Abhishek Banarjee

রবিবারেও বসল হাই কোর্টের বিশেষ এজলাস, অন্তর্বর্তী নির্দেশে আপাতত থমকাল অভিষেকের আমতলার দফতর ভাঙার কাজ

শনিবারের পর রবিবারও দফতরের একাংশ ভাঙার কাজ চলছিল। কিন্তু দুপুরে হাই কোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশ জারি হতেই সেই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ ০৬:০৮

সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমতলার দফতর আপাতত আর ভাঙা যাবে না। রবিবার ছুটির দিনেও বিশেষ এজলাস বসিয়ে এমনই নির্দেশ দিল কলকাতা হাই কোর্ট। আদালত জানিয়ে দিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দফতরের বর্তমান অবস্থাই বজায় রাখতে হবে। তবে ইতিমধ্যে যে অংশ ভাঙা হয়েছে, তাতে কোনও হস্তক্ষেপ করেনি আদালত। শনিবারের পর রবিবারও দফতরের একাংশ ভাঙার কাজ চলছিল। কিন্তু দুপুরে হাই কোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশ জারি হতেই সেই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আমতলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওই দফতরটি অবৈধভাবে নির্মিত হয়েছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে শনিবার ভবনের একটি অংশ ভেঙে দেয় প্রশাসন। জমিটি কেনা হয়েছিল লিপ্‌স অ্যান্ড বাউন্ডস সংস্থার নামে, যার অন্যতম পরিচালক অভিষেক। অভিযানের পর সংস্থার আইনজীবী কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতির কাছে ই-মেলের মাধ্যমে জরুরি শুনানির আবেদন জানান। সেই আবেদনের ভিত্তিতে রবিবার বিচারপতি রাজা বসুচৌধুরীর এজলাসে মামলার শুনানি শুরু হয়।

কলকাতা হাই কোর্টে শুনানিতে লিপ্‌স অ্যান্ড বাউন্ডস সংস্থার আইনজীবী কিশোর দত্ত দাবি করেন, আমতলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফতর থাকা ভবনের একাংশ ভাঙার আগে প্রকৃত জমির মালিককে কোনও শুনানির নোটিশ দেওয়া হয়নি। তাঁর বক্তব্য, যে লিপ্‌স অ্যান্ড বাউন্ডস সংস্থার নামে জমিটি কেনা হয়েছিল, সেই সংস্থার এক ডিরেক্টরের কাছে নোটিস পাঠানো হলেও ভবনের মালিককে তা জানানো হয়নি। অন্য দিকে, সরকারি আইনজীবীর দাবি, সংশ্লিষ্ট নির্মাণটি বেআইনি। শুনানির সময় বিচারপতি রাজা বসুচৌধুরী প্রশ্ন তোলেন, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের জারি করা নোটিশ সম্পর্কে ভবনের জমির মালিক আদৌ অবগত ছিলেন কি না। এরপরই হাই কোর্ট নির্দেশ দেয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আমতলার ওই ভবনে আর কোনও ভাঙচুর করা যাবে না। অর্থাৎ, বর্তমানে ভবনটি যে অবস্থায় রয়েছে, সেই অবস্থাই বজায় থাকবে।

লিপ্‌স অ্যান্ড বাউন্ডসের পক্ষে আদালতে সওয়াল করে আইনজীবী কিশোর জানান, শনিবার থেকেই ভবন ভাঙার কাজ শুরু হয়েছে। তাঁর দাবি, পঞ্চায়েত আইনের বিধি মেনে শুনানির নোটিশ দেওয়া হলেও ভবনের প্রকৃত মালিককে কোনও নোটিশ পাঠানো হয়নি। পরিবর্তে, যে সংস্থার নামে জমি কেনা হয়েছিল, সেই সংস্থার এক ডিরেক্টরের কাছে নোটিস পাঠানো হয়। সুশান্ত মণ্ডল নামে এক ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতেই জেলা পরিষদ ভাঙার পদক্ষেপ নেয় বলে আদালতে জানান তিনি। আইনজীবীর বক্তব্য, শুনানির দিন ধার্য ছিল ১৫ জুলাই, অথচ ৮ জুলাই নোটিশ পাঠানো হয়। ফলে হাজিরার জন্য মাত্র সাত দিনের সময় দেওয়া হয়েছিল, যা যুক্তিসঙ্গত নয়। তাঁর দাবি, কোনও নির্মাণ ভাঙার আগে মালিককে যথাযথভাবে নোটিশ দেওয়া এবং অভিযোগের পূর্ণ বিবরণ জানানো আইনসঙ্গত প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু এই ক্ষেত্রে অভিযোগের প্রতিলিপি, ভাঙার নির্দেশের কপি কোনওটাই দেওয়া হয়নি। আদালতে তিনি আরও বলেন, ‘‘কোনও নির্মাণ বেআইনি হলে প্রথমে আমাকে ভাঙার সুযোগ দেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে তা দেওয়া হয়নি। আইনে উল্লিখিত কোনও কিছু মানা হয়নি। সাধারণ মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে।’’

রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল সুরজিৎ নাথ মিত্র আদালতে জানান, হঠাৎ করে শুনানির সুযোগ তৈরি হওয়ায় সরকারের পক্ষে প্রয়োজনীয় নির্দেশপত্র পেশ করা সম্ভব হয়নি। তাঁর বক্তব্য, অভিযোগ পাওয়ার পর গত ৩০ জুন ভবন কর্তৃপক্ষকে নোটিশ পাঠিয়ে জানানো হয়েছিল, কোন আইনের ভিত্তিতে ওই নির্মাণ ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট নির্মাণের কোনও বৈধ অনুমোদন ছিল না এবং তা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল। সুরজিৎ নাথ মিত্রের আরও দাবি, এ ধরনের ক্ষেত্রে স্থগিতাদেশ মিললে বেআইনি নির্মাণের প্রবণতা বাড়বে। তাঁর অভিযোগ, ছুটির দিনে আদালত বসিয়ে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন সূত্রে দাবি, আমতলার পাঁচতলা ভবনটি নিয়ে জনৈক সুশান্ত মণ্ডল লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে জানা যায়, মতিউর রহমান মণ্ডলের কাছ থেকে লিপ্‌স অ্যান্ড বাউন্ডস সংস্থার নামে জমিটি কেনা হয়েছিল। সেই কারণে নিয়ম মেনে অভিযোগকারী সুশান্ত মণ্ডল, জমির বিক্রেতা মতিউর রহমান মণ্ডল এবং সংস্থার ডিরেক্টর অমিত বন্দ্যোপাধ্যায় তিন পক্ষকেই নোটিশ পাঠানো হয়। অমিত বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা। ৩০ জুন জারি করা নোটিসে ১৫ জুলাই দুপুর দু'টায় শুনানিতে হাজির থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে ৭ জুলাই আরও একটি নোটিশ পাঠানো হয়। প্রশাসনের দাবি, নির্ধারিত শুনানিতে কোনও পক্ষই উপস্থিত হননি। এরপরই সংশ্লিষ্ট নির্মাণটিকে বেআইনি ঘোষণা করে ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

শনিবার সকালে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী যৌথভাবে বাড়িটি ঘিরে ফেলে। অভিযানে উপস্থিত ছিলেন দমকলের আধিকারিক, বিডিও এবং বিএলআরও। সঙ্গে আনা হয় বুলডোজার। প্রথমে বাড়ির সামনে থাকা অস্থায়ী শেডটি ভেঙে ফেলা হয়। যদিও সেটি অস্থায়ী কাঠামো ছিল, তার নীচে বিলাসবহুল আসবাবপত্র ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাসহ একাধিক আধুনিক সুবিধা ছিল। পরে পুলিশ মূল ভবনের তালা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করে। সেই সময় ঘটনাস্থলে বহু স্থানীয় বাসিন্দা ভিড় জমান। দরজা খোলা দেখে তাঁদের কয়েক জন বাড়ির ভিতরে ঢুকে ভাঙচুর শুরু করেন। পরে পুলিশ তাঁদের সেখান থেকে বের করে দেয়।

অন্য দিকে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, শুনানিতে তাঁর দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন এবং অভিযোগের প্রতিলিপি চাইলেও প্রশাসন তা দিতে পারেনি। তাঁর অভিযোগ, ‘‘প্রশাসন অভিযোগের কপি দিতে পারেনি। অথচ দু’দিনের মধ্যেই বুলডোজ়ার চালিয়ে বাড়ির একতলা ও দোতলার বড় অংশ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’’ তাঁর আরও দাবি, সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া মেনেই অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছিল।


Share