Kalyan Banerjee

লোকসভা থেকে সাসপেন্ড কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মহিলা সাংসদদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে তোলপাড় সংসদ

লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ে। এরপর তাঁকে সাসপেন্ড করার প্রস্তাব লোকসভায় আনা হলে তা ধ্বনিভোটে গৃহীত হয়।

কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ ০৫:০২

লোকসভার বাদল অধিবেশনের বাকি সময়ের জন্য সাসপেন্ড করা হল তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। দলের বিদ্রোহী শিবিরের মহিলা সাংসদদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁর বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ করা হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে অভিযোগের নির্দিষ্ট বিবরণ প্রকাশ্যে না এলেও সংবাদসংস্থা পিটিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ে। এরপর তাঁকে সাসপেন্ড করার প্রস্তাব লোকসভায় আনা হলে তা ধ্বনিভোটে গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাদল অধিবেশনের বাকি সময় তিনি আর লোকসভার কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না এবং তাঁকে অধিবেশন কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে বলা হয়।

বিরোধীদের হট্টগোলের জেরে বুধবার লোকসভার অধিবেশন মুলতুবি হয়ে যায়। পিটিআই সূত্রে খবর, সেই সময় ‘বিদ্রোহী’ শিবিরের তিন মহিলা সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায় এবং মিতালি বাগের সঙ্গে তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। দু’পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হলেও ঠিক কী কারণে এই বিতর্কের সূত্রপাত, প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তা স্পষ্ট হয়নি।

লোকসভার অধিবেশন চলাকালীন দু’পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুরু হলে কয়েক জন বিরোধী সাংসদ পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। তাঁরা উভয় পক্ষকেই সংযত থাকার আহ্বান জানান। পিটিআই সূত্রে খবর, ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে চাইলে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অধিবেশন কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান। অন্য দিকে, কাকলি ঘোষ দস্তিদার এবং ‘বিদ্রোহী’ গোষ্ঠীর অন্যান্য সাংসদ স্পিকারের কক্ষে যান। সূত্রের দাবি, স্পিকার তাঁদের অভিযোগ লিখিত আকারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

পরে দুপুর দু'টোয় ফের অধিবেশন বসলে কল্যাণের বিরুদ্ধে অভিযোগটি উত্থাপন করা হয় লোকসভায়। তখন লোকসভার কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন অন্ধ্রপ্রদেশের টিডিপি-র সাংসদ কৃষ্ণপ্রসাদ তেনেটি। তিনি বলেন, “কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের মহিলা সাংসদদের বিষয়ে অসংসদীয় ভাষা প্রয়োগ করেছেন। অসংসদীয় টিপ্পনি করেছেন। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে স্পিকারের কাছে।” কল্যাণের মন্তব্য অধিবেশনকক্ষের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছে বলেও জানান তিনি।

লোকসভার স্পিকার তেনেটি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অর্জুনরাম মেঘওয়ালকে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে নিলম্বনের প্রস্তাব পেশ করার নির্দেশ দেন। প্রস্তাবে তাঁকে চলতি অধিবেশন থেকে সাসপেন্ড করার জন্য লোকসভার অনুমোদন চাওয়া হয়। নিট প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে বিরোধীদের বিক্ষোভ ও হট্টগোলের মধ্যেই ধ্বনিভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। এরপর স্পিকার কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে অধিবেশনকক্ষ ত্যাগ করার নির্দেশ দেন।

নিলম্বিত হওয়ার পরে ‘বিদ্রোহীদের’ খোঁচা দিয়ে কল্যাণ বলেন, “আমাকে এখানে সাসপেন্ড করে কী করবে? বাড়ি থেকে তো বেরোতে পারে না! ২০ সাংসদের দল না? দেড় মাসে একটা মিটিংও করেছে কলকাতায়? ২০টা ভোটারও নেই ওদের। ওরা গদ্দার, ওরা বেইমান। আজই সব শেষ হয়ে যাচ্ছে না। এক বছর পরে এই সরকার ধসে পড়বে।”

অন্য দিকে বিদ্রোহী শিবিরের অন্যতম সাংসদ শতাব্দী অভিযোগ, কল্যাণ মহিলাদের উদ্দেশ্যে ‘কুকথা’ বলেন। সাংসদের কথায়, “কল্যাণদা এটা সবসময় করে থাকেন। সব সময় সকলের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। মহিলাদের গালাগালি দেন। এমন কথা কোনও ভদ্রলোকের মুখে ভাবা যায় না। দিদির কাছে অনেক সময় অভিযোগ গিয়েছে। দিদি বলতেন, ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও, আর হবে না। কিন্তু ওঁর সাহসটা দিনে দিনে এত বেড়ে গিয়েছে, উনি ভাবছেন সবাই ওঁর চাকর।”

লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দল বর্তমানে দু’ভাগে ভেঙে গিয়েছে। দলের ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ২০ জনই বিদ্রোহ ঘোষণা করে তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন এবং যোগ দিয়েছেন ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্‌স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (এনসিপিআই)-তে। বিদ্রোহী শিবিরে রয়েছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায় ও মিতালি বাগ। অন্য দিকে, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় রয়েছেন কালীঘাট শিবিরের সঙ্গেই।

এ দিকে, মহিলা সাংসদদের উদ্দেশে মন্তব্যকে ঘিরে অতীতেও একাধিকবার বিতর্কে জড়িয়েছেন কল্যাণ। গত মে মাসে তাঁর বিরুদ্ধে লোকসভার স্পিকারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। অভিযোগ ছিল, তিনি তাঁকে মৌখিকভাবে হেনস্থা করেছেন। পরে জুন মাসেও স্পিকারের কাছে আরেকটি চিঠি দিয়ে কাকলি দাবি করেন, শুধু তাঁকেই নয়, অন্যান্য মহিলা সাংসদদের প্রতিও কল্যাণ আপত্তিকর ও অসম্মানজনক মন্তব্য করেন। সেই সঙ্গে শ্রীরামপুরের সাংসদকে লোকসভা থেকে বহিষ্কারের দাবিও জানান তিনি।

কল্যাণ অধিবেশন থেকে নিলম্বিত হওয়ার পরে মু‌খ খুলেছেন কাকলিও। কালীঘাট তৃণমূলের সাংসদকে বিঁধে তিনি বলেন, “উনি নারীবিদ্বেষী। উনি কখনও সদনের ভিতরে, কখনও সংসদের বাইরে মহিলাদের অসম্মান করেন। গালিগালাজ করেন। আজও তার অন্যথা হয়নি। উনি মহিলাদের যে ভাষায় আক্রমণ করেন, তার প্রতিবাদে আজ অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছিল স্পিকারের কাছে।”


Share