Coal Scam

কয়লা পাচারের কোটি টাকা ঢুকেছে মনোরঞ্জনের স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে, ২০০৩ সালে কনস্টেবল, আট বছরে সাব ইন্সপেক্টর, আদালতে দাবি ইডির

মনোরঞ্জন মন্ডল ২০০৩ সালে সিপিএম আমলে সালে কনস্টেবল হিসেবে রাজ‍্য পুলিশে চাকরি পান। তাঁর কর্মজীবনে বেশিরভাগ সময়টাই আসানসোলের কয়লাবেল্টে কাটিয়েছেন। ২০১১ সালের সিপিএম যাওয়ার আগেই সাব ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি পান।

কয়লা পাচার মামলায় গ্রেফতার মনোরঞ্জন মন্ডল।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬ ০৪:৩৮

চুরি করা কয়লা পাচার করতে সরাসরি সাহায্য করেছে মনোরঞ্জন মন্ডল। তা করে কোটি কোটি টাকার স্ত্রীর অ‍্যাকাউন্টে ঢুকেছে। কয়লা পাচারের টাকার ভাগ তিনি পেয়েছেন। এই মামলায় ধৃত চিন্ময় মন্ডলের সঙ্গে টাকার লেনদেন হয়েছে। চিম্ময়ের ফোন থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তদন্তকারীদের অসহযোগিতার অভিযোগে মনোরঞ্জন মন্ডলকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

মনোরঞ্জন মন্ডল ২০০৩ সালে সিপিএম আমলে সালে কনস্টেবল হিসেবে রাজ‍্য পুলিশে চাকরি পান। তাঁর কর্মজীবনে বেশিরভাগ সময়টাই আসানসোলের কয়লাবেল্টে কাটিয়েছেন। ২০১১ সালের সিপিএম যাওয়ার আগেই সাব ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি পান। আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের আসানসোল উত্তর, আসানসোল দক্ষিণ, পান্ডবেশ্বর, বারাবনি, বুদবুদ থানায় বিভিন্ন সময়ে তিনি ওসির পদ সামলে ছিলেন। গতকাল ইডির হাতে গ্রেফতারির পরে তাঁকে রাজ্য পুলিশ চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি কয়লা পাচারে বেআইনি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে চিন্ময় মন্ডল এবং কিরণ খাঁ-কে ইডি গ্রেফতার করেছিল।এদের মধ্যে এক জনের বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়।

সূত্রের খবর, চিন্ময় মন্ডল কয়লা মাফিয়া জয়দেব মন্ডলের ভাই। জয়দেব মন্ডল নির্বাচনের আগে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। চিন্ময় মন্ডল এবং কিরণ খাঁ— দু’জনে সম্পর্কে মামা এবং ভাগ্নে। ইডি সূত্রের খবর, কয়লা পাচারের সিন্ডিকেটের সঙ্গে এই দু’জনের সরাসরি যোগ থাকার প্রমাণ মিলেছে। চিন্ময়ের ফোনে লেনদেন সংক্রান্ত হোয়াটসঅ‍্যাপ মেসেজ তদন্তকারীদের কাছে এসেছে। ইডি সূত্রের খবর, সেই চ‍্যাটের মধ্যে বারাবনি থানার প্রাক্তন ওসি মনোরঞ্জন মন্ডলের সঙ্গে কথপোকথন রয়েছে। সেই সূত্র ধরেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল মনোরঞ্জনকে ইডি ডেকে পাঠায়। প্রশ্নের উত্তরে অসঙ্গতি থাকায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

শুক্রবার দুপুরে মনোরঞ্জন মন্ডলকে আদালতে হাজির করানো হয়। ইডির আদালতকে জানিয়েছে, আসানসোলের কয়লাবেল্টে ৫৮টি এফআইআর দায়ের করা হয়েছিল। পরে আরও সাতটি এফআইআর দায়ের হয়। বিভিন্ন থানায় থাকাকালীন মনোরঞ্জন এই এফআইআরগুলি করেছিলেন। সেই মামলার কোনও অগ্রগতি হয়নি। এফআইআর করে তোলাবাজি করা হয়েছে। এই সমস্ত এফআইআর একত্রিত করে ইডি ইসিআইআর দায়ের করেছে।

