Surendranath College

শিয়ালদহের সিন্ডিকেটের হোতা দেবাশিস, কলেজে তোলাবাজির দায়িত্বে রাতুলদের, ভর্তি দুর্নীতির আখড়া সুরেন্দ্রনাথ কলেজ

এই বিষয়ে কলকাতা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) সোমা দাসমিত্র বলেন, মামলা রুজু করা হয়েছে। তদন্ত শুরু হয়ে গিয়েছে। কাউকে রেয়াত করা হবে না।

সুরেন্দ্রনাথ কলেজ
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬ ১০:২৯

ভর্তি দুর্নীতির সিন্ডিকেটের হোতা ছিলেন শিয়ালদহের তৃণমূল নেতা দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ছেলে শিবাশিষ বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করত। জানা গিয়েছে, নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই শিবাশিষ পলাতক। গোটা কলেজ চত্বরে দাদাগিরি, তোলাবাজি এবং ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি করিয়ে তোলা হত টাকা। সেই টাকায় সারা বছর চলত ফূর্তি।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কলেজে ভর্তি দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ। সংগঠনের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কলেজে ছাত্রভর্তিকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কাজ করছিল। কম নম্বর পাওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের টাকার বিনিময়ে ভর্তি করানো হত।

অভিযোগের তির গিয়েছে এলাকার প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে ‘কানকাটা দেবু’ এবং তাঁর ছেলে শিবাশিষ বন্দ্যোপাধ্যায় দিকে। কলেজের ছাত্রছাত্রীদের একাংশের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কলেজের নিয়ন্ত্রণ তাঁদের হাতেই ছিল। কারোও কাছ থেকে ছ’হাজার, কারোও কাছ থেকে ৫০ হাজার আবার কারোও কাছ থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। মেধার ভিত্তিতে যে তালিকা বের করার কথা তা টাকার ভিত্তিতে করা হত বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, যদি কোনও বিভাগে ৭০টা আসন থাকে তার মধ্যে ৩০টা আসন টাকার বিনিময়ের বিক্রি করে দেওয়া হত। লটারির মত সেসব আসন বিক্রি করে দেওয়া হত। এ ক্ষেত্রে কলেজের একাংশের কর্মী এবং অধ‍্যাপকের যোগসাজশ রয়েছে বলেও দাবি করছেন ছাত্রছাত্রীরা।

‘কানকাটা দেবু’ ওরফে দেবাশিস বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের ছেলে শিবাশিষ বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা হাই কোর্টের তৃণমূলপন্থী আইনজীবী। জানা গিয়েছে, সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজের অতিথি অধ্যাপক হিসেবেও যুক্ত ছিলেন। কলেজ নিয়মিত বেতনও পেতেন। ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগ অনুযায়ী, তৃণমূলের কোনও কর্মসূচি থাকলে সবাইকে ডাকা হত। বলত, আজ সবাইকে অ‍্যাডমিট কার্ড দেওয়া হবে। না এলে কেউ পাবি না। কলেজে ডেকে ঘন্টার পর ঘন্টা ইউনিয়ন রুমে বসিয়ে রাখত। জোরপূর্বক তাঁরদেরকে তৃণমূলের মিটিং-মিছিলে যেতে বাধ্য করা হত। যদি কেউ না আসত তাহলে তাঁদের চিহ্নিত করে পরে হুমকি দেওয়া হত। অকথ‍্য ভাষায় গালিগালাজ করত। কলেজের মাতুব্বরদের রোষানল থেকে নিরিহ ছাত্রীরাও বাদ পড়েনি। এক ছাত্রীর কথায়, “এখানে এলে দম বন্ধ হয়ে আসত। তাই কলেজে আসতাম না।”

ছাত্রছাত্রীদের একাংশের অভিযোগ, রাতুল ঘোষ, শুভজিৎ চক্রবর্তী এবং শুভজিৎ বর্মণ টাকার বিনিময়ে ভর্তির তালিকায় কারচুপি করে ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি করাতেন। যে বেশি টাকা দিত সেই আগে সুযোগ পেত। দিনের পর দিন এই কাজ তাঁরা করত। রাতুল দু্ই শুভজিতে নিচে কে টাকা নেবে তা ঠিক করা ছিল। কলেজের একাংশের দাবি, সুকান্ত বাহাদুর নামে এক ছাত্রের বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সুকান্ত আদলে নেপালের বাসিন্দা। ছাত্রদের দাবি, তিনি সরাসরি ভর্তি হতে ইচ্ছুদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করতেন। সুকান্তের নিচে কিছু দালাল কাজ করত। তাঁরা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পরে যাঁরা অন‍্য কলেজে ভর্তি হতে পারছেন না তাঁদের ধরে আনার কাজ করত। ভর্তির করাতে পারলে তাঁরা নিত কমিশন।

ভর্তি দুর্নীতির টাকা দলীয় তহবিলে জমা রাখা হত বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে সুকান্তর দাবি, তিনি কোনো পদাধিকারী ছিলেন না। বরং তিনি কলেজের কেরানির কাজ করত। তাকে অহেতুক ফাঁসানো হচ্ছে। ছাত্ররা এ-ও দাবি করেছে, পালাবদলের পরে সবাইকে ফোন করে বিজেপি হয়ে যাওয়ার কথাও নাকি বলেছে নেপালের বাসিন্দা সুকান্ত বাহাদুর।

এই রাতুল ঘোষের বিরুদ্ধে অতীতেও ভর্তি দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। তাঁকে কলকাতা পুলিশের গুন্ডা দমন শাখার গোয়েন্দারা গ্রেফতার করেছিল। রাতুল আদলে বাঁকুড়ার বাসিন্দা। জানা গিয়েছে, রাতুল দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ। সেই হিসেবে কলেজ ও সংলগ্ন এলাকায় তোলাবাজি, হুমকি এবং প্রভাব বিস্তারের কাজে যুক্ত ছিল। রাতুল পূর্বরেল কো-অপারেটিভ ব‍্যাঙ্কের কর্মী।ওই ব‍্যাঙ্কের কর্মীদের একাংশের দাবি, ‘তোলাবাজির’ কাজে সুনাম করায় তাঁকে দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় পুরস্কার হিসেবে চাকরি করিয়ে দিয়েছেন।

শিয়ালদহের সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে বিপুল পরিমাণ পোড়া ও ক্ষতিগ্রস্ত টাকা উদ্ধার হয়েছে। মঙ্গলবার কলেজের পিছনে অবস্থিত ইউনিয়ন রুম থেকে দুটি ব্যাগ উদ্ধার হয়। ওই ব্যাগগুলিতে ১০০ ও ৫০০ টাকার বিপুল পরিমাণ নোট ছিল। যার বেশিরভাগই পোড়া বা পোকায় কাটা অবস্থায় ছিল। পুলিশ সূত্রের খবর, তা পরীক্ষা করার প্রক্রিয়া চলছে।

এই বিষয়ে কলকাতা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) সোমা দাসমিত্র বলেন, মামলা রুজু করা হয়েছে। তদন্ত শুরু হয়ে গিয়েছে। কাউকে রেয়াত করা হবে না।


Share