Drug Smuggling

‘দাম কম, নেশা বেশি, তৃপ্তিও বেশি,’ পাচারের ফেনসিডিল বাংলাদেশে বিক্রি হয় পাঁচ গুণ দামে, দাবি তদন্তকারীদের

উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ— রাজ‍্যের এই ক’টি জেলাতেই এই কাশির সিরাপ পাচারের হাব হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশের গোয়েন্দারা।

প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
নিজস্ব সংবাদদাতা, দিল্লি
  • শেষ আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:২৯

দাম মেরেকেটে ১০৩ টাকা। পড়শি দেশে বিক্রি হয় পাঁচগুন বেশি দামে। রাজ‍্যে মাদকপাচারে গাঁজার পরেই রয়েছে কাশির সিরাপ ফেনসিডিলের পাচার। দাম কম, নেশা বেশি। কম টাকায় ‘তৃপ্তিও’ বেশি। সিরাপের ভিতরে থাকা নির্দিষ্ট একটি রাসায়নিকের পরিমাণ ওপরে তা নির্ভর করে। তার ওপর ভিত্তি করেই নেশার সামগ্রী পাচার চলে। ফেনসিডিল বাদ দিয়ে অন‍্য কোনও কাশির সিরাপের পাচার হয় না বলেই পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।

উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ— রাজ‍্যের এই ক’টি জেলাতেই এই কাশির সিরাপ পাচারের হাব হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশের গোয়েন্দারা। তবে দক্ষিণবঙ্গের সিমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ফেনসিডিল পাচার যে একেবারেই হয় না তা-ও মানতে নারাজ রাজ‍্য পুলিশের এক কর্তা। তাঁর বক্তব্য, দক্ষিণবঙ্গে ফেনসিডিল আসে। তা পাচারও হয়। কিন্তু বাকি জেলাগুলির নিরিখে তা একেবারেই সামান্য। বাংলাদেশে ফেনসিডিল পাচারের সীমা জলঙ্গী নদীকে সীমানা হিসেবে ধরা হয়। তা পার করে এপাড়ে এলে ফেনসিডিল পাচারের কমে। সেখান থেকে দেশি গাঁজা পাচার সংক্রান্ত চক্রের বাড়বাড়ন্ত বৃদ্ধি পায়। সেই সীমানা নদিয়া থেকে শুরু হয়।

পুলিশ সূত্রের খবর, বিগত কয়েক বছরে গাঁজা, ফেনসিডিল, বিভিন্ন মাদক ট‍্যাবলেটের পাচার সংক্রান্ত তথ‍্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতি নিয়ত স্বরাষ্ট্র দফতরকে পুলিশের তরফ থেকে রিপোর্ট পাঠানো হয়। সেই বিশ্লেষণ করেই এই তথ‍্য মিলেছে।

কীভাবে ফেনসিডিল পাচার হয়?— তার ব‍্যাখ‍্যা পাওয়া গিয়েছে। পুলিশ সূত্রের দাবি, ফেনসিডিল পাচারচক্র সংগঠিত নয়। এই পাচারচক্রের একাধিক গোষ্ঠী রয়েছে। তাঁরা ফেনসিডিল সংগ্রহ করে। একটি রুট থেকে অন্য নিয়ে যায় অন‍্য কেউ। এ রাজ্যে ফেনসিডিল পাচারের চক্রকে ‘সিন্ডিকেট’ বলা হয়। যেমন গোষ্ঠী রয়েছে তেমন গোষ্ঠী সংঘর্ষ রয়েছে। কারণ ফেনসিডিল পাচারে ব‍্যবসায় বিনিয়োগ কম লাভ অনেক বেশি। এই চক্রের এক মাথাকে পাকড়াও করলে আরেকটি আগাছার মতো গজিয়ে যায় বলেও দাবি করেছে পুলিশ।