তদন্তে নেমে ইডি জানতে পেরেছে, এলাকায় ইসিএলের কয়লা খনি থেকে অবৈধ ভাবে উত্তোলিত কয়লা ঝাড়খণ্ড এবং রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় পাচার করা হয়েছে। যে রাস্তা দিয়ে পাচারকারীরা যাবেন সেই সিন্ডিকেটকে সুরক্ষা দিতেন ওসি মনোরঞ্জন মন্ডল। চুরির কয়লা কীভাবে পাচার হবে, পরিবহণ সংক্রান্ত বিষয় গোটাটাই দেখত এই মনোরঞ্জন। তার জন্য জাল সরকারি নথি ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকী, ইসিএলে যারা কয়লা উত্তোলনের বরাত পেয়েছে তাঁদের কাছ থেকেও মোটা টাকা আদায় সে আদায় করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

ইডির আরও অভিযোগ, চিন্ময় মন্ডলের সঙ্গে যে চ‍্যাট তাঁরা পেয়েছে, তাতে কয়লা পাচারের একটি টাকার নমুনা পাওয়া গিয়েছে। ওই ১০০ টাকার নোটের নম্বর এবং নির্দিষ্ট কোড ব‍্যবহার করা হয়েছে। সেই কোড দেখেই চুরির টাকা কার কাছে যাবে যাবে যা চিহ্নিত করা হত। তাতেও ভাগ বসাত এই মনোরঞ্জন মন্ডল।আদালতের কাছে ইডি সেই নোটের ছবি এবং চেক জমা দিয়েছে।

এ দিন ইডি আদালতকে এ-ও জানিয়েছে, কয়লা পাচারের টাকা চিন্ময় মন্ডলের কোম্পানির মাধ‍্যমে মনোরঞ্জনের স্ত্রীর অ‍্যাকাউন্টে কখনও ৫০ লক্ষ টাকা, আবার কখনও ২৫ লক্ষ টাকা ঢুকেছে। মনোজ গর্গ নামে কয়লা পাচারকারীর কাছ থেকে ৮০ লক্ষ টাকা ঢুকেছে। মোট সাত কোটি টাকা তাঁর স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। ভাই, রাজু মন্ডলের অ্যাকাউন্টে আড়াই লক্ষ টাকা ঢুকেছে। গোটাটাই তিনি নিজের সরকারি পদ ব‍্যবহার করে করেছেন।

এ ছাড়াও, চিন্ময় মন্ডলকে কয়লা পাচারের সাহায্য করে দেওয়ায় তাঁর কোম্পানির ১৫ শতাংশ শেয়ার দাবি করেছিলেন মনোরঞ্জন। স্ত্রীর নামে ফ্ল‍্যাটও চিম্ময়ের কাছ থেকে নিয়েছিলেন। তাঁকে অস্থাবর সম্পত্তি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তার কোনও কাগজপত্র মনোরঞ্জন মন্ডল দেখাতে পারেননি। তাই তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়। তদন্তে অসহযোগিতা করায় বেআইনি আর্থিক লেনদেন (প্রতিরোধ) আইনের ১৯ নম্বর ধারার তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। আদালতে ১০ দিনের জন‍্য হেফাজতে নিতে চেয়ে ইডি দাবি করেছে।

মনোরঞ্জনের আইনজীবীর দাবি, তিনি সরকারি কর্মী। পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন। তাই তাঁকে গ্রেফতার করতে গেলে আদালতের অনুমতির প্রয়োজন রয়েছে। ইডি জানায়, তিনি সরকারি পদ ব‍্যবহার করে আর্থিক দুর্নীতি করেছেন। বেআইনি আর্থিক লেনদেন (প্রতিরোধ) আইনের ১৫ নম্বর ধারায় ইডিকে সংবিধান গ্রেফতার করার ক্ষমতা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতির প্রয়োজন নেই বলেও তাঁরা জানান।


Share