Ritabrata Banerjee

ঋতব্রতই বিরোধী দলনেতা, স্পিকারের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করল না কলকাতা হাই কোর্ট, বহাল রইল সিদ্ধান্ত

স্পিকারের সিদ্ধান্তে বৃহস্পতিবার কোনও হস্তক্ষেপ করল না হাই কোর্ট। বিচারপতি কৃষ্ণ রাও জানিয়েছেন, মামলার পরবর্তী শুনানি হবে আগামী ২৮ জুলাই।

ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ ০১:৫৯

বিধানসভার বিরোধী দলনেতার পদ নিয়ে দায়ের হওয়া মামলায় বিরোধী দলনেতার পদ নিয়ে দায়ের হওয়া মামলায় আপাতত কোনও অন্তবর্তী নির্দেশ জারি করল না কলকাতা হাই কোর্ট। ফলে স্পিকার রথীন্দ্র বসুর সিদ্ধান্ত বহাল থাকছে এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ই আপাতত বিরোধী দলনেতার দায়িত্বে বহাল থাকবেন। স্পিকারের সিদ্ধান্তে বৃহস্পতিবার কোনও হস্তক্ষেপ করল না হাই কোর্ট। বিচারপতি কৃষ্ণ রাও জানিয়েছেন, মামলার পরবর্তী শুনানি হবে আগামী ২৮ জুলাই। ওই দিনের মধ্যে সমস্ত পক্ষকে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন বিচারপতি।

২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে বিজেপির জয়লাভের পর তৃণমূলের পরিষদীয় দলে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তৃণমূলের অধিকাংশ বিধায়ক কার্যত বিরোধী দলীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। পরিষদীয় দলনেতা পদে দলের তরফে বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করা হলেও, সেই সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থনে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত হন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। এর আগেই ১ জুন ‘দলবিরোধী কার্যকলাপ’-এর অভিযোগে ঋতব্রতকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তৃণমূল নেতৃত্ব।

এই বিধানসভা ভোটে তৃণমূল ৮০ টি আসনে জয়লাভ করেছেন। সেকারণে তারাই প্রধান৷ বিরোধী দল। তৃণমূলের দাবি, দলের চেয়ারপার্সন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেবকে মনোনীত করেছিলেন। সেই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে গত ৯ মে স্পিকারের কাছে একটি চিঠিও পাঠানো হয়। অভিযোগ, ওই চিঠি পাওয়ার পরেও স্পিকারের তরফে এ বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে স্পিকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন। বুধবার মামলার শুনানিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি কৃষ্ণ রাও। তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরেও কী ভিত্তিতে ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হল, তা জানতে চান তিনি। পাশাপাশি, তৃণমূলের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রথম চিঠিকে কেন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এবং পরবর্তী চিঠির ভিত্তিতেই বা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, সে বিষয়েও স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে আদালত।

স্পিকারের আইনজীবীর সওয়াল ছিল, বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট আইন নেই। এটি বিধানসভার প্রচলিত নিয়ম মেনেই নির্ধারিত হয়। তাঁর দাবি, প্রথমে স্পিকারের কাছে যে চিঠি জমা পড়েছিল, তা পাঠিয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাতে কয়েক জন বিধায়কের সমর্থন ছিল। পরে দ্বিতীয় চিঠি জমা দেওয়ার সময় ৫৮ জন বিধায়ক স্বশরীরে স্পিকারের সামনে উপস্থিত হয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তাঁদের সমর্থন জানান। একই সঙ্গে তাঁরা নিজেদেরই দলের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বকারী গোষ্ঠী বলে দাবি করেন। সেই কারণেই স্পিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বুধবার আইনজীবী জয়দীপ কর ঋতব্রতের পক্ষে সওয়াল আদালতে করেছেন। তিনি জানান, ৬ মে-র প্রস্তাবপত্রে কোনও স্বাক্ষর ছিল না। তাই স্পিকার আরও নথি চেয়েছিলেন। বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে ঋতব্রত ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন পেয়েছেন। সেই কারণেই দলত্যাগবিরোধী আইন থাকা সত্ত্বেও বিদ্রোহী বিধায়কদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি।

অন্য দিকে, স্পিকার এবং ঋতব্রতের পেশ করা যুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে শোভনদেবের পক্ষে সওয়াল করেন আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। কল্যাণের দাবি, বিরোধী দলনেতা কে হবেন তা নির্ধারণ করার অধিকার রাজনৈতিক দলের, বিধায়ক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার নয়। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক দল ও পরিষদীয় দল এক বিষয় নয় এবং সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়েও রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ দলের শীর্ষ নেতৃত্ব শোভনদেবকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। তাই স্পিকারের দায়িত্ব ছিল সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা। কল্যাণের মতে, কয়েকজন বিধায়ক আলাদা গোষ্ঠী গঠন করে দলের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারেন না। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, দল থেকে বহিষ্কৃত কোনও ব্যক্তিকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া আইনসঙ্গত নয়।

বিরোধী দলনেতার পদ সংক্রান্ত মামলায় অন্তর্বর্তী নির্দেশের আবেদন জানানো হয়েছিল আদালতে। এই পরিস্থিতিতে সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বুধবার রায়দান স্থগিত রাখে আদালত। অবশেষে হাই কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিল, আপাতত ওই মামলায় কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ জারি করা হচ্ছে না।

আদালত এ কথা জানানোর পরে ঋতব্রত শিবিরের বিধায়ক সন্দীপন সাহা বলেন, “এটা আমাদের নৈতিক জয়। আমরা যা করেছি আইন মেনেই করেছি।”

 


Share