পুলিশের কথায় যাঁদের ‘সিন্ডিকেট’ বলা হয়, তাঁদের কাজ শুধুমাত্র সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া। মুর্শিদাবাদকে যদি ধরা হয়, তা হলে পদ্মা নদীর কাঁটাতারহীন বাংলাদেশ সীমান্তকে পাচারকারীরা বেছে নেয়। ওপাড়েই রয়েছে বাংলাদেশের রাজশাহি। সেখান থেকে যাঁরা এই ফেনসিডিল সংগ্রহ করে, তাঁদের বলা হয় ‘আরডি’। তাঁরাই ‘সিন্ডিকেট’-এর কাছ থেকে ফেনসিডিল সংগ্রহ করে টাকা হস্তান্তর করে। সেই টাকা ‘সিন্ডিকেট’-এর লোকেরা নিজের ভাগ রেখে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ওপরের লোকদের কাছে হস্তান্তর করে দেয়। অপর দিকে, ‘আরডি’-রা পাচারের কাশির সিরাপ রাজশাহি হয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশে অ‍্যাবোট কোম্পানির ফেনসিডিলের সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। বিগত দিনে যত পাচারের কাশির সিরাপ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে তা বেশিরভাগই এই সংস্থার। ‘এস কফ’-র কাশির সিরাপও রয়েছে। যে কাশির সিরাপে মধ্যে কোডেইনের পরিমাণ যত বেশি হবে, নেশা ততটাই বেশি হবে। তাই চাহিদাও বেশি। তার ওপর বাংলাদেশে ধর্মীয় কারণও রয়েছে। সেই কারণে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ সংখ‍্যাগুরুরা সুরাপানকে ঠিক বলে গণ্য করেন না। তাই পাচার হওয়া ফেনসিডিলই নেশা করতে সেবন করে থাকেন। নেশা করার জন্য ফেনসিডিল বাদ দিয়ে অন‍্য কোনও কাশির সিরাপের চাহিদা বাংলাদেশে খুব একটা নেই বলেই বলে মনে করা হয়।

বর্তমানে ফেনসিডিলের বাজারমূল্য মেরেকেটে ১০৩-১০৫ টাকা হবে। এই কাশির সিরাপ শরীরকে সুস্থ করতেও অত্যন্ত অপরিহার্য একটি ওষুধ। পুলিশ সূত্রের খবর, ‘সিন্ডিকেট’-এর লোকেরা ফেনসিডিলের প্রতি বোতল ৬৫ টাকায় কিনে একত্রিত করে। সেটা সীমান্তের ওপার থেকে আসা ‘আরডি’-রা প্রতি বোতলে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা করে ‘সিন্ডিকেট’-কে দেয়। পাচার হওয়া প্রতি বোতলে ১৩৫ থেকে ১৬৫ টাকা করে বেশি নেয় ‘সিন্ডিকেট’। চোরাচালান হওয়া বোতলগুলি আবার বাংলাদেশে ৩২৫ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়। কখনও আবার বাংলাদেশি টাকায় ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। সেটা আবার নির্ভর করে পাচার হওয়া ফেনসিডিলের সরবরাহের ওপরে।

উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক ‘নেশামুক্ত ভারত’-এর সংকল্প নিয়েছে। সীমান্ত লাগোয়া রাজ্যগুলিতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। চলছে ব‍্যাপক ধড়পাকড়। এ রাজ‍্যে তৈরি করা হয়েছে অ‍্যান্টি নারকোটিক্স টাস্ক ফোর্স। এই বিশেষ টাস্ক ফোর্স মাদকপাচার রুখতে দিনভর কাজ করে চলেছে। দেশি গাঁজা, বিদেশি হাইড্রোফোনিক গাঁজা, হেরোইন, কোকেইন, ব্রাউন সুগার, ফেনসিডিল, এমডিএমএ ট‍্যাবলেট-সহ একাধিক মাদক তাঁরা বিভিন্ন সময় উদ্ধার করেছে। গ্রেফতারও করা হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকাও।

প্রসঙ্গত, কিছু দিন আগে বিধাননগরের হাজার হাজার ফেনসিডিলের বোতলের ওপর দিয়ে রোড রোলার চালিয়েছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বার্তা ছিল, রাজ্য থেকে মাদকপাচার বন্ধ করতে হবে। কোনও ভাবেই মাদক পাচারকারীদের রেয়াত করা হবে না।


Share