Fake Doctor

জাল শংসাপত্রে রেজিস্ট্রেশন, সরকারি ক্লিনিকেও চিকিৎসা! পর পর পাঁচ ‘ভুয়ো’ ডাক্তার ঘিরে তোলপাড়, চাওয়া হল উচ্চপর্যায়ের তদন্ত

অভিযোগ, সায়দুল-জুলফিকারের মতোই বিহার মেডিকেল কাউন্সিলের ভুয়ো শংসাপত্র ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিল (ডবলিউবিএমসি) থেকে রেজিস্ট্রেশন নিয়েছিলেন ওই তিন জন।

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:০১

বৃহস্পতিবারের পর শুক্রবারও। পূর্ব বর্ধমানের শেখ সায়দুল হক এবং উত্তর ২৪ পরগনার জুলফিকার মণ্ডলের পর এ বার স্ক্যানারে আরও তিন ‘ভুয়ো’ চিকিৎসক। অভিযোগ, সায়দুল-জুলফিকারের মতোই বিহার মেডিকেল কাউন্সিলের ভুয়ো শংসাপত্র ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিল (ডবলিউবিএমসি) থেকে রেজিস্ট্রেশন নিয়েছিলেন ওই তিন জন। বিষয়টি সামনে এসেছে খোদ বিহার কাউন্সিল অফ মেডিকেল রেজিস্ট্রেশনের (বিসিএমআর) তরফে।

অভিযোগ, তিন জনই দক্ষিণ ২৪ পরগনায় চিকিৎসা করেন। তাঁদের মধ্যে দু’জন রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার ক্লিনিকে কর্মরত। অর্থাৎ, ভুয়ো শংসাপত্রের ভিত্তিতে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে চিকিৎসা করার অভিযোগ উঠেছে সরকারি পরিষেবার সঙ্গেও যুক্ত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। পর পর দু’দিন ভুয়ো চিকিৎসকের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসায় স্বাভাবিক ভাবেই রাজ্য মেডিকেল কাউন্সিলের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কী ভাবে ভুয়ো শংসাপত্র যাচাই না করেই রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হল, উঠছে সেই প্রশ্নও। যদিও সায়দুল ও জুলফিকারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিহারের অভিন্ন রেজিস্ট্রেশন নম্বর এই তিন চিকিৎসক ডবলিউবিএমসিতে আবেদন করার সময় ব্যবহার করেননি।

তবে ওই তিন চিকিৎসক যে তিনটি বিহার মেডিকেল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ করেছিলেন—৪৮৫৩৩, ৪০৪৭৭ এবং ৪৫৭৮১—সেগুলিকেই ভুয়ো বলে দাবি করেছে বিসিএমআর। শুক্রবার অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড নার্সিংহোম (এপিএইচএন)-এর সম্পাদক রাজীব পান্ডেকে পাঠানো জবাবি ই-মেলে তিনটি রেজিস্ট্রেশন নম্বরই ভুয়ো বলে স্পষ্ট জানিয়েছে বিহার কাউন্সিল।

ঘটনার জেরে এ বার তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে। শুক্রবার বিভিন্ন চিকিৎসক সংগঠন এবং হাসপাতাল সংগঠনের তরফে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চেয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

রাজীবের দাবি, তাঁদের নবগঠিত সংগঠনে যাতে ‘বেনোজল’ ঢুকতে না পারে, সে জন্য বিভিন্ন জেলায় কমিটি গঠনের সময় একাধিক ব্যক্তির বিষয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে তাঁরা প্রায় ডজনখানেক ‘কীর্তিমান’-এর সন্ধান পান। তাঁদের মধ্যে প্রথমে সায়দুল ও জুলফিকার এবং পরে আরও তিন জন সরকারি চিকিৎসকের ডাক্তারি রেজিস্ট্রেশন ভুয়ো বলে অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে স্বাস্থ্য দফতর এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিকেল কাউন্সিলের (ডব্লিউবিএমসি) কাছে জমা দিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্তের দাবি জানানোর পাশাপাশি, তৃণমূল জমানায় ডব্লিউবিএমসি-র শীর্ষ পদে থাকা কর্তাদের অপসারণ ও সাসপেনশনের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে অ্যাসোসিয়েশন অফ পাবলিক হেলথ নার্সেস (এপিএইচএন)-এর অভিযোগ, ভিন্‌রাজ্য থেকে জাল এমবিবিএস এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রির নথি সংগ্রহ করে পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশন পাইয়ে দেওয়ার একটি চক্র সক্রিয় থাকতে পারে। এর পিছনে বেআইনি আর্থিক লেনদেনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি সংগঠনের। সরকারি চিকিৎসকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টর্সের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক মানস গুমটা বলেন, 'অবিলম্বে সর্বোচ্চ স্তরের তদন্ত চাই! ভাবাই যাচ্ছে না, মেডিকেল কাউন্সিলের দুর্নীতি কোন পর্যায়ে যেতে পারে! মানুষের জীবন নিয়ে এ ভাবে যারা ছিনিমিনি খেলছে বা খেলেছে, তাদের ঠান্ডা ঘর থেকে বের করে জেলে ভরতে হবে।'

একই সুর শোনা গিয়েছে অন্য চিকিৎসক সংগঠনের গলাতেও। ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের সভাপতি কৌশিক চাকী বলেন, 'এই অভিযোগ সত্যি হলে, তা নিছক প্রশাসনিক ভুল নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ অপরাধ।' তাঁর বক্তব্য, চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার আগে আবেদনকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং পূর্ববর্তী রেজিস্ট্রেশন যাচাই করা কাউন্সিলের মৌলিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে এমন গুরুতর ব্যর্থতার দায় বর্তমান সভাপতি, বর্তমান ও প্রাক্তন কাউন্সিল এবং সংশ্লিষ্ট কার্যনির্বাহী সদস্যদের কেউই এড়াতে পারেন না।

সরকারি চিকিৎসকদের আর একটি সংগঠন সার্ভিস ডক্টর্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সজল বিশ্বাসের বক্তব্যও একই রকম কঠোর। তিনি বলেন, 'চিকিৎসার ক্ষেত্রে জাল বা অবৈধ রেজিস্ট্রেশন নম্বর নিয়ে কেউ যদি চিকিৎসা করে থাকেন, এর চেয়ে ভয়ঙ্করতম অপরাধ আর কিছু হতে পারে না। এর ফলে বহু মানুষের জীবনহানির আশঙ্কাও রয়েছে, যা চিকিৎসা জগতেরও জন্যও চূড়ান্ত অবমাননা।' 


Share