Sukanta Majumdar

কলকাতা দখলের লড়াইয়ে শীর্ষনেতাকে নামাল বিজেপি, পুরভোট পরিচালনার দায়িত্ব সুকান্তের হাতে! হাওড়ার দায়িত্বে রাহুল সিংহ

কলকাতা পুরভোট পরিচালনা কমিটির ইনচার্জ হিসেবে দলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

কলকাতা পুরভোট পরিচালনা কমিটির ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সুকান্ত মজুমদারকে।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬ ০৯:০০

কলকাতার পুরভোটকে সামনে বিজেপি রেখে প্রস্তুতি শুরু করে দিল। কলকাতা পুরভোট পরিচালনা কমিটির ইনচার্জ হিসেবে দলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর সঙ্গে রাজ্যের এক মন্ত্রী ও এক বিধায়ককেও কমিটিতে রাখা হয়েছে। শীর্ষনেতাকে পুরভোট পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকেই কলকাতার পুরভোটকে বিজেপি কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তা স্পষ্ট।

রাজ্য বিজেপির সহ-সভাপতি অনিন্দ্য (রাজু) বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুরভোট পরিচালনা কমিটির কো-ইনচার্জ করা হয়েছে। মানিকতলার বিধায়ক তথা রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়কে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। কাশীপুর-বেলগেলাছিয়ার বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারি সহ-আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন।

মঙ্গলবার বিজেপি হাওড়া পুরসভার নির্বাচন পরিচালনা কমিটিও ঘোষণা করেছে। দলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা রাজ্যসভার সাংসদ রাহুল সিংহকে কমিটির ইনচার্জ করা হয়েছে। বালির বিজেপি বিধায়ক সঞ্জয় সিংহ আহ্বায়ক হয়েছেন।

হাওড়ায় গত আট বছর ধরে কোনও পুরবোর্ড নেই। অন্য দিকে, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কলকাতা পুরবোর্ড ভেঙে গিয়েছে। রাজ্যে পালাবদলের পর মেয়র ফিরহাদ হাকিম ইস্তফা দেন। পুরসভায় অচলাবস্থার কারণ দেখিয়েই তিনি পদত্যাগ করেন বলে জানিয়েছিলেন। তাঁর ইস্তফার পর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তৃণমূল নতুন মেয়রের নাম চূড়ান্ত করতে না পারায় রাজ্য সরকার কলকাতা পুরসভায় প্রশাসক বসায়। বর্তমানে পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডেই প্রশাসকের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।

পুরবোর্ড মেয়াদ পূর্ণ করলে কলকাতা পুরসভার ভোট চলতি বছরের ডিসেম্বর নাগাদ হওয়ার কথা ছিল। তবে বিজেপি সূত্রের খবর, পুজোর পর নভেম্বর-ডিসেম্বর নাগাদ ভোট হতে পারে ধরে নিয়েই প্রস্তুতি শুরু করেছে দল। হাওড়ার পাশাপাশি কলকাতার পুরভোটকে সামনে রেখেও বিজেপি সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে।

কলকাতা পুরভোটের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মঙ্গলবার বিধাননগরে বিজেপির রাজ্য দফতরে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল। রাজ্য নেতৃত্বের তরফে ছিলেন সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) অমিতাভ চক্রবর্তী এবং প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা কোর কমিটির সদস্য সুকান্ত মজুমদার। কলকাতা পুর এলাকার বিজেপি বিধায়কদেরও বৈঠকে ডাকা হয়েছিল। সেখানেই কলকাতা পুরভোট পরিচালনার দায়িত্ব সুকান্তের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।

