Malaria

ম্যালেরিয়া ফিরে আসা রুখতে এক ডোজের নতুন ওষুধ! কলকাতা মেডিকেল কলেজে চলছে ট্রায়াল

মাত্র এক ডোজের এই ওষুধ ম্যালেরিয়া ফিরে আসার আশঙ্কা কমাতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা। বর্তমানে কলকাতা মেডিকেল কলেজ-সহ দেশের কয়েকটি কেন্দ্রে এই ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। ট্রায়াল শেষ হলে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে।

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৫:২৮

ম্যালেরিয়া থেকে সেরে ওঠার কয়েক মাস পরেই ফের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা! বিশেষ করে প্লাসমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স (P. vivax) ম্যালেরিয়ার ক্ষেত্রে রোগের পুনরাবৃত্তি বা ‘রিল্যাপ্স’ চিকিৎসকদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। এই সমস্যা মোকাবিলায় আশার আলো দেখাচ্ছে নতুন ওষুধ ট্যাফেনোকুইন। মাত্র এক ডোজের এই ওষুধ ম্যালেরিয়া ফিরে আসার আশঙ্কা কমাতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা। বর্তমানে কলকাতা মেডিকেল কলেজ-সহ দেশের কয়েকটি কেন্দ্রে এই ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। ট্রায়াল শেষ হলে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে।

এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মুখ্য গবেষক প্রফেসর ডা. অরুণাংশু তালুকদার জানান, সাধারণত ম্যালেরিয়ার জ্বর কমাতে ক্লোরোকুইন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ভাইভ্যাক্স ম্যালেরিয়ার জীবাণু লিভারে সুপ্ত অবস্থায় থেকে যেতে পারে। ক্লোরোকুইন রক্তে থাকা জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করলেও লিভারে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত জীবাণু নির্মূল করতে পারে না। ফলে এক মাস, দু’মাস কিংবা ছ’মাস পরেও ফের ম্যালেরিয়ার জ্বর দেখা দিতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই ঘটনাকেই বলা হয় ‘রিল্যাপ্স’।

ডা. তালুকদারের কথায়, এই সমস্যা এড়াতে ক্লোরোকুইনের পাশাপাশি রোগীদের সাধারণত ১৪ দিন ধরে প্রাইমাকুইন খেতে হয়। কিন্তু জ্বর কমে যাওয়ার পর অনেকেই নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ওষুধ খান না। ফলে লিভারে থাকা সুপ্ত জীবাণু থেকে ফের সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। এই সমস্যার সমাধান খুঁজতেই ট্যাফেনোকুইনের কার্যকারিতা যাচাই করা হচ্ছে। গবেষকদের আশা, একবার এই ওষুধ খাওয়ালেই সুপ্ত জীবাণু নির্মূল করার ক্ষেত্রে তা কার্যকর হতে পারে এবং রোগের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

গবেষক জানান, ট্যাফেনোকুইন সিঙ্গল-ডোজ বা একবারে সেবনযোগ্য ওষুধ। ভারতে চলা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে মূলত দেশের মানুষের শরীরে ওষুধটির কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুসারে আইসিএমআর এই গবেষণার কাজ পর্যবেক্ষণ করছে। গুজরাত, মুম্বই এবং কলকাতায় চলছে ট্রায়াল। গত দু’বছর ধরে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে এই গবেষণা চলছে।

ডা. তালুকদারের দাবি, ট্রায়াল এখন শেষ পর্যায়ে। আর মাত্র আটজন রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে সেই কাজ শেষ করার আশা রয়েছে। এরপর সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে ওষুধটির কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সব কিছু অনুকূলে থাকলে পরবর্তী পর্যায়ে ওষুধটি ব্যবহারের বিষয়ে পদক্ষেপ করা হতে পারে।

গবেষকের বক্তব্য, পরিকল্পনা রয়েছে ওষুধটি বাজারে বিক্রির পরিবর্তে সরকারি হাসপাতালের মাধ্যমে বিনামূল্যে রোগীদের দেওয়ার। তবে ট্যাফেনোকুইন সকলকে দেওয়া যাবে না। ওষুধটি দেওয়ার আগে নির্দিষ্ট একটি এনজাইমের মাত্রা পরীক্ষা করতে হবে। সেই এনজাইমের মাত্রা কম থাকলে ওষুধটি দেওয়া নিরাপদ নয়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার পরেই এই ওষুধ ব্যবহার করা যাবে।

বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. রজত বাসু বলেন, “ক্লোরোকুইনের সঙ্গে ট্যাফেনোকুইনের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ম্যালেরিয়ার চিকিৎসার পর রোগের পুনরাবৃত্তি বা রিল্যাপ্স প্রতিরোধে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। একজন জনস্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে এই ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে আমি আশাব্যঞ্জক বলে মনে করি। তবে ওষুধটির প্রকৃত কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে ট্রায়ালের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা জরুরি।”

ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় নতুন এই ওষুধ কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর গবেষক মহলের। ট্রায়ালের ফল ইতিবাচক হলে ভাইভ্যাক্স ম্যালেরিয়ার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর ক্ষেত্রে চিকিৎসার নতুন দিশা খুলতে পারে।


Share