Suvendu Adhikari

‘গুন্ডাদমনে’ আইন আনছে রাজ‍্য সরকার, এক বছর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে রাখা যাবে আটক করে, বাজেয়াপ্ত হবে সম্পত্তিও

‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অফ পাবলিক অর্ডার ১৯৭২’ আইনের সংশোধনী বিলকে আইনে পরিণত করে কোনও সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি এবং ভাংচুরের ঘটনায় অভিযুক্তদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা যাবে।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৭ জুন ২০২৬ ০১:৫২

গুন্ডাদমনে কড়া আইন আনছে রাজ্য সরকার। সিপিএম এবং তৃণমূল জমানায় তৈরী হওয়া ‘নৈরাজ্য’, ‘মাফিয়ারাজ’ ঠেকাতেই এই কঠোর বিল আনছে রাজ্য সরকার। ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ় বিল, ২০২৬’ নামে বিলটির ইতিমধ্যেই গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। আগামী সোমবার বিধানসভায় এই বিলটি পেশ করবেন রাজ‍্যের মুখ‍্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ওই দিন এই বিলের সঙ্গেই ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অফ পাবলিক অর্ডার ১৯৭২’ আইনের সংশোধনী বিল পেশ করা হবে।

‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অফ পাবলিক অর্ডার ১৯৭২’ আইনের সংশোধনী বিলকে আইনে পরিণত করে কোনও সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি এবং ভাংচুরের ঘটনায় অভিযুক্তদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা যাবে।

রাজ‍্যে ক্ষমতায় আসার পরেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছিলেন, রাজ‍্যে সংগঠিত সমাজবিরোধীদের কার্যকলাপ রুখতে বিল আনা হবে। বিধানসভায় রাজ‍্যপালের ধন‍্যবাদসূচক বক্তৃতা রাখার সময় এই বিল আনার কথা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছিলেন। কলকাতা গেজেটের বিশেষ সংখ‍্যায় তা প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সংগঠিত সমাজবিরোধীদের কার্যকলাপ প্রতিরোধ করাই এই আইনের মূল লক্ষ্য।

এই আইনের মূল বক্তব্য, কোনও ব‍্যক্তি যদি জনসাধারণের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হয় তাহলে তাঁকে এক বছর পর্যন্ত প্রতিরোধমূলক আটক বা প্রিভেন্টিভ অ‍্যারেস্ট করা যাবে। পাশাপাশি এই ধরনের অপরাধের জন‍্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সংস্থান রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ভারতীয় ন‍্যায় সংহিতার ধারা প্রয়োগ করা হবে।

কী কী অপরাধকে সংগঠিত সমাজবিরোধী কার্যকলাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এই আইনে?

1. যে কার্যকলাপ সাধারণ মানুষের জীবনে বিপদ ডেকে আনতে পারে, জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করে এবং বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য ও পেশাগত কার্যকলাপে বাধা সৃষ্টি করে।

2. প্রাকৃতিক সম্পদের অবৈধ ভাবে খনন, বনজ সম্পদের লুট বা সরকারি সম্পদের ক্ষতি করাও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ।

বিলে ‘গুন্ডা’ হিসেবে কাদের গণ্য করার কথা বলা হয়েছে এই আইনে?

1. সমাজবিরোধী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, বা এই ধরনের কোনও গোষ্ঠীর সদস্য বা নেতা।

2. যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১১১ এবং ১১২ ধারায় সংগঠিত অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে চার্জশিট জমা পড়েছে।

3. সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক বলে পরিচিত ব্যক্তি।

4. অস্ত্র আইন, মাদক আইন, মানবপাচার প্রতিরোধ আইন এবং বিস্ফোরক আইন মোতাবেক অপরাধে যুক্ত ব্যক্তি বা অপরাধীকে সাহায্যকারী ব্যক্তি।

এই আইনে কোনও ব্যক্তিকে কী ভাবে আটক করা হবে?

