Health

পুরনো সিটি স্ক্যান রিপোর্ট এডিট করে নতুন রোগী! স্বাস্থ্যসাথীর বিপুল তহবিল নয়ছয়ের অভিযোগ, স্বাস্থ্য ভবনের তদন্তে একের পর এক অনিয়ম

অন্য দিকে, অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে আলাদা প্যাকেজ রয়েছে এবং সেখানে চিকিৎসার খরচের সীমা নির্ধারিত। অভিযোগ, পূর্ব বর্ধমানের ওই নার্সিংহোমে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন থাকা রোগীদের ‘মেডিকেল ম্যানেজমেন্ট প্যাকেজ’-এর আওতায় ভর্তি দেখানো হয়েছে।

প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২৬ ১২:৩৯

স্বাস্থ্য পরিষেবা আরও সহজলভ্য করার লক্ষ্যে সপ্তাহখানেক আগেই চালু হয়েছে ‘আয়ুষ্মান ভারত’। তবে বিভিন্ন শর্তের কারণে কেউ এই প্রকল্পের সুবিধা থেকে বাদ পড়লে তাঁদের জন্য ‘মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনা’ রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ‘স্বাস্থ্যসাথী’ও। অভিযোগ, রাজ্য সরকারের এই ত্রিমুখী স্বাস্থ্য বিমা ব্যবস্থার বিপুল তহবিলের দিকে এক শ্রেণির অসাধু নার্সিংহোম ও ব্যবসায়ীর নজর পড়েছে। স্বাস্থ্য ভবনের অভ্যন্তরীণ তদন্তেই এই ধরনের একাধিক ‘অনিয়ম’-এর হদিস মিলেছে বলে অভিযোগ।

সম্প্রতি পূর্ব বর্ধমানের একটি বেসরকারি মাল্টি স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে স্বাস্থ্য ভবনের প্রতিনিধি দল আচমকা পরিদর্শনে যায়। সেই পরিদর্শনেই স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের আওতায় ভুয়ো বিল তৈরি করে সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ অর্থ নয়ছয়ের অভিযোগ সামনে আসে। বিষয়টি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে খবর, মূলত চারটি ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ ধরা পড়েছে। স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে ‘মেডিকেল ম্যানেজমেন্ট প্যাকেজ’ নামে একটি বিভাগ রয়েছে। এই প্যাকেজের আওতায় কোনও রোগীকে ভর্তি করানো হলে চিকিৎসার খরচের নির্দিষ্ট কোনও ঊর্ধ্বসীমা নেই। অন্য দিকে, অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে আলাদা প্যাকেজ রয়েছে এবং সেখানে চিকিৎসার খরচের সীমা নির্ধারিত। অভিযোগ, পূর্ব বর্ধমানের ওই নার্সিংহোমে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন থাকা রোগীদের ‘মেডিকেল ম্যানেজমেন্ট প্যাকেজ’-এর আওতায় ভর্তি দেখানো হয়েছে। এর পর সেই অনুযায়ী ভুয়ো বিল তৈরি করে প্রকল্পের অর্থ নয়ছয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

স্বাস্থ্য ভবনের এক আধিকারিকের দাবি, অর্থোপেডিক অস্ত্রোপচারের খরচ যেখানে সাধারণত ৩০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা, সেখানে ‘মেডিকেল ম্যানেজমেন্ট প্যাকেজ’-এর আওতায় ব্রেন স্ট্রোকের চিকিৎসার খরচ দেখানো হয়েছে ৯০ হাজার টাকা। এমন ১৪টি ঘটনার সন্ধান মিলেছে বলে খবর। শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের আওতায় যে রোগের চিকিৎসা পরিষেবা নেই, সেই রোগে আক্রান্ত রোগীদের ভর্তি করিয়ে প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত অন্য রোগের চিকিৎসা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। পরিদর্শক দলের এক সদস্য তথা স্বাস্থ্য ভবনের আধিকারিকের কথায়, “মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচার করেন নিউরো সার্জনেরা। হাসপাতালের নথি বলছে, মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচার করেছেন অর্থোপেডিক সার্জন!”

বেসরকারি নার্সিংহোম অ্যাসোসিয়েশনের একাধিক সদস্যের দাবি, পূর্ব বর্ধমানে যে ঘটনা সামনে এসেছে, তা আসলে ‘হিমশৈলের চূড়া’। তাঁদের অভিযোগ, রাজ্যের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই একাধিক বেসরকারি নার্সিংহোম ও হাসপাতাল একই কায়দায় বেআইনি ভাবে আয় করছে। কী ভাবে নিউরো মেডিসিনের রোগীকে অর্থোপেডিক চিকিৎসার রোগী হিসেবে দেখিয়ে বিল তৈরি করা সম্ভব? স্বাস্থ্য ভবনের এক আধিকারিকের দাবি, পুরনো ব্রেন স্ট্রোকের রোগীদের সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট সংগ্রহ করে রাখা হচ্ছে। পরে কোনও অর্থোপেডিক রোগীকে ব্রেন স্ট্রোকের রোগী হিসেবে দেখাতে সেই পুরনো রিপোর্টই ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু রিপোর্টে থাকা রোগীর নাম এবং সিটি স্ক্যানের তারিখ কম্পিউটারের মাধ্যমে এডিট করে বদলে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।

এক শ্রেণির নার্সিংহোম মালিকেরা যে এ ধরনের দুর্নীতিতে জড়িত, তা স্বীকার করছে অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড নার্সিংহোম। সংগঠনের সম্পাদক রাজীব পান্ডে বলেন, ‘‘এ ধরনের দুর্নীতির পক্ষে আমরা নই। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে স্বচ্ছতার সঙ্গে যাতে পৌঁছোয় সেটাই আমরা চাই। সেই জন্য দুর্নীতিতে লিপ্ত এ ধরনের নার্সিংহোম, হাসপাতালকে আমরা সংগঠনের সদস্য করব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’’

আর যে নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তার অন্যতম কর্ণধার পঙ্কজ মুখোপাধ্যায় বলেন, “গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য ভবনের চিঠি আমরা পেয়েছি। আমাদের মোট চারটে হাসপাতাল রয়েছে। কোথায় কী হচ্ছে তার সবটা মালিকের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। আমাদের ইন্টারনাল অডিট চলছে। সোমবার রিপোর্ট পেলে এ বিষয়ে বক্তব্য জানাতে পারব। স্বাস্থ্য ভবনকেও সে কথা জানানো হয়েছে।”


Share