Suvendu Adhikari

‘চিটিংবাজ ভাইপোকে কেউ বাঁচাতে পারবে না’, সেবাশ্রয় শিবিরে অনিয়মের অভিযোগ, বিস্ফোরক মুখ্যমন্ত্রী

এর জবাবে মুখ্যমন্ত্রী কড়া ভাষায় বলেন, ‘‘এ তো খুনের মামলা। চিটিংবাজ ভাইপোকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। সবক’টাকে তুলব। সব মেশিন বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।’’

সেবাশ্রয় শিবিরে অনিয়মের অভিযোগে বিস্ফোরক মুখ্যমন্ত্রী।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২৬ ০১:১৫

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে আয়োজিত ‘সেবাশ্রয়’ শিবিরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে শনিবার বিধানসভায় কড়া অবস্থান নিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি দাবি করেন, এই ঘটনায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হবে এবং কাউকেই রেয়াত করা হবে না। বক্তব্যের এক পর্যায়ে অভিষেককে কটাক্ষ করে তিনি ‘চিটিংবাজ ভাইপো’ বলেও উল্লেখ করেন। শুক্রবার ফলতা কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক দেবাংশু পণ্ডা ‘সেবাশ্রয়’ শিবিরে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিধানসভার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। সেই সূত্র ধরেই শনিবার মুখ্যমন্ত্রী এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবৃতি দেন। তিনি অভিযোগ করেন, ‘সেবাশ্রয়’ কর্মসূচিতে একাধিক ধরনের অনিয়ম হয়েছে এবং সেই সংক্রান্ত বিভিন্ন পরিসংখ্যানও বিধানসভায় তুলে ধরেন। পাশাপাশি জানান, এই কর্মসূচি নিয়ে ইতিমধ্যেই সরকারের কাছে বহু অভিযোগ জমা পড়েছে এবং সেগুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘একটি বড় স্ক্যাম সামনে এসেছে। সেটি হল, ভাইপোর সেবাশ্রয় ক্যাম্পের স্ক্যাম।’’ শুভেন্দু জানিয়েছেন, বিষ্ণুপুর থানায় সেবাশ্রয় শিবির নিয়ে বহু অভিযোগ দায়ের হয়েছে। তার পরই তিনি বেশ কয়েকটি ছবি দেখান। শুভেন্দুর অভিযোগ, সেবাশ্রয় শিবিরে চিকিৎসা করিয়ে কেউ বিকলাঙ্গ হয়েছেন, কারও পা কাটা গিয়েছে। তার পরই তিনি পর পর কয়েকটি ছবি দেখিয়ে বলেন, ‘‘এই চিটিংবাজটা কী ভাবে ক্ষতি করেছে দেখুন। বাচ্চাটির হাত গিয়েছে। আর একটি বাচ্চাকে বিকলাঙ্গ করেছে।’’ এর পর এক মহিলার ছবি দেখিয়ে বলেন, ‘‘এই দিদির পা বাদ গিয়েছে।’’ তার পরই অভিষেককে ‘চিটিংবাজ ভাইপো’ বলে আক্রমণ করেন শুভেন্দু।

মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, আল্ট্রাসোনোগ্রাফি ও এক্স-রে মেশিন বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক এবং মেডিকেল কলেজের পড়ুয়াদেরও চিকিৎসার কাজে অন্যত্র পাঠানো হয়েছে। এর জবাবে মুখ্যমন্ত্রী কড়া ভাষায় বলেন, ‘‘এ তো খুনের মামলা। চিটিংবাজ ভাইপোকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। সবক’টাকে তুলব। সব মেশিন বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।’’

বিধানসভায় সেবাশ্রয় প্রকল্প নিয়ে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তোলেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, শিবিরে রোগীদের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগের সমর্থনে তিনি চিকিৎসক রাজীব বিশ্বাসের মুখ্যমন্ত্রীকে লেখা একটি চিঠির অংশও পড়ে শোনান। পাশাপাশি, সেবাশ্রয় সংক্রান্ত এফআইআরের ভিত্তিতে প্রশাসন কী পদক্ষেপ করেছে, সেই বিষয়েও তিনি বক্তব্য রাখেন। শুভেন্দুর দাবি, সেবাশ্রয়ে হওয়া অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্তে রাজ্য পুলিশের সিআইডি, এসটিএফ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পুলিশ এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে যৌথভাবে তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, সেবাশ্রয় শিবিরে যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের অভিযোগকেই এফআইআর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, মানুষের জীবন নিয়ে যাঁরা ছিনিমিনি খেলেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর অভিযোগ, সেবাশ্রয় শিবিরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর সহযোগীদের ভূমিকারও তদন্ত হবে এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতার সংশ্লিষ্ট ধারায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উল্লেখ্য, তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালীন নিজের সংসদীয় কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারে ‘সেবাশ্রয়’ শিবির চালু করেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য সাধারণ মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা নিতে আসতেন। এমনকি, অন্য রাজ্য থেকেও বহু মানুষ এই পরিষেবার সুবিধা নিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়। সময়ের সঙ্গে ‘সেবাশ্রয়’ প্রকল্পটি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভা কেন্দ্র নন্দীগ্রামেও ‘সেবাশ্রয়’ শিবিরের আয়োজন করেছিলেন অভিষেক। পাশাপাশি, চতুর্থবার তৃণমূল সরকার গঠন করলে ‘দুয়ারে সরকার’-এর আদলে মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে ভোটের ফল প্রকাশের পর ‘সেবাশ্রয়’ প্রকল্পকে ঘিরে একাধিক অভিযোগ সামনে আসে। ডায়মন্ড হারবারে এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে একটি এফআইআরও দায়ের হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, সরকারি অনুমোদন ছাড়াই এই ধরনের স্বাস্থ্য শিবির পরিচালনা করা হয়েছিল। সেখানে বেআইনি ভাবে চিকিৎসা-সংক্রান্ত সরঞ্জাম, ওষুধ এবং বিভিন্ন চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি, প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই তেজস্ক্রিয় পদার্থ ব্যবহারের অভিযোগও সামনে এসেছে অভিষেকের আয়োজিত স্বাস্থ্য শিবিরগুলিকে ঘিরে। পাশাপাশি, একাধিক স্বাস্থ্যকর্মী ও ইন্টার্ন চিকিৎসক মৌখিক ভাবে দাবি করেছেন, তাঁদের শংসাপত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওই শিবিরে যুক্ত করা হলেও শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি। অভিযোগ, পরিস্থিতির চাপে তাঁদের ওই শিবিরগুলিতে কাজ করতেও বাধ্য করা হয়েছিল।


Share