Medical Scam

জাল নথি ব‍্যবহার না কি কেউ সাহায‍্য করেছিল বিতর্কিত চিকিৎসক অভীককে সার্ভিস কোটায় ভর্তি করতে, একাধিক আধিকারিকদের বিরুদ্ধে তদন্তের সুপারিশ করল বিশেষ কমিটি

তদন্ত কমিটির বক্তব্য, অভীক যে কোনও গ্রামীণ কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাজ করেছেন তার কোনও প্রমাণ মেলেনি। তাঁদের সন্দেহ, হয় নথি জাল করা হয়েছে। অথবা অভীককে ‘বেআইনি ভাবে’ সার্ভিস কোটায় ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আরজি কর কান্ডের বিতর্কিত চিকিৎসক অভীক দে।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৩৯

আরজি কর কান্ডের বিতর্কিত চিকিৎসক অভীক দে-কে সার্ভিস কোটায় ভর্তি করতে কারা সুপারিশ করেছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্তের সুপারিশ করল বিশেষ কমিটি। এই বিষয়ে তদন্ত করতে গত কয়েক দিন আগে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে দিয়েছিলেন রাজ‍্যের স্বাস্থ‍্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। তদন্ত কমিটির বক্তব্য, অভীক যে কোনও গ্রামীণ কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাজ করেছেন তার কোনও প্রমাণ মেলেনি। তাঁদের সন্দেহ, হয় নথি জাল করা হয়েছে। অথবা অভীককে ‘বেআইনি ভাবে’ সার্ভিস কোটায় ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁদেরকে তদন্তের আওতায় আনতে সুপারিশ করা হয়েছে।

আরজি কর কান্ডের পরে বিভিন্ন বিতর্কের মধ্যে জড়িয়ে পড়েন অভীক দে। তৃণমূল জমানায় প্রভাবশালী চিকিৎসক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন অভীক। সেই সময় আন্দোলনের চাপে পড়ে একটি কমিটি গঠন করে দেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এনআরএস হাসপাতালের প্রাক্তন অধ্যক্ষ পীতবরণ চক্রবর্তীর নেতৃত্বে সেই কমিটি তদন্ত করে ২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর একটি রিপোর্ট জমা দেয়। বিজেপি সরকারে আসার পরে সাগর দত্ত মেডিকেলের অধ‍্যক্ষ পার্থপ্রতিম প্রধানের নেতৃত্বে চার সদস্যের দ্বিতীয় কমিটি গঠন করা হয়। স্বাস্থ্য ভবন সূত্রের খবর, গত ২ সেপ্টেম্বর তাঁরা স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিকর্তার কাছে রিপোর্ট জমা দিয়েছেন।

রিপোর্টে চার সদস‍্যের কমিটির বক্তব্য, অভীক দে ২০২৩–২০২৬ শিক্ষাবর্ষে কলকাতার পিজি হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে এমএস-এ ভর্তি হন। তার জন‍্য সার্ভিস কোটার সুবিধা নিয়েছিলেন। এই কোটা মূলত তিন বছরের বেশি সময় ধরে গ্রামীণ বা দুর্গম এলাকায় পরিষেবা দেওয়া প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু অভীক দে সার্ভিস কোটার সুবিধা পেতে সেই সময়ে বর্ধমান মেডিকেল কলেজের অধীনে আনাময় সুপার স্পেশ্যালিটি উইং হাসপাতালের রেডিওডায়াগনসিস ইউনিটে কাজ করতেন বলে দেখান।

তদন্ত কমিটির দাবি, অভীক ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ থেকে ওই হাসপাতালে গ্রামীণ পরিষেবা করেছেন বলে দাবি করেছিলেন। অভীক কি আদৌ ওই হাসপাতালে কর্মরত ছিল কি না তা নিয়ে হাসপাতালের সুপার, রেডিও ডায়াগনসিস বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের বয়ান নেওয়া হয়ে। প্রাথমিক প্রমাণ যাচাই করা হয়েছে। তাঁরা কেউই কোনও দিনও অভীককে এই হাসপাতালে কাজ করতেই দেখেননি বলে দাবি করেছেন। সেখানে কাজ করার দাবির প্রসঙ্গে, কবে অভীক দে ওই হাসপাতালে যোগ দিয়েছিলেন, প্রতিদিন উপস্থিতির রেজিস্টারে স্বাক্ষর অথবা মাসে তিনি কত দিন সেখানে এসেছিলেন, সেই তথ্য হাসপাতাল তদন্ত কমিটির সামনে উপস্থাপন করতে পারেনি বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভীক দে-র গ্রামীণ হাসপাতালের পরিষেবা সংক্রান্ত শংসাপত্র যাঁরা দিয়েছিলেন, স্বাস্থ্য দফতরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা তাঁদের মধ্যেও ছিলেন। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রাক্তন স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধানেরা জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন যে, অনাময় হাসপাতালে অভীক দে-র কাজ করার বিষয়ে তাঁরা কিছুই জানতেন না। কিন্তু তার পরেও প্রাক্তন প্রিন্সিপাল সুহৃতা পাল অভীকের নামে ‘Deployment Memo’-তে ‘by-number’ ‘BMC/03A’ একটি নির্দেশ জারি করে। এ ছাড়াও, তৎকালীন রেডিও ডায়াগনসিস বিভাগের প্রধান তরুণকুমার রায় একটি বিভাগীয় নির্দেশের জারি করেছিলেন। তদন্ত কমিটির দাবি, ওই নির্দেশিকার মূল কপিটাই পাওয়া যায়নি।

এখন প্রশ্ন, তাঁরা যদি নাই জেনে থাকেন তা হলে এই নির্দেশিকা কে জারি করল, কার নির্দেশে এই নির্দেশিকা জারি করা হল, অভীক কি নিজের ক্ষমতাবলেই এই নির্দেশিকা জারি করতে বাধ্য করিয়েছিলেন না কি তৃণমূলের কোনও শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে অভীককে এ ভাবে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। কমিটি মনে করছে, বক্তব্য অনুযায়ী, ওই নথিটি পরবর্তী সময়ে তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে। নথি কি জাল করা হয়েছে, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছে তদন্ত কমিটি।

তদন্ত রিপোর্টে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থাপন করেছে। স্নাতকোত্তর চিকিৎসা শিক্ষায় ‘সার্ভিস কোটা’ ব্যবহার করে ভর্তি হতে গেলে প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি মামলা রয়েছে কি না যাচাই করতে হয়