Calcutta High Court

মিড-ডে মিলে ডিম-মাছের বদলে রাজমা-ডাল! কলকাতা পুরসভার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলা, আগামী মঙ্গলবার ফের শুনানি

সেই আবেদন বিবেচনা করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চ আগামী মঙ্গলবার মামলার পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করেছে।

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬ ০৩:৫৪

কলকাতা পুর এলাকার স্কুলগুলিতে মিড-ডে মিলে ডিম ও মাছের পরিবর্তে রাজমা-ডাল পরিবেশনের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাকারীর অভিযোগ, পুষ্টিকর খাদ্যের বদলে এমন পরিবর্তনের কোনও যৌক্তিকতা নেই। পাশাপাশি, মিড-ডে মিল পরিচালনার দায়িত্ব ইসকনের মতো সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি।

মামলার শুনানি শুরুর আগে প্রস্তুতির জন্য কিছুটা সময় চেয়ে আদালতের কাছে আবেদন জানান রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল সুরজিৎ নাথ মিত্র। সেই আবেদন বিবেচনা করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চ আগামী মঙ্গলবার মামলার পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করেছে।

মামলাকারীর অভিযোগ, এই সিদ্ধান্তের ফলে একদিকে পড়ুয়ারা আমিষ খাবারের পুষ্টিগুণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্য দিকে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়ায় রাজ্যের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর হাজার হাজার মহিলার কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার নেপথ্যে কোনও অস্বচ্ছতা বা ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আর্জি জানিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি।

প্রসঙ্গত, অনেক স্কুলপড়ুয়ার কাছে মিড-ডে মিলই দিনের অন্যতম প্রধান পুষ্টির উৎস। সেই কারণেই শিক্ষার্থীদের প্রোটিনের ঘাটতি মেটাতে এ বছরের রাজ্য বাজেটে প্রাথমিক স্তরের মিড-ডে মিলের মাথাপিছু বরাদ্দ ৬ টাকা ৭৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘোষণা করা হয়েছে, কলকাতা পুরসভার অধীন স্কুলগুলিতে পুষ্টিকর খাবার সরবরাহের দায়িত্ব পাবে ইসকন। এরপর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “ইসকন রান্না করে খাওয়াবে। আপত্তি থাকলে ‘হরে কৃষ্ণ’ বলবেন না। খুব ভালো, শুদ্ধ খাবার পাবেন!” এই মন্তব্যের পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, তা হলে কি স্কুলগুলিতে এ বার থেকে নিরামিষ খাবারই পরিবেশন করা হবে?

পুষ্টিবিদদের মতে, বেড়ে ওঠা শিশুদের সুষম খাদ্যতালিকায় ডিম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এতে উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি ভিটামিন বি-১২, ভিটামিন ডি, কোলিন, আয়রনসহ একাধিক অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যা শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ডিমের বিকল্প হিসেবে সয়াবিন, পনির বা রাজমার মতো খাদ্য থেকেও প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই বক্তব্য সঠিক। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে বিষয়টি আরও জটিল। রাজ্যের বহু নিম্নআয়ের পরিবারের শিশুদের কাছে ডিম একটি পরিচিত, সহজলভ্য ও সুস্বাদু খাদ্য, যা তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করে। বিপরীতে, রাজমা বা অনুরূপ খাদ্য অনেক শিশুর দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অংশ নয়। তাই কেবল পুষ্টিগুণ বিবেচনা করলেই যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট খাদ্যটি শিশুদের রুচি, অভ্যাস ও গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় খাদ্যের অপচয় বাড়তে পারে এবং শিশুদের কাঙ্ক্ষিত পুষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যও ব্যাহত হতে পারে।

এ ছাড়াও, আবেদনকারীর দাবি, মিড-ডে মিল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রাঁধুনি, সহায়ক কর্মী, পরিবহণকর্মী-সহ বিপুল সংখ্যক কর্মচারী মূলত নিম্ন আয়ের পরিবারের সদস্য। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বহু মহিলা প্রথমবারের মতো নিয়মিত উপার্জনের সুযোগ পেয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে পুরো ব্যবস্থার দায়িত্ব যদি একটি মাত্র সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হয়, তবে এক ধাক্কায় বহু কর্মী কর্মহীন হয়ে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এর ফলে শুধু তাঁদের জীবিকাই নয়, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক সামাজিক অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ পরিসরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


Share