Kolkata Municipal Corporation

কলকাতায় বুলডোজার রাজ! ‘রেগুলারাইজেশন’-এর ফাঁক গলে বৈধ হয়েছে বেআইনি নির্মাণ, বিস্ফোরক অভিযোগ পুরসভার অন্দরেই

তাঁদের দাবি, ‘মাইনর ডেভিয়েশন’ বা ক্ষুদ্র বিচ্যুতির স্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় আইনের অপব্যবহার হয়েছে। তাই এখন তাঁরা চাইছেন, কোন ধরনের নিয়মভঙ্গকে ছোটখাটো ধরা হবে এবং কীভাবে তা পরিমাপ করা হবে তা স্পষ্টভাবে আইনে উল্লেখ করা হোক।

কলকাতা পুরসভা
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ ০৮:১৯

রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর কলকাতা পুরসভার অন্দরে বদলাতে শুরু করেছে ক্ষমতার সমীকরণ। অভিযোগ উঠছে, মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে কার্যত পাশ কাটিয়েই শহরজুড়ে অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে বুলডোজ়ার অভিযান শুরু হয়েছে। সম্প্রতি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পারিবারিক ঠিকানাতেও পুরসভার নোটিস পৌঁছনোর ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। তপসিয়ার চামড়ার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই কলকাতায় বেআইনি নির্মাণ ভাঙার অভিযান আরও জোরদার হয়েছে। আর সেই আবহেই ফের সামনে এসেছে ‘রেগুলারাইজেশন’ বা জরিমানার বিনিময়ে বেআইনি নির্মাণ বৈধ করার বিতর্ক।

পুরসভার একাংশের আধিকারিকদের অভিযোগ, বর্তমান আইনে একাধিক অস্পষ্টতা থাকায় বছরের পর বছর নানা বেআইনি নির্মাণকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, ‘মাইনর ডেভিয়েশন’ বা ক্ষুদ্র বিচ্যুতির স্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় আইনের অপব্যবহার হয়েছে। তাই এখন তাঁরা চাইছেন, কোন ধরনের নিয়মভঙ্গকে ছোটখাটো ধরা হবে এবং কীভাবে তা পরিমাপ করা হবে তা স্পষ্টভাবে আইনে উল্লেখ করা হোক।

২০১৫ সালে কলকাতা পুরসভা ‘কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন রেগুলেশনস, ২০১৫’ চালু করে। সেই বিধি অনুযায়ী, অনুমোদিত বিল্ডিং প্ল্যান থেকে সামান্য বিচ্যুতি ঘটলে নির্দিষ্ট জরিমানা দিয়ে তা বৈধ করা সম্ভব। কিন্তু আইনে কোথাও স্পষ্ট করে বলা হয়নি, কতটা বিচ্যুতিকে ‘সামান্য’ বলা হবে। ফলে বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার বা আধিকারিকদের ব্যাখ্যার উপর। পুরসভার অন্দরমহলের অভিযোগ, এই অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে বহু ক্ষেত্রেই বড়সড় বেআইনি নির্মাণও বৈধতা পেয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে একাধিক ক্ষেত্রে।

বর্তমানে শহরজুড়ে যখন অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে কড়া অভিযান চলছে, তখন পুরকর্তাদের একাংশের মত, আইনের এই ফাঁক বন্ধ না করলে ভবিষ্যতেও সমস্যা থেকেই যাবে। বিল্ডিং বিভাগের আধিকারিকদের বক্তব্য, কত শতাংশ অতিরিক্ত নির্মাণ, কতটা পার্শ্ব-ফাঁক কম থাকা, উচ্চতার কতটা ব্যত্যয় বা অতিরিক্ত নির্মিত এলাকা পর্যন্ত নিয়মভঙ্গকে ‘ক্ষুদ্র’ বলা হবে, তার নির্দিষ্ট সীমা থাকা জরুরি। একই সঙ্গে বিচ্যুতি মাপার প্রযুক্তিগত পদ্ধতিও আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। এতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা যেমন বাড়বে, তেমনই বেআইনি নির্মাণকে বৈধ করার অপব্যবহারও অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন তাঁরা।

এই প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টও একাধিকবার গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে। শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, অবৈধ নির্মাণকে বৈধ করা কখনওই নিয়ম হতে পারে না, তা শুধুমাত্র ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রেই হওয়া উচিত। আদালতের মতে, লাগাতার রেগুলারাইজ়েশন আইনভঙ্গের প্রবণতাকে উৎসাহ দেয় এবং নগর পরিকল্পনাকে বিপর্যস্ত করে।

তা সত্ত্বেও দেশের একাধিক রাজ্যে এখনও বেআইনি নির্মাণ বৈধকরণের আলাদা আইন বা প্রকল্প চালু রয়েছে। মহারাষ্ট্রের মুম্বই, ঠাণে, নবি মুম্বই ও পিম্পরি-চিঞ্চওয়াড়ে এই ধরনের নিয়ম কার্যকর। নবি মুম্বইয়ে সিডকো সম্প্রতি সাধারণ ক্ষমা প্রকল্প চালু করেছে, যেখানে আবাসিক প্লটের ক্ষেত্রে সংরক্ষিত মূল্যের ২৫ শতাংশ এবং বাণিজ্যিক প্লটের ক্ষেত্রে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা নিয়ে বৈধতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। দিল্লির অননুমোদিত কলোনি বৈধকরণ প্রকল্প, কর্নাটকের ‘আক্রম-সক্রম’, তেলঙ্গানা ও অন্ধ্রপ্রদেশের নির্মাণ জরিমানা প্রকল্প কিংবা গুজরাতের বিভিন্ন নগর এলাকায় একই ধরনের ব্যবস্থা চালু আছে।

তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মানতে হয়। সাধারণত নির্দিষ্ট সময়সীমার আগে নির্মিত ভবনই বৈধকরণের আওতায় আসে। মালিককে জরিমানা, পরিকাঠামো মাসুল ও অতিরিক্ত মূল্য জমা দিতে হয় এবং নির্মাণকে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়। পার্শ্ব-ফাঁক কম থাকা, উচ্চতার সীমিত ব্যত্যয় বা অতিরিক্ত নির্মিত এলাকার মতো ছোটখাটো নিয়মভঙ্গকেই সাধারণত বিবেচনা করা হয়। কিন্তু উপকূলীয় নিয়ন্ত্রণ অঞ্চল, বনভূমি, প্রতিরক্ষা জমি, খেলার মাঠ বা উন্মুক্ত জায়গা দখল করে তৈরি নির্মাণ কিংবা বিপজ্জনক ভবনকে কোনওভাবেই বৈধতা দেওয়া হয় না।

পুরকর্তাদের মতে, কলকাতাতেও যদি একই ধরনের স্পষ্ট ও কঠোর নীতিমালা চালু করা যায়, তা হলে বেআইনি নির্মাণের প্রবণতায় অনেকটাই লাগাম টানা সম্ভব হবে।


Share