Annapurna Yojona

অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না মেলায় বিক্ষোভ উত্তরবঙ্গে থেকে দক্ষিণবঙ্গে, অবরোধ-আন্দোলন, ভাঙচুর, বিক্ষোভের জোরে বৈঠক ছেড়ে নেমে আসতে বাধ্য হলেন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল

অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের টাকা না মেলে রাজ্যজুড়ে মহিলাদের অবরোধ-বিক্ষোভ। উপভোক্তাদের অভিযোগ, নথি যাচাই ও আবেদন অনুমোদিত হওয়ার পরেও টাকা মিলছে না; যোগ্য সকলকে দ্রুত টাকা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২১ আগস্ট ২০২৬ ০৯:১৬

অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না মেলায় রাজ্যের দিকে দিকে বিক্ষোভের চিত্র উঠে আসছে। রাজ্য সরকার ঘোষিত অন্নপূর্ণা যোজনার নিয়ে ক্ষোভ অব্যাহত। শুক্রবারও দক্ষিণবঙ্গ থেকে উত্তরবঙ্গ— বিভিন্ন জেলায় সরকারি দফতর, পুরসভা, বিডিও অফিস থেকে শুরু করে রেললাইন ও জাতীয় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখালেন মহিলারা। কোথাও প্রশাসনের কাছে দ্রুত টাকা দেওয়ার দাবি উঠেছে। আবার কোথাও নথি যাচাইয়ের নামে হয়রানির অভিযোগ সামনে এসেছে। বিক্ষোভের মুখে পড়েন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল।


শুক্রবার পশ্চিম মেদিনীপুরে গিয়েছিলেন পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। জেলাশাসকের অফিসে ঢোকার আগে একদফা প্রশ্নের মুখে পড়েন তিনি। মিটিং চলাকালীন অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়ায় বেশ কয়েক জন মহিলা প্রশাসনিক ভবনের নীচে জড়ো হন। বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে পূর্বনির্ধারিত বৈঠক ছেড়ে মন্ত্রী নীচে নেমে আসতে বাধ্য হন। সেখানে জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণা এবং স্থানীয় বিধায়ক শঙ্কর গুছাইতও উপস্থিত ছিলেন।


অগ্নিমিত্রা মহিলাদের উদ্দেশে বলেন, “একটু সময় দিন। সবে তো ১০০ দিন হয়েছে।” সঙ্গে সঙ্গে কোলাহাল বাড়ে। মন্ত্রী আবার বলেন, “আস্তে কথা বলুন। তা হলেই শুনতে পাব।” তিনি জানান, সমাধান চান বলেই তিনি বৈঠক ছেড়ে উঠে এসেছেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, অন্নপূর্ণার টাকা পেতে তাঁদের বারবার এক দফতর থেকে অন্য দফতরে পাঠানো হচ্ছে। কখনও এসডিও অফিস, কখনও পুরসভা—নথি জমা দেওয়ার পরেও টাকা মিলছে না। মন্ত্রী তাঁদের অভিযোগ শোনেন। সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেন। তিনি মহিলাদের এসডিও বা বিডিও অফিসে গিয়ে নাম, ফোন নম্বর এবং এনরোলমেন্ট নম্বর জমা দিতে বলেন। একই সঙ্গে জেলাশাসককে একজন নোডাল অফিসার নিয়োগের নির্দেশ দেন। মন্ত্রী জানতে চান, জুন ও জুলাই মাসে কেউ টাকা পেয়েছেন কি না। মহিলারা জানান, তাঁরা এক মাসের টাকাও পাননি। পরে ধীরে ধীরে বিক্ষোভকারীরা সেখান থেকে চলে যান।

অন্য দিকে, উত্তর ২৪ পরগনার বিরাটিতে অন্নপূর্ণা ভান্ডারের টাকা না পাওয়ার অভিযোগে রেললাইন অবরোধ করেন কয়েকশো মহিলা। দুপুরে বিরাটি স্টেশনের শেষ প্রান্তে তাঁরা ফ্লাইওভারের নীচে জমায়েত হন। তারপরে রেললাইনে বসে পড়েন। ফলে হাসনাবাদ-শিয়ালদহ ডাউন লোকাল দুপুর ১টা ৩৫ মিনিট নাগাদ বিরাটি স্টেশনে ঢোকার পর দাঁড়িয়ে যায়। এরপর একাধিক লোকাল বিভিন্ন স্টেশনে আটকে পড়ে। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। ফলত যাত্রীদের সমস্যায় পড়তে হয়। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যাত্রীদের বচসাও হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছোয়।

বিক্ষোভকারী মহিলাদের দাবি, অন্নপূর্ণা ভান্ডারের জন্য প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি একাধিকবার তথ্য যাচাইও হয়েছে। আবেদন অনুমোদিত দেখালেও তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা ঢোকেনি। অথচ অন্য অনেক উপভোক্তা টাকা পেয়ে গিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় ২০ তারিখের মধ্যে টাকা পৌঁছনোর কথা ছিল। সেই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরেও টাকা না মেলায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে। যোগ্য প্রত্যেক উপভোক্তাকে তাঁরা টাকা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বিরাটির পাশাপাশি হাবড়াতেও একই ইস্যুতে বিক্ষোভ দেখা যায়। রেললাইন অবরোধের পাশাপাশি হাবড়া পুরসভার সামনেও মহিলারা জড়ো হন। তাঁদের কটাক্ষ, অন্নপূর্ণা যোজনার নাম বদলে ‘ঢুকেছে কি ঢোকেনি’ রাখা উচিত। তাঁদের অভিযোগ, সাইবার ক্যাফেতে ফর্ম পূরণ, পুরসভা ও বিভিন্ন দফতরে নথি জমা এবং বাড়িতে গিয়ে তথ্য যাচাই— সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরেও টাকা মেলেনি। পুরসভায় এসে টাকা না পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে সেখানেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ। যোগ্যদের একসঙ্গে টাকা দেওয়ার পাশাপাশি যাঁদের তথ্য যাচাই বাকি রয়েছে, দ্রুত সেই প্রক্রিয়া শেষ করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

