State Debt

রাজ‍্যের ঋণ সাত লক্ষ কোটি টাকা! কীভাবে পাঁচ টাকায় মাছ-ভাত এবং অন্নপূর্ণা যোজনার খরচ তুলবে রাজ‍্য সরকার? উঠছে প্রশ্ন

রাজ্য সরকার জানিয়েছে, সপ্তাহে দু’দিন প্রায় ৪০০টি ‘মা’ ক্যান্টিনে পাঁচ টাকায় মাছ-ভাতের খাবার দেওয়া হবে। পেট্রোল এবং ডিজেলের দামবৃদ্ধির ফলে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। সেই টাকা কীভাবে জোগাড় হবে তা নিয়েও কেউই স্পষ্ট ধারণা দেননি।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৯ মে ২০২৬ ১১:৪২

মঙ্গলবার রাজ‍্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী একাধিক নতুন জনমুখী প্রকল্পের ঘোষণা করেছেন। রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকার নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকে দ্রুত শক্তিশালী করতে চাইছে বলেই মনে করা হচ্ছে। মহিলাদের জন্য মাসিক তিন টাকার ভাতা থেকে শুরু করে পাঁচ টাকায় মাছ-ভাতের খাবার— একাধিক বড় ঘোষণা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। আলোড়ন ফেললেও অন‍্যান‍্য বড় রাজ‍্যের তুলনায় এ রাজ্যের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি তুলনামূলক ধীরগতিতে হচ্ছে। তার ওপর ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা যা অন্যান্য বড় রাজ্যের তুলনায় চাপে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। তাই এই ভর্তুকিযুক্ত প্রকল্পগুলিকে ঘিরে রাজ্যের আর্থিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

পাশাপাশি রাজ্য সরকার জানিয়েছে, সপ্তাহে দু’দিন প্রায় ৪০০টি ‘মা’ ক্যান্টিনে পাঁচ টাকায় মাছ-ভাতের খাবার দেওয়া হবে। পেট্রোল এবং ডিজেলের দামবৃদ্ধির ফলে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। সেই টাকা কীভাবে জোগাড় হবে তা নিয়েও কেউই স্পষ্ট ধারণা দেননি।

এই দুই প্রকল্পে রাজ‍্যের কোষাগার থেকে কত খরচ হবে তা নিয়ে কোনও কিছুই স্পষ্ট করা হয়নি। গত ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের নেট স্টেট ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট ২০২৪-২৫ সালের চেয়ে ৯.৮৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৬.৩২ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছে গিয়েছে। আগের বছর এই বৃদ্ধির হার ছিল ৮.৯৪ শতাংশ। তবে এই বৃদ্ধি এখনও তামিলনাড়ু (১৫.৭৬%), উত্তরপ্রদেশ (১২.৬৪%) এবং মহারাষ্ট্র (১১.৮৫%)— এর তুলনায় কম। এমনকী, পূর্ব ভারতের বিহার, ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ডও পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বেশি বৃদ্ধির হার নথিভুক্ত করেছে। সিপিএম এবং তৃণমূল দুটি দলকেই ‘সমাজতান্ত্রবাদের পুজারি’ বলেও অনেকে বলছেন। তাঁদের মতে, রাজ‍্যে উৎপাদন নেই। রাজস্ব নেই। তার পরে দান-খয়রাতির রাজনীতি চলছে। এটার ফলে ভোটব‍্যাঙ্ক টিকে থাকতে পারে। কিন্তু ভোটারদের জীবনযাপনের সার্বিক উন্নতি সম্ভব নয়।

৩৪ বছরের সিপিএম এবং ১৫ বছরের তৃণমূলের জমানায় রাজ্যে একটিই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হয়নি। সিপিএম জমানা থেকেই এই পতন শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মালিক-শ্রমিক সংঘাত, সরকারি থেকে বেসরকারি সমস্ত কর্মক্ষেত্রে নিজেদের শ্রমিক সংগঠনের প্রভাব বৃদ্ধি করেছিল। ১৫ বছরে তৃণমূল সিপিএমের সেই পদ্ধতিকেই একটু উন্নত করে একই রেখে গিয়েছে। চুরি, তোলাবাজি, আইনশৃঙ্খলা অবনতির কারণকেও এই রাজ‍্যে শিল্প না আসার কারণ হিসেবে দেখছেন।

২০২৫ সালের নীতি আয়োগের বার্ষিক স্বাস্থ্য পরিসংখ্যানে রিপোর্টে পশ্চিমবঙ্গকে এমন রাজ্যগুলির মধ্যে রাখা হয়েছে, যেখানে ঋণের বোঝা উর্ধ্বমুখী। রাজ‍্যের ঋণের সঙ্গে জিএসডিপির অনুপাত দ্রুত বাড়ছে। ওই রিপোর্টে বিশেষ ভাবে পশ্চিমবঙ্গ ও পঞ্জাবকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকির মুখে থাকা রাজ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ সাত লক্ষ কোটি টাকারও বেশি।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, পর্যাপ্ত রাজস্ব বৃদ্ধি ছাড়া এ ভাবে একের পর এক বড় কল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করলে রাজ্যের আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে। অন্য দিকে, সরকারের সমর্থকদের মতে, সামাজিক সুরক্ষা ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে এই ধরনের প্রকল্প অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচনের আগে এই দান-খয়রাতি নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছিলেন, রাজ্যের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। রাজ্যের মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করতে এ ভাবে দিতে হবে। এই প্রচেষ্টার মাধ্যমেই রাজ‍্যকে উন্নয়ন সম্ভব। পাশাপাশি, ভারী শিল্পের দিকেও জোর দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।

উল্লেখ্য, রাজ‍্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেছেন। এই প্রকল্পের আওতায় যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। আগে লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পে দেড় হাজার দেওয়া হত এ বার তা তিন হাজার করে দেওয়া হবে। কারা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন বুধবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তা বিস্তারিত জানিয়ে দিয়েছেন।

নদিয়ার কল্যাণীতে প্রশাসনিক বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বলেন, “সমস্ত ভারতীয় নাগরিক এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবেন।” পরবর্তীতে নবান্নে একটি সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, ‘লক্ষ্ণীর ভান্ডার’ প্রকল্পে অনেক ‘বেনোজল’ রয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের প্রাথমিক ধারণা ছিল যে, লক্ষ্মীর ভান্ডার-এর প্রাপকদের তালিকাটি যাচাই করা আছে। কিন্তু সে বিষয়ে আমরা ভূরি ভূরি অভিযোগ পেয়েছি। ভোটার তালিকা থেকে স্থায়ী ভাবে নাম বাদ গিয়েছে এবং ট্রাইবুনালে আবেদন করেননি, এমন প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ লক্ষ্মীর ভান্ডার-এর টাকা পাচ্ছেন।’’ তাঁদের নাম বাদ দেওয়ার প্রয়োজনেই সকলকে অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম পূরণ করতে বলেছেন শুভেন্দু। সিএএ-তে যাঁরা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছেন, তাঁরা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। এসআইআর-এ যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে কিন্তু ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন, তাঁদেরও আপাতত ব্যতিক্রম হিসাবে তালিকায় রাখা হচ্ছে।


Share