Cyber Crime

টাওয়ার বসানোর নামে প্রতারণা, উদ্ধার বিপুল পরিমাণ মোবাইল ফোন, কসবা থেকে গ্রেফতার ৬৬ জন, হেফাজতে নিল পুলিশ

গত ছয় মাসে প্রায় ১০০টি ভুয়ো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। গ্রাহকদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য বিভিন্ন কোম্পানি, ব্যাঙ্ক ও সরকারি দফতরের জাল অনুমোদনপত্র দেখানো হত বলে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন।

বুধবার সাইবার প্রতারণার চক্রের বড়সড় অভিযান চালাল পুলিশ।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:২১

বাড়িতে মোবাইলের টাওয়ার বসাতে চান? মোটা টাকা রোজগারের সুযোগ রয়েছে। ফাঁদে পা দিয়ে রাজি হলেই নেওয়া হত অগ্রিম টাকা। কিন্তু বসতো না টাওয়ার। টাকা চলে যেত প্রতারকদের পকেটে। বুধবার সাইবার প্রতারণার চক্রের বড়সড় অভিযান চালাল পুলিশ। ঘটনায় ৬৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত হয়েছে। ধৃতদের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

গত ২ সেপ্টেম্বর দুপুরে গোপন সূত্রে খবর পেয়ে কসবা থানার এলাকার রাজডাঙা মেন রোডের একটি বাড়িতে অভিযান চালায় সাইবার অপরাধ দমন শাখার গোয়েন্দারা। একেবারে ঝাঁ চকচকে অফিস। দেখে মনে হবে যেন ঠিকঠাক কাজ চলছে। সব কর্মীদের কাছে একটি করে মোবাইল ফোন রয়েছে। সামনে রয়েছে টেবিল। সবাই তাঁদের গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলছেন। তাঁদের পরিষেবা দিচ্ছেন। কথা বলার পরে ডায়েরিতে লিখে রাখছেন। আদতে তা স্বচ্ছ বলে মনে হলেও কিন্তু তা নয়। কথার ফাঁকে রয়েছে প্রতারণার ফাঁদ। কীভাবে মানুষকে ঠকিয়ে টাকা আদায় করা যায় তারই করা হচ্ছে পরিকল্পনা।

পুলিশ সূত্রের খবর, তাঁরা রোবাস্ট ডিজিটাল সলিউশন নামে একটি সংস্থার হয়ে কাজ করে। পাটুলি থানা এলাকায় এই সংস্থাটির অফিস ছিল। একমাস আগেই ঠিকানা বদল করেছে। ঠিকানা বদল করে কসবার রাজডাঙা মেন রোডের আস্তানা তৈরি করে। তবে পাটুলির ঠিকানা কী কারণে বদল করা হল তা নিশ্চিত করা যায়নি। এই নিয়ে কলকাতা পুলিশও কিছু জানায়নি।

পুলিশ জানতে পেরেছে, এই অফিসে বসে বিভিন্ন মোবাইলের নেটওয়ার্কের সংস্থার নাম করে সাধারণ মানুষকে ফোন করত। কেউ নিজেকে জিও-র কর্মী বলত, আবার কেউ নিজেকে এয়ারটেলের কর্মী পরিচয় দিত। বাড়িতে ৫জি টাওয়ার বসাতে চান কি না তা ফোনে ওপারে থাকা ব‍্যাক্তিকে জিজ্ঞেস করা হত। জমির কাগজপত্র নেওয়া হত। যদি কেউ এদের পাতা ফাঁদে পা দিত, তাদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে নিত। অগ্রিম টাকার বিনিময়ে বলা হত, সংস্থা থেকে প্রতিনিধি তাঁর বাড়িতে যাবেন। কীভাবে টাওয়ার বসানো হবে তা পরীক্ষা করে দেখবেন। তা নিশ্চিত হলেই টাওয়ার বসানো হবে। তার পর থেকে প্রতিমাসে ভাড়া বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা পেয়ে যাবেন ওই ব্যক্তি। এ ভাবে কারও কাছ থেকে ৯০ হাজার আবার কারও কাছ থেকে দেড় লক্ষ টাকা নেওয়া হত। এটাকে প্রতীকী ভাষায় ‘প্রসেসিং ফি’ বলত।

শুধু তা-ই নয়, বেশ কিছু ডায়েরি তাঁদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাতে ‘প্রতারণার স্ক্রিপ্ট’ লেখা রয়েছে। কীভাবে ফাঁদে ফেলা যাবে, ফোনের ওপারে থাকা ব‍্যক্তি কী জিজ্ঞাস করলে তার উত্তর কী হবে তা-ও লেখা রয়েছে বাজেয়াপ্ত হওয়া ডায়েরিতে। তাতে কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে তার হিসেব লেখা রয়েছে। বিপুল সংখ্যক ফোন নম্বরের তথ্য তাদের কাছ থেকে মিলেছে। এত বিপুল পরিমান মোবাইল নম্বর কোথা থেকে এল তা নিয়েও স্পষ্ট ভাবে পুলিশ জানায়নি। সবটাই তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।

এ ছাড়াও, বিভিন্ন বিমা সংস্থার নাম করে আকর্ষণীয় রিটার্নের গল্প ফাঁদা হত। যে পলিসি প্যাকেজের আদৌ কোনও অস্তিত্ব নেই সেখানে বিনিয়োগ করতে বলা হত। এমন স্বাস্থ্যবিমার গ্যারান্টির কথা বলা হত যা কার্যত অসম্ভব। কম সুদে ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত ঋণ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হত। এটাকে হাতিয়ার করে বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে বলা হত। তদন্তকারীদের দাবি, এই অ্যাকাউন্টগুলির বেশিরভাগই ছিল মিউল অ্যাকাউন্ট। গত ছয় মাসে প্রায় ১০০টি ভুয়ো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। গ্রাহকদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য বিভিন্ন কোম্পানি, ব্যাঙ্ক ও সরকারি দফতরের জাল অনুমোদনপত্র দেখানো হত বলে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন।

প্রথমে ভুয়ো কল সেন্টারে অভিযান চালিয়ে ২৩ জন মহিলা ও ১৭ জন পুরুষ-সহ মোট ৪০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলে এক ব্যক্তির নাম উঠে আসে। সন্দীপ কলকাতার নয়াবাদের বাসিন্দা। পুলিশ জানতে পারে, সন্দীপ ও তাঁর সহযোগীরা মিলে ওই বেআইনি কল সেন্টারের মালিক। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করেই রাজডাঙার এই দ্বিতীয় কল সেন্টারের হদিশ মেলে। এই কল সেন্টারের মালিকও সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে অভিযান চালানো হয়। সেখানে মোট ১৮ জন মহিলা ও ন’জন পুরুষ কাজ করে। তাদের মধ্যে ২৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

লালবাজার জানিয়েছে, প্রথম অভিযানে ৩৯টি মোবাইল ফোন, ন’টি চার্জার, ন’টি ডায়েরি, দু’টি ডেবিট কার্ড এবং নগদ ১৬ হাজার টাকা। দ্বিতীয় ঠিকানায় অভিযান চালিয়ে ৩২টি মোবাইল ফোন এবং চারটি রেজিস্টার উদ্ধার করা হয়েছে। দুই জায়গা মিলিয়ে মোট ৬৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতেরা অধিকাংশই কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা বলে পুলিশ জানিয়েছে। ধৃতদের বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনের একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে। ধৃতদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।


Share