Suvendu Adhikari

ধুলিয়ানে সুজিত খুনে পুলিশের গাফিলতি! সিআইডি তদন্তের নির্দেশ, সাসপেন্ড দুই পুলিশকর্মী, আইসি ক্লোজ—শাস্তিমূলক বদলি এসডিপিওর

পুলিশ আধিকারিক এবং কর্মী মিলিয়ে চার জনকে শাস্তি দেওয়ার কথা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, যিনি রাজ্যের পুলিশমন্ত্রীও বটে। এই ঘটনায় রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতর জঙ্গিপুর পুলিশ জেলার সুপার সুরিন্দর সিংহকে শোকজ করেছে।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
নিজস্ব সংবাদদাতা, মুর্শিদাবাদ
  • শেষ আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৪৫

মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে এক যুবককে খুনের ঘটনায় ‘নিচুতলার’ পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ। পুলিশ আধিকারিক এবং কর্মী মিলিয়ে চার জনকে শাস্তি দেওয়ার কথা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, যিনি রাজ্যের পুলিশমন্ত্রীও বটে। এই ঘটনায় রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতর জঙ্গিপুর পুলিশ জেলার সুপার সুরিন্দর সিংহকে শোকজ করেছে। তাঁকে কারণ দর্শাতে বলার পাশাপাশি সতর্কও করা হয়েছে।

গত ২৮ অগস্ট মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুজিত মণ্ডল বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। তার পর তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি। গত ২ সেপ্টেম্বর ফরাক্কার ফিডার ক্যানালের পাশ থেকে ৩৬ বছর বয়সি ওই যুবকের খণ্ডবিখণ্ড দেহ পাওয়া যায়। এই খুনের ঘটনায় ইতিমধ্যেই তিনজনকে গ্রেফতার করা হলেও নিচুতলার পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন যে, নিহতের স্ত্রী পুলিশকে জানালেও নিচুতলার পুলিশের কাজে গাফিলতি ছিল।

ধুলিয়ানে যুবক খুনের ঘটনায় রাজ্য প্রশাসন তদন্তভার সিআইডির হাতে তুলে দিল। একই সঙ্গে কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে চার পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা হয়েছে। ধুলিয়ান পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ তথা এএসআই সুমন্ত দাস এবং শমসেরগঞ্জ থানার এসআই (সেকেন্ড অফিসার) সইফুল আলমকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজ্যের পুলিশমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শমসেরগঞ্জ থানার আইসি সুব্রত ঘোষকে পুলিশ লাইনে ক্লোজ করার কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি ফরাক্কার এসডিপিও শেখ সামসুদ্দিনকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে।

সোমবার সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী জানান, গত ২৮ অগস্টই নিখোঁজ যুবক সুজিত মণ্ডলের স্ত্রী সুমনা মণ্ডল পুলিশের কাছে মিসিং ডায়েরি করেছিলেন। পরে ৩০ অগস্ট এফআইআর দায়ের করা হয়। সুমনার অভিযোগ, ২৮ অগস্ট সকালে রিয়ান আখতার নামে এক যুবক ফোন করে তাঁর স্বামীকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান। তার পর থেকেই সুজিত নিখোঁজ ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ২ সেপ্টেম্বর ফরাক্কার ফিডার ক্যানালের পাশ থেকে সুজিতের খণ্ডবিখণ্ড দেহ উদ্ধার হয়। ঘটনায় ইতিমধ্যেই পুলিশ সামিউল শেখ, তাজকিরা বিবি এবং জনি শেখ নামে তিন জনকে গ্রেফতার করেছে। তবে নিখোঁজের অভিযোগ পাওয়ার পরেও পুলিশ যথাযথ পদক্ষেপ করেনি বলে অভিযোগ ওঠে। সেই গাফিলতির অভিযোগেই পুলিশের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সোমবার রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর শুভেন্দু এই ঘটনায় উদ্বেগপ্রকাশ করে বলেন, “হরগোবিন্দ দাস, চন্দন দাসদের মতো করে খুন করা হয়েছে। পুলিশকে জানানো হলেও স্থানীয় পুলিশের তরফে গাফিলতি রয়েছে। নিচুতলার পুলিশ গুরুত্ব দেয়নি। তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগের।” মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ধুলিয়ানের এই খুনের ঘটনায় আইজি জোনাল বিভাগীয় তদন্ত করবেন। পুলিশ সূত্রের দাবি, পূর্বপরিকল্পনা করেই সুজিত মণ্ডলকে খুন করা হয়েছিল। অভিযোগ, ২৮ অগস্ট ফোন করে তাঁকে ডেকে নিয়ে ধুলিয়ানের একটি নির্জন জায়গায় শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়। এরপর প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে দেহটি টুকরো করে দু’টি সিমেন্টের বস্তায় ভরা হয়। পরে মোটরসাইকেলে করে সেই বস্তা বল্লালপুর ঘাটে নিয়ে গিয়ে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান।

তবে নদীতে প্রবল স্রোত থাকায় এখনও দেহের বাকি অংশের সন্ধান মেলেনি। সেগুলির খোঁজে স্পিডবোট এবং ডুবুরি নামিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া দেহাংশ ইতিমধ্যেই ময়নাতদন্তের জন্য জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। নিহতের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ফরেন্সিক পরীক্ষার পাশাপাশি ডিএনএ পরীক্ষাও করা হবে বলে পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সুজিতের পরিবারের তরফে নিখোঁজ ডায়েরি দায়ের হওয়ার পরই তদন্তে নামে পুলিশ। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ এবং কল ডিটেলস খতিয়ে দেখে একে একে তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তকারীদের হাতে আসে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। এরপর ২ সেপ্টেম্বর বিকেলে ফরাক্কার বল্লালপুর ঘাট এলাকা থেকে প্লাস্টিক ও বস্তায় মোড়া অবস্থায় সুজিতের দেহাংশের কিছু অংশ উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, ব্যবসায়িক বিবাদের জেরেই এই খুনের ঘটনা ঘটেছে।

ধুলিয়ানের এই খুনের ঘটনা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কথা বলতে গিয়ে হরগোবিন্দ ও চন্দন খুনের প্রসঙ্গও তোলেন। গত বছর সংশোধিত ওয়াকফ আইনের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে মুর্শিদাবাদ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। জঙ্গিপুরের শমসেরগঞ্জ, সুতি, ধুলিয়ান-সহ একাধিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল হিংসা। সেই অশান্তির মধ্যেই শমসেরগঞ্জে খুন হন হরগোবিন্দ ও তাঁর ছেলে চন্দন।

অভিযোগ ছিল, বাড়ির ভিতর থেকে বাবা-ছেলেকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে এসে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়। ওই ঘটনায় জঙ্গিপুর আদালত ১৩ জন অভিযুক্তকে গত বছরের ডিসেম্বরে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দেয়। তবে বিচারকের পর্যবেক্ষণ ছিল, রাজনৈতিক বিরোধের কারণে নয়, ব্যক্তিগত রোষের জেরেই ওই জোড়া খুনের ঘটনা ঘটেছিল। হরগোবিন্দ-চন্দন খুনের ঘটনা ঘিরে সে সময় তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছিল রাজ্যে।


Share