TMC Political Crisis

টাকার বদলে হকারির ছাড়পত্র, এসএসকেএম চত্বরে অ‍্যাম্বুলেন্স থেকে তোলাবাজি, মমতা ‘ঘনিষ্ঠ’ কুমার সাহার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের

পুলিশ সূত্রের খবর, অভিযুক্তদের খোঁজখবর শুরু হয়েছে। এই তোলাবাজির টাকা কোথায় গিয়েছে তা-ও পুলিশ জানার চেষ্টা চালাচ্ছে। এখনও পর্যন্ত কাউকেই গ্রেফতার করা হয়নি। পুলিশের বক্তব্য, ‘তদন্ত চলছে।’

তৃণমূল নেতা কুমার সাহা।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৮ জুলাই ২০২৬ ০৪:১৬

এ বার কুমার সাহার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করল পুলিশ। অভিযোগ, তিনি টাকা নিয়ে ফুটপাথে হকার বসিয়েছেন। পাশাপাশি এসএসকেএম হাসপাতালে অ‍্যাম্বুলেন্স মালিকদের কাছ থেকে মোটা টাকা আদায় করেছেন বলেও কুমার সাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। কালীঘাট এবং ভবানীপুর থানায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছে।

জানা গিয়েছে, চলতি বছরের জুন মাসে কালীঘাট থানায় অভিযোগ দায়ের হয়। ওই এলাকার হকারেরাই কুমার সাহা এবং তাঁর দলবলের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ে। তাঁদের অভিযোগ, কুমার সাহা ও তার সাগরেদরা কালীঘাট এলাকায় হকারদের কাছ থেকে প্রতিমাসে তিন হাজার টাকা করে নেওয়া হত। দোকানে ব‍িক্রি অনুযায়ী সেই টাকা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্তও যেত। এমনকী, যেখানে সেখানে হকারেরা দোকান তৈরি করত তাঁদের কাছ থেকে লক্ষাধিক টাকা ‘প্রোটেকশন মানি’ হিসেবে কুমারের লোকেরা নিত। টাকা না দিলে দিলেই মারধর করা হতো বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা। হকারদের আরও অভিযোগ, হকারেরা আগেও পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু ‘অজ্ঞাত কারণে’ পুলিশ কোনও ব্যবস্থাই নেয়নি।

তৃণমূল নেতা কুমার সাহার কীর্তি এখানেই শেষ নয়। বলরাম শিকারি নামে এক এম্বুলেন্স মালিকের অভিযোগ, তিনি তাঁর অ‍্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভারের সঙ্গে এসএসকেএম হাসপাতালে দেখা করতে গিয়েছিলেন। সেখানে গেলে কুমার সাহার দলবল তার কাছে ৫০ হাজার টাকা তোলা চায়। এমনকী, আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে ভয়ও দেখানো হয়েছে। টাকা দিতে অস্বীকার করায় মারধরও করা হয়েছে তাকে বলে অভিযোগ করেন। সেই মামলারও তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। তিনি ভবানীপুর থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। পুলিশ তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের করেছে।

অন‍্য দিকে, কালীঘাটের অরেক বাসিন্দা কৌশিক দাস তৃণমূল নেতা কুমার সাহার বিরুদ্ধে বিধানসভা ভোটের আগে বিজেপি কর্মীদের ভয় দেখানোর অভিযোগ জানিয়েছেন। ওই ব‍্যক্তি একটি ফেসবুক পোস্টের উল্লেখ করে অভিযোগ করেন, তাতে কুমার সাহাকে বিজেপি কর্মী এবং সাধারণ মানুষকে চমকাতে দেখা যাচ্ছে। কৌশিকের অভিযোগের ভিত্তিতে কালীঘাট থানায় কুমার সাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে।

এ ছাড়াও, জাকিরুদ্দিন শেখ নামে এক ফল ব্যবসায়ীর অভিযোগ, কুমার সাহার সাগরেদরা তাঁর কাছ থেকে ফুটপাথে ডালা লাগানোর জন‍্য মোটা অঙ্কের টাকা চেয়েছিল। তিনি টাকা দিতে না পারায় তাঁর কাছ থেকে ফল এবং শাকসবজি লুঠ করে নিয়ে চলে যায়। নিয়মিত ফল দিয়ে তোলার টাকা পরিশোধ করতেন বলে দাবি করেছেন। এই বিষয়ে টালিগঞ্জ থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

পুলিশ সূত্রের খবর, অভিযুক্তদের খোঁজখবর শুরু হয়েছে। এই তোলাবাজির টাকা কোথায় গিয়েছে তা-ও পুলিশ জানার চেষ্টা চালাচ্ছে। এখনও পর্যন্ত কাউকেই গ্রেফতার করা হয়নি। পুলিশের বক্তব্য, ‘তদন্ত চলছে।’ তৃণমূল জমানায় এই ধরনের অপরাধের কথা কানে শোনা গেলেও সামনে আসেনি। কিন্তু পালাবদলের পর সরাসরি কালীঘাট, ভবানীপুর এবং টালিগঞ্জ থানার পুলিশ এফআইআর রজু করেছে।

বিধানসভা নির্বাচনের বিপর্যয়ের পরে একাধিক তৃণমূলের হেভিওয়েট নেতা গ্রেফতার হয়েছে। বেশির ভাগেরই বিরুদ্ধে তোলাবাজি, জোরপূর্বক জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। শুভেন্দু অধিকারীর মনোনয়নপত্র জমা দিতে যাওয়ার সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে কালো পতাকা দেখানো নেপথ্যে কুমার সাহার যোগসাজশ রয়েছে বলেও এলাকার বিজেপি কর্মীরা দাবি করেছিলেন।

কে এই কুমার সাহা?

কালীঘাট পার্কের পিছনে মসজিদ বাড়িতেই জন্ম এবং বেড়ে ওঠা কুমার সাহার। ওই জমি জবরদখল করা বলেই স্থানীয়দের একাংশের দাবি। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের গুন্ডাদমন শাখার পুরনো নথি বলছে, রাসবিহারী এবং ভবানীপুর এলাকার দুই গ্যাংস্টার শ্রীধর এবং মুন্না পাণ্ডের সঙ্গে কুমার ও তাঁর দলবলের একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কুমারের কালীঘাট এলাকার ‘দাদা’ হয়ে ওঠার গল্প গুন্ডাদমন শাখার অনেকেই জানেন বলে দাবি এক পুলিশ আধিকারিকের।

একাধিক বার লালবাজারের সেন্ট্রাল লক আপের ‘অতিথি’ কুমার সাহা এক সময়ে ছিলেন কংগ্রেসের ছত্রছায়ায়। ২০১৪ সালে মুকুল রায়ের হাত ধরে শাসক দলে যোগ দেওয়ার সময়ও অনেকেই ভাল ভাবে মেনে নিতে পারেননি কুমারের দলে অন্তর্ভুক্তি। কুমারের বাড়ি থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে বাড়ি তৃণমূল নেতা সুব্রত বক্সীর। কুমার যে দিন তৃণমূল ভবনে গিয়েছিলেন দলে যোগ দিতে, সে দিন উপস্থিত থাকার কথা ছিল সুব্রতবাবুরও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন ওই অনুষ্ঠান। তবে তাতে কিছু আটকায়নি কুমারের।

কুমারকে পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়ার এই সিদ্ধান্তের কথা শুনেছেন দক্ষিণ কলকাতার প্রায় সব তৃণমূল নেতাই। শাসক দলের দক্ষিণ কলকাতার এক নেতা ওই সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে অসন্তোষ চেপে রাখতে না পেরে বৃহস্পতিবার বলেন, ‘‘কার সুপারিশে কুমার নিরাপত্তা পাচ্ছে তা আমরা জানি। কুমারকে নিরাপত্তা দিলে দলেরই বদনাম হবে। গোটা দক্ষিণ কলকাতার মানুষ জানেন কুমারের অতীত এবং এখনও তিনি কী করেন।’’ তৃণমূলের একটা অংশের দাবি, কুমার যুব তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।

২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় বিরোধীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া নিয়ে রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছিল আলিপুরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসকের অফিস। হাতে গোনা কয়েক জন বাদে কোনও বিরোধী প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিতে পারেননি সে সময়। তৃণমূলের দক্ষিণ কলকাতার এক নেতা বলেন, ‘‘গোটা ওই অপারেশনের দায়িত্বে ছিল কুমার। ওর সঙ্গী মোটা বাবু, পিন্টুরা ওই অপারেশন চালায়।’’ তৃণমূলের অন্দরে খবর, আলিপুরের ‘সাফল্য’-র পরেই যুব তৃণমূলে দলীয় নেতৃত্বের কাছে তিনি অত্যন্ত ভরসার পাত্র হয়ে উঠেছেন। যুবর যে কোনও সভায় থাকে কুমারের সঙ্গীদের বাইকের বিশাল মিছিল।

কালীঘাট এলাকার সাধারণ মানুষ ভয় পেতেন 'তৃণমূল ঘনিষ্ঠ' হিসাবে পরিচিত কুমার সাহাকে।
ফলে থানায় যাওয়া তো দুরস্ত, দেখলে মাথা নিচু করে চলে যেতেন অনেকেই। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দিনের পর দিন ধরে চলেছে অপরাধমূলক কাজ। প্রশ্রয় পেয়েছে দুর্নীতি। এই ঘটনাও তার ব্যতিক্রম নয়। কাঁচা টাকার লোভ সামলাতে পারেননি অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা বলে দাবি স্থানীয়দের।


Share