একই অভিযোগে তারকেশ্বর পুরসভার সামনে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখালেন কয়েকশো মহিলা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে আসে তারকেশ্বর থানার পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ১০ জুলাই পর্যন্ত আবেদনকারীদের ১৭ থেকে ২০ আগস্টের মধ্যে টাকা পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই টাকা পাননি। টাকা না পাওয়ার কারণ জানতে পুরসভায় এসে কোনও সদুত্তর মেলেনি। ফলত বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বিক্ষোভ চলার পর পুর প্রতিনিধি ও পুলিশের আশ্বাসে তা প্রত্যাহার করেন মহিলারা। এই একই দাবিতে গোঘাট-২ বিডিও অফিসেরও মহিলারা বিক্ষোভ দেখান। শুক্রবার সকালে উত্তরপাড়া-কোতরং পুরসভারতেও বিক্ষোভ চলে। টাকা না পেয়ে ২০ মিনিট জিটি রোড অবরোধ করা হয়। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

পাশাপাশি, ভোটের আগে বিজেপির তরফে বাড়ি বাড়ি প্রচারে গিয়ে তিন হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তোলেন। আবার চণ্ডীতলা-২ বিডিও অফিসেও অন্নপূর্ণা ভান্ডারের টাকা না পাওয়ার অভিযোগে মহিলারা বিক্ষোভে সামিল হন। আবার চুঁচুড়ার বিধায়ক সুবীর নাগের কার্যালয়ে বিক্ষোভ দেখানো হয়। বিধায়কের আশ্বাসের পরে বিক্ষোভ উঠে যায়।

এ দিন অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পেয়ে নদিয়ার করিমপুর-২ ব্লকে অফিসে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ ওঠে। কর্মীদের মারধর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে। নদিয়ার আরেক প্রান্ত, কল‍্যাণী পুরসভাতেও এই প্রকল্পের টাকা না পেয়ে বিক্ষোভ দেখান স্থানীয় মহিলারা।

বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরেও শুক্রবার বিক্ষোভের ছবি দেখা যায়। অন্নপূর্ণার টাকা না পাওয়ার অভিযোগে মহকুমাশাসকের দফতরের সামনে জড়ো হন মহিলারা। পরে রাস্তা অবরোধও করা হয়। খবর পেয়ে বিষ্ণুপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়। বিক্ষোভকারীদের হুঁশিয়ারি, দ্রুত টাকা না মিললে আগামী দিনে আরও বড় আন্দোলনে নামবেন তাঁরা। একই দিনে বড়জোড়া বিডিও অফিসেও বিক্ষোভ দেখান কয়েক জন মহিলা। তাঁদের বিক্ষোভের জেরে বাঁকুড়া-দুর্গাপুর রাজ্য সড়কেও যান চলাচল ব্যাহত হয়।

উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ারেও অন্নপূর্ণার টাকা নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। ধূপগুড়িতে প্রায় ২০০ মহিলা জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন। প্রথমে ধূপগুড়ি থেকে ফালাকাটাগামী ৩১ নম্বর জাতীয় সড়কে বসে পড়েন তাঁরা। পাশাপাশি বিডিও অফিসেও বিক্ষোভ দেখানো হয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটের আগে বিজেপির তরফে লক্ষ্মীর ভান্ডারের উপভোক্তাদের ৩ হাজার টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরে তাঁদের নানা শর্তের মধ্যে পড়তে হচ্ছে এবং যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও অনেকেই টাকা পাচ্ছেন না। অবরোধ তুলতে গেলে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তির পরিস্থিতিও তৈরি হয়।

অন্নপূর্ণা ভান্ডারের টাকা নিয়ে একাধিক জেলায় পরপর এই বিক্ষোভ ঘিরে এখন প্রশাসনের উপর চাপ বাড়ছে। উপভোক্তাদের একটাই দাবি—যাঁরা যোগ্য, তাঁদের দ্রুত টাকা দিতে হবে। নথি যাচাইয়ের নামে হয়রানি বন্ধ করতে হবে।

বাদ যায়নি কলকাতাও। এ দিন দুপুরে ফুলবাগানে প্রায় দেড়শো জন মহিলা রাস্তা আটকে পুরসভার বোরো অফিসের বিক্ষোভ দেখানো হয়। পরে ফুলবাগান থানার পুলিশ সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

উল্লেখ্য, গতকাল থেকেই এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। আরামবাগে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পৌঁছোতেই মহিলারা বিক্ষোভ দেয়ায়। ওই দিনই কোচবিহারের রাজ‍্যের মন্ত্রী মালতী রাভা রায়ের বাড়িতে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পেয়ে বিক্ষোভ দেখান স্থানীয় মহিলারা।


Share