1. পুলিশ সুপার বা তাঁর ওপরের পদমর্যাদার কোনও পুলিশ আধিকারিক রিপোর্ট দেবেন। সেই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে রাজ্য সরকার কোনও ব্যক্তিকে এই আইনে আটকের নির্দেশ দিতে পারে।

2. পুলিশ কমিশনার বা জেলাশাসক এই আইনে আটকের নির্দেশ দিলে, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে থাকা তথ্যপ্রমাণ দিয়ে অবিলম্বে রাজ্য পুলিশের ডিজি বা কলকাতা পুলিশের কমিশনারকে জানাতে হবে।

3. তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে কোনও ব্যক্তিকে আটক করলে, ১৫ দিনের মধ্যে সরকারের অনুমোদন নিতে হবে।

1. কোনও ব্যক্তিকে আটকের জন্য চিহ্নিত করার পরে তিনি ফেরার হয়ে গেলে, পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে যাবে। আদালত অভিযুক্তকে হাজিরা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেবে। তার পরেও তিনি হাজিরা না দিলে আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে পারে। সেই পরোয়ানার ওপর ভিত্তি করে এই আইনে অভিযুক্তের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সংস্থান থাকছে।

অ্যাডভাইসরি বোর্ড তৈরি করা হবে।

1. এই আইন কার্যকর করতে অ্যাডভাইসরি বা উপদেষ্টাদের বোর্ড তৈরি করবে রাজ্য সরকার। সেই বোর্ডে তিন জন সদস্য থাকবেন।

2. আটক করা কতটা যুক্তিযুক্ত এই বোর্ড তা বিচার করবে। সেখানে আটক ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারবন। অ্যাডভাইসরি বোর্ডের প্রধান হবেন হাই কোর্টের বর্তমান বা প্রাক্তন বিচারপতি। পাশাপাশি আরও দু’জন সদস্য থাকবেন, যাঁরা উচ্চ আদালতের বিচারপতি হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন।

বহিষ্কারের ক্ষমতা থাকছে এই আইনে

অশান্তি পাকাতে পারেন, এমন আশঙ্কা থেকে কোনও ব্যক্তিকে কোনও এলাকা থেকে বহিষ্কার করার বা সেখানে তাঁর প্রবেশ নিষিদ্ধ করার ক্ষমতাও পুলিশকে এই আইনে দেওয়া হচ্ছে। এই আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে পুলিশ এবং সরকারি কর্মীদের রক্ষাকবচের উল্লেখও এই আইনে রয়েছে।

ডব্লুবিপিএমও আইনের সংশোধনী বিলে ক্লেমস কমিশন তৈরির কথা বলা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলাশাসক বা তার ওপরের কোনও সরকারি আধিকারিক ক্লেমস কমিশনার হবেন। বিক্ষোভ, প্রতিবাদ আন্দোলনের নামে সরকারি বা বেসরকরি সম্পত্তি ধ্বংস করলে ক্লেমস কমিশনের কাছে ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করা যাবে। কমিশন জেলা বিচারক পদমর্যাদার বিচারবিভাগীয় আধিকারিকের নেতৃত্বে সেই দাবি খতিয়ে দেখবে। এর পরেই নির্ধারিত হবে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক। ঘটনায় অভিযুক্তদের কাছ থেকে সেই ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় সরকার করবে।

৩৪ বছরের সিপিএম জমানায় ‘গুন্ডারাজ’ দেখেছে রাজ‍্যবাসী। তৃণমূল ক্ষমতার আসার পরে প্রতিশ্রুতি দিলেও ‘গুন্ডারাজ’ কার্যত শিল্পে পরিণত হয়েছিল বলে বিজেপি দাবি করেছিল। এর ফলে রাজ‍্যে কোনও ভারী শিল্প এই কয়েক বছরে হয়নি। হয়নি কোনও বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ। ক্ষুদ্রশিল্প দিয়ে যে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা সম্ভব নয় তা বুঝতে পেরে রাজ‍্য সরকার। তাই বিনিয়োগের স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও মজবুত এবং শক্তিশালী করাই লক্ষ্য বলে মনে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


Share