কেন সুকান্তকেই এই দায়িত্ব দেওয়া হল, তা নিয়ে বিজেপি সূত্রের ব্যাখ্যা, কলকাতা দখলের লড়াইকে দল যে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে, শীর্ষনেতাকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তেই তার স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্যে দলের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কাজে সুকান্তের প্রত্যাবর্তনের বার্তাও মিলছে। রাজ্য সভাপতি পদ থেকে সুকান্তের সরে দাঁড়ানো এবং সেই পদে শমীক ভট্টাচার্যের দায়িত্ব নেওয়ার পরেও দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক মহল অর্থাৎ রাজ্য কোর কমিটিতে সুকান্তকে রাখা হয়েছিল। অন্য দিকে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর বর্তমানে রাজ্য কোর কমিটিতে না থাকলেও সুকান্তকে সেই জায়গায় রাখা হয়। এ বার কলকাতা পুরভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের দায়িত্বও তাঁর কাঁধে দেওয়ায় রাজ্য সংগঠনে বালুরঘাটের সাংসদের গুরুত্ব আরও এক বার স্পষ্ট হল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল জয়ের দাবি নিয়ে লড়াইয়ে নামলেও বিজেপির দৌড় ৭৭টি আসনে থেমে যায়। নির্বাচনে পরাজয়ের কয়েক মাস পরেই দিলীপ ঘোষকে সরিয়ে সুকান্ত মজুমদারকে রাজ্য সভাপতি করা হয়। বিজেপির একাধিক রাজ্য স্তরের নেতার মতে, সেই সময়ে দলে সুকান্তের তুলনায় বেশি পরিচিতি ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একাধিক মুখ ছিলেন। কিন্তু ততদিনে রাজ্য বিজেপির সাংগঠনিক পরিস্থিতি ছিল যথেষ্ট দুর্বল। বিভিন্ন জেলায় বিজেপি কর্মীদের উপর হামলার অভিযোগ উঠছিল। বহু কর্মী ঘরছাড়া ছিলেন, আবার অনেকে পরিস্থিতির চাপে দলবদল করেছিলেন। বিজেপি সূত্রের দাবি, এমন কঠিন সময়ে রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব নিতে অনেকেই আগ্রহী ছিলেন না। সেই পরিস্থিতিতেই সুকান্ত মজুমদার দায়িত্ব নেন। তবে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই হওয়া পুর নির্বাচনে বিজেপিকে আরও বড় ধাক্কা খেতে হয়। রাজ্যের শতাধিক পুরসভার নির্বাচনে বিজেপির ভোটের হার প্রায় ১৩ শতাংশে নেমে আসে। আসনসংখ্যার হিসাবে কিছুটা এগিয়ে থাকলেও ভোটের শতাংশের বিচারে বামেদের সম্মিলিত ভোটের চেয়েও বিজেপি পিছিয়ে ছিল। সেই সময় নিউ টাউনের একটি প্রেক্ষাগৃহে দলীয় কর্মসূচিতে অমিত শাহও বলেছিলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে আমাদের আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হবে।’’

সুকান্ত মজুমদারের রাজ্য সভাপতি থাকাকালীনই বিজেপির ‘শূন্য থেকে শুরু’ করার প্রক্রিয়া গতি পায়। ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিজেপির ভোটপ্রাপ্তির হার ১৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩ শতাংশে পৌঁছোয়। পঞ্চায়েতের তিন স্তর মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার আসনে গেরুয়া শিবির জয়লাভ করে। সংখ্যার নিরিখে যা বামফ্রন্ট, কংগ্রেস এবং আইএসএফের সম্মিলিত জয়ের প্রায় দ্বিগুণ। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপির আসনসংখ্যা কমে যায়। ১৮টি আসন থেকে নেমে বিজেপির দখলে ১২টি আসে। যদিও ভোটের হার ফের বেড়ে প্রায় ৩৯ শতাংশে পৌঁছোয়, যা ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় প্রায় এক শতাংশ বেশি।

লোকসভা নির্বাচনের পরই সুকান্ত মজুমদার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় জায়গা পান। ফলে বিজেপির ‘এক ব্যক্তি, এক পদ’ নীতির কারণে রাজ্য সভাপতির পদ তাঁকে ছাড়তে হবে, তা কার্যত স্পষ্ট হয়ে যায়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাঁর জায়গায় শমীক ভট্টাচার্য রাজ্য বিজেপির সভাপতি হন। এরপর গত এক বছরে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে একাধিক পরিবর্তন এসেছে। বিরোধী শিবির থেকে বিজেপি রাজ্যের শাসকদলে পরিণত হয়েছে। তবে সাংগঠনিক ক্ষেত্রে এখনও অনেকটা পথ এগোনো বাকি, তা বিজেপির নেতারাও জানেন।

২০২৭ সালে কলকাতা ও হাওড়ার পর রাজ্যের বাকি পুরসভাগুলিতে ভোট হওয়ার কথা। তার পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৮ সালে রয়েছে পঞ্চায়েত নির্বাচন। সেই দুই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী ও সুসংগঠিত করতে বিজেপি যে অভিজ্ঞ এবং প্রভাবশালী নেতাদের মাঠে নামানোর কৌশল নিয়েছে, সুকান্তকে কলকাতা পুরভোটের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তে তারই ইঙ্গিত মিলছে।


Share