Surendranath College

নেই ল‍্যাব, হয় না ক্লাস, তাও নেওয়া হয়েছে টাকা, দিনের পর দিন শোষিত হয়েছেন ছাত্রছাত্রীরা, ‘জঙ্গলরাজ’ সুরেন্দ্রনাথ কলেজে

এই বিষয়ে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে ফোন করা হয়েছিল। তিনি ফোন ধরেননি। দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে কানকাটা দেবু বর্তমানে পলাতক। তাঁর খোঁজে সমস্ত সম্ভাব্য ঠিকানায় চিরুনি তল্লাশি পুলিশ শুরু করেছে।

দুর্নীতির সাতকাহন সুরেন্দ্রনাথ কলেজে।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ ০৫:৩২

কোনও ক্লাস হত না। ল্যাবের সুবিধা নেই। তার পরেও দিনের পর দিন সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে বিভিন্ন বাহানায় হাজার হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগ, তাঁরা দিনের পর দিন শোষিত হয়েছেন। কার্যত ‘জঙ্গলরাজ’ চালানো হয়েছে।

সাধারণ কলা বিভাগের একজনের কাছ থেকে ছ’টি সেমেস্টারে ১৯ হাজার ১৭০ টাকা নেওয়া হবে বলে প্রথমে জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই খরচ এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৩৭০ টাকা। ওই ছাত্রীর দাবি, তিনি বারে বারে অফিসকর্মীদের কাছে জানার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু প্রতিবারই তাঁকে সদুত্তর না দিয়েই ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় সেমেস্টারের খরচ বাবদ ওই ছাত্রী কলেজকে দিয়েছেন পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা। কলেজের দেওয়া রিসিপ্টে মোট ১২টি খাতে টাকা জমা দেওয়ার হিসেব দেওয়া রয়েছে। ল‍্যাবরেটরির খরচ বাবদ এক হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাধারণ কলা বিভাগে কোনও ল‍্যাবটারির প্রাক্টিকাল নেই। ওই বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের জন্য তা বরাদ্দ করা হয় না। টিউশন বাবদ প্রতি জনের কাছ থেকে ৩০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে।

অন‍্য দিকে, কলেজ ভবনের উন্নয়নের জন‍্য ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়। প্রতিটি সেমেস্টারে টাকা জমা দেওয়ার সময় এই টাকা নেওয়া হয়। উন্নয়ন বাবদ খরচ হিসেবে ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। আবার সাধারণ আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ ২৫০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। ওই বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা একাধিক বার কলেজের কর্মীদের জিজ্ঞাস করতে গিয়েছেন। প্রতিবারই তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকী, কেন তাঁরা এত বার জিজ্ঞাসা করতে অফিসে যাচ্ছে তা নিয়ে কলেজের তৃণমূলের মাতুব্বরদের দিয়ে শাসানি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করছেন।

কিন্তু সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ব‍্যাগভর্তি টাকার ব‍্যাগ উদ্ধারের ঘটনা সামনে আসার পরে ওই কলেজের পাঁচতলায় একাধিক বন্ধ ঘরের হদিশ মিলেছে। হদিশ মিলেছে দু’টি বিলাসবহুল বেডরুমের। কলেজে টাকা দিয়ে পড়তে আসা পড়ুয়াদের একাংশের অভিযোগ, এই টাকা কানকাটা দেবু ওরফে দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর ছেলে শিবাসিস বন্দ্যোপাধ্যায়, শুভজিৎ বর্মণ, শুভজিৎ চক্রবর্তী, সুকান্ত বাহাদুর এবং রাতুল ঘোষেরা আমেদপ্রোমোদ করেছে।

বৃহস্পতিবার কলেজের ঠিকাদার পরিতোষ দত্তকে বর্ধমা‍ন থেকে কলকাতা পুলিশ গ্রেফতার করে। ধৃত পরিতোষ কলেজ পরিচালন সমিতির প্রাক্তন সভাপতি দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে ‘কানকাটা দেবু’র ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিল। কলেজের অশিক্ষক কর্মীরা জানাচ্ছেন, এই পরিতোষ দত্তের সংস্থার কাছ থেকে কলেজের সমস্ত জিনিসপত্র আসত। সেসব জিনিস কেনার জন্য ই-টেন্ডারের আইনকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখানো হত। যা জিনিসপত্র আসত বিলে তার চেয়ে বেশি টাকা দেখানো হত। পরিতোষের বিল না ছাড়লে কলেজের অর্থ বিভাগের কর্মীদেরও হুমকি দিত এই কানকাটা দেবু এবং তাঁর ছেলে শিবাশিষ বন্দ্যোপাধ্যায়।

২০১১ সালের পর থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কার্যত কলেজের তহবিলের টাকা লুঠ করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এই টাকা ঘুরপথে টাকা তৃণমূল নেতাদের পকেটে যেত বলেও অভিযোগ করা হচ্ছে। যদিও কলেজে আর্থিক অনিয়ম নিয়ে মুচিপাড়া থানায় এখনও কোনও অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। পালাবদলের পরেও ভয় তাঁদের যেন কাটতেই চাইছে না। ১৫ বছর ধরে চলে আসা সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ‘জঙ্গলরাজ’ নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের একাংশ ক্ষোভ ফুঁসছেন।

এই বিষয়ে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে ফোন করা হয়েছিল। তিনি ফোন ধরেননি। দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে কানকাটা দেবু বর্তমানে পলাতক। তাঁর খোঁজে সমস্ত সম্ভাব্য ঠিকানায় চিরুনি তল্লাশি পুলিশ শুরু করেছে।


Share