বন্দর এবং পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ফলে কলকাতার সঙ্গে এই শহরগুলির দ্রুত যোগাযোগের প্রয়োজন ক্রমশ বাড়ছে। বর্তমানে এই যোগাযোগ মূলত প্রচলিত রেলপথ ও সড়কপথের উপর নির্ভরশীল। যানজট এবং যাত্রীচাপের কারণে ঘন ঘন ও দ্রুত যাতায়াতের ক্ষেত্রে এই পরিকাঠামো যথেষ্ট নয় বলেই প্রস্তাবে দাবি করা হয়েছে।

শমীক জানিয়েছেন, দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলে যে ধরনের আঞ্চলিক দ্রুতগতির রেল পরিষেবা চালু হয়েছে, সেই আদলেই বাংলায় পরিষেবা গড়ে তোলা হলে কলকাতার সঙ্গে আশপাশের শহরগুলির যোগাযোগ অনেক দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য হতে পারে। প্রস্তাবিত রেলপথগুলিকে যতটা সম্ভব বিদ্যমান মহাসড়ক এবং রেলপথের পাশ দিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমবে বলে দাবি করা হয়েছে।

এই প্রকল্প পরিচালনার জন্য কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথ মালিকানায় একটি পৃথক সংস্থা তৈরির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত সংস্থার নাম রাখা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ আঞ্চলিক পরিবহণ নিগম। দিল্লির আঞ্চলিক দ্রুত পরিবহণ ব্যবস্থার আদলে এই সংস্থা প্রকল্পের পরিকল্পনা, নির্মাণ এবং পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারে বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রতিটি দ্রুতগতির রেলে তিনটি করে হালকা স্টিলের কামরা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। বেশি গতিতে চলার সময় বায়ুর বাধা কমানোর জন্য রেলের সামনের অংশ বিশেষ নকশায় তৈরি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পুরো ব্যবস্থায় এক হাজার ৪৩৫ মিলিমিটার প্রস্থের রেলপথ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। উড়ালপথ এবং ভূগর্ভস্থ অংশে দ্রুতগতির জন্য বিশেষ ধরনের পাথরবিহীন পাত বসানোর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। মাটির সমতলে এবং বাঁধের উপর দিয়ে যাওয়া অংশে পাথরযুক্ত প্রচলিত রেলপথ রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

রেল চলাচলের জন্য ২৫ হাজার ভোল্টের বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। উড়ালপথে নমনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের তার এবং সুড়ঙ্গের ভিতরে অপেক্ষাকৃত কম জায়গা প্রয়োজন এমন অনমনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রক, রেল মন্ত্রক এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যৌথ অংশীদারিত্ব রাখার কথা বলা হয়েছে। একটি প্রস্তাব অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রকের ২৫ শতাংশ, রেল মন্ত্রকের ২৫ শতাংশ এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ৫০ শতাংশ অংশীদারিত্ব থাকতে পারে। রাজ্যের অংশীদারিত্ব পরিবহণ, শিল্প এবং সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সংস্থাগুলির মাধ্যমে আসতে পারে বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পের জন্য জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা, এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্ক এবং বিশ্বব্যাঙ্কের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার কাছ থেকে উন্নয়ন সহায়তা ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাকি নির্মাণ ব্যয় কেন্দ্র ও রাজ্য যৌথ ভাবে বহন করতে পারে বলেও সমীক্ষায় বলা হয়েছে।

চিঠিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রককে প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখার আবেদন জানিয়েছেন শমীক। প্রস্তাবটি উপযুক্ত বলে বিবেচিত হলে রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রকৌশলগত সম্ভাব্যতা, যাত্রীচাহিদা এবং আর্থিক দিক খতিয়ে দেখে বিস্তারিত সমীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে একটি বড় মহানগরকেন্দ্র, ঘন জনবসতি, একাধিক নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র এবং নির্দিষ্ট যোগাযোগপথ বরাবর প্রবল যাতায়াতের চাহিদা রয়েছে। ফলে আঞ্চলিক দ্রুতগতির রেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় উপাদান রাজ্যে রয়েছে। প্রচলিত রেল ও সড়ক পরিবহণ ভবিষ্যতেও আঞ্চলিক যোগাযোগের মূল ভিত্তি থাকবে। তার পাশাপাশি দ্রুতগতির এই নতুন ব্যবস্থা চালু হলে কলকাতার বাইরেও শিল্প, ব্যবসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং জনবসতির বিস্তার ঘটতে পারে বলে সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন শহরের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ গড়ে উঠে একটি বৃহত্তর সমন্বিত অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ধাপে ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়ন, কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয় এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে প্রস্তাবিত পশ্চিমবঙ্গ আঞ্চলিক দ্রুত পরিবহণ ব্যবস্থা রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে বলে সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে।


Share