Suvendu Adhikari

নির্বাচনের ‘গুরুদায়িত্ব’ সামলে এ বার মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শদাতা সুব্রত গুপ্ত, নির্দেশ জারি করে জানিয়ে দিল রাজ্য সরকার

রাজ‍্যে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর সময় দুঁধে প্রাক্তন আমলাকে বিশেষ তালিকা পর্যবেক্ষক করে নির্বাচন কমিশন। তাঁর নেতৃত্বে এসআইআর প্রক্রিয়াকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেছেন সুব্রত গুপ্ত।

(বাঁ দিক থেকে) মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং নবনিযুক্ত উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্ত।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ ০৮:০০

সুব্রত গুপ্ত ১৯৯০ ব্যাচের পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারের আইএএস অফিসার। এক সময়ে সুব্রত গুপ্তই তাঁর সিনিয়রিটির জন্য মুখ্যসচিব পদের অন্যতম দাবিদার ছিলেন। ব্যাপারটা বুঝতে হলে আরেকটু পিছনের দিকে হাঁটতে হবে। ১৯৮৫ ব্যাচের আইএএস অফিসার মলয় দে রাজ্যের মুখ্যসচিব হয়েছিলেন। তাঁর অবসরের পর মুখ্যসচিব হন ১৯৮৬ ব্যাচের আইএএস রাজীবা সিনহা। রাজীবার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যসচিব পদে নিয়োগ করেন ১৯৮৭ ব্যাচের আইএএস অফিসার আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ওই সময়ে তখন রাজ‍্যের অর্থসচিব ছিলেন ১৯৮৮ ব্যাচের আইএএস অফিসার হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদী। সে সময়ে দেওয়াল লিখন কার্যত স্পষ্ট ছিল, আলাপনের পর মুখ্যসচিব হবেন হরিকৃষ্ণ। হয়ও তাই।

কিন্তু ঘটনা হল, এরপর ১৯৮৯ ব্যাচের দুই আইএএস অফিসার অনিল বর্মা ও অত্রি ভট্টাচার্যর মধ্যে কাউকে যে মুখ্যসচিব করা হবে না, তা নিয়ে কোনও রহস্য ছিল না। একদা অত্রি ভট্টাচার্যকে সিনিয়রিটির ভেঙে স্বরাষ্ট্রসচিব করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে কিছু দিনের মধ্যেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বুঝতে পারেন, অপাত্রে দান হয়েছে। অত্রিকে দায়িত্ব দিয়ে সরকারের স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছিল না। অন্য দিকে, মমতা অনিল বর্মাকে স্বাস্থ্য ও খাদ্য দফতরের সচিব করেছিলেন। আমলা মহলের দাবি, তিনি একরোখা, বড্ড বেশি কঠোর। দেখা যায়, আচমকা অনিলের গুরুত্ব কমতে থাকে। তাঁকে স্বাস্থ্য থেকে প্রাণী সম্পদে ও তারপর গেজেট দফতরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

এঁদের পর ১৯৮৯ ব্যাচের আইএএস অফিসার বি পি গোপালিকাকে মুখ্যসচিব করা হয়। গোপালিকার পর ১৯৯০ ব্যাচের আইএএস অফিসার সুব্রত গুপ্ত মুখ্যসচিব পদে স্বাভাবিক দাবিদার ছিলেন। সুব্রতবাবু অদ‍্যপান্ত বাঙালি। অত‍্যন্ত পেশাদার একজন আমলা। রাজ‍্যের মুখ্যসচিব পদে আরও এক বাঙালি বসবেন, এমন ধারনাও অনেকের ছিল। কিন্তু তাঁকে মুখ্যসচিব না করে ১৯৯১ ব্যাচের আইএএস অফিসার মনোজ পন্থকে মুখ্যসচিব করেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

সুব্রতবাবু হয়তো সেটা আগাম আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই সেন্ট্রাল ক্যাডারে অর্থাৎ দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারে ডেপুটেশনে যেতে চাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও অনুমতিও চেয়েছিলেন। কিন্তু নবান্ন তাঁকে ছাড়েনি। শেষমেশ যখন পর্যন্ত ছাড়পত্র মেলে, ততদিনে চাকরির মেয়াদে অল্প কদিন বাকি ছিল। তাই দিল্লিতে গেলেও কেন্দ্রের কোনও বড় মন্ত্রকে সচিব পদে বসার সুযোগ পাননি। জানা যায়, তৎকালীন রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়ের সঙ্গে সুব্রত গুপ্তের ভাল সম্পর্ক ছিল। 

রাজ‍্যে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর সময় দুঁধে প্রাক্তন আমলাকে বিশেষ তালিকা পর্যবেক্ষক করে নির্বাচন কমিশন। তাঁর নেতৃত্বে এসআইআর প্রক্রিয়াকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেছেন সুব্রত গুপ্ত। তারপরে বিধানসভা নির্বাচনের সময় তাঁকে কোনও বড় দায়িত্ব দেওয়া হবে কি না তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। সেই জল্পনা সত্যি করেই বিধানসভা নির্বাচনের স্পেশ্যাল অবজার্ভার করা হয়।

এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে যে কোনও অশান্তি হবে না তা নিশ্চিত করেছিলেন এই প্রাক্তন আমলা সুব্রত গুপ্ত। কোনও ছাপ্পা, বুথ জ‍্যাম, গুন্ডামি যে বরদাস্ত করা হবে না তা-ও নিশ্চিত করেছিলেন তিনি। নির্বাচনের আগে ও ভোটের দিনে যে যে পদক্ষেপ কমিশন নিয়েছিল, তা নিদর্শন সৃষ্টি করে দিয়ে গিয়েছে। যেমন কথা তেমন কাজ। এ বারের ভোট শান্তিপূর্ণ ভাবেই হয়েছে। স্বাধীনতার পরে সমস্ত ভোটের রেকর্ড ভেঙে দিয়ে নজির সৃষ্টি করেছে পশ্চিমবঙ্গ। ৯৩ শতাংশ ভোটদান হয়েছে। দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার থেকে দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, সবাই কমিশনের এই আধিকারিকদের অভিনন্দন জানিয়েছেন।

স্বচ্ছতার সঙ্গে রাজ্য চালানোর জন্য যে সুব্রত গুপ্তের মতো আমলার যে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে তা বুঝতে পেরেছেন রাজ‍্যের মুখ‍্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাই এ বার সুব্রত গুপ্তকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপদেষ্টা পদে নিয়োগ করেছে রাজ্য সরকার। এর পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব নিয়োগ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব করা হল শান্তনু বালাকে। তিনি ২০১৭ ব্যাচের আইএএস। এর আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার অতিরিক্ত জেলাশাসক ছিলেন তিনি।

ভোটের ফল প্রকাশের পরেই শোনা যায়, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুই উপদেষ্টা আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদী পদত্যাগ করেছেন। তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেছিলেন, এই রাজ্যে চাকরী নেই। প্রশাসনকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলদাসে পরিণত করেছে। এই সমস্ত কর্তারাই ‘ডবল ডবল’ চাকরি পেয়েছেন। তাই এই মমতা নেতৃত্বাধীন সরকার চলে যাওয়া আর সময়ের অপেক্ষা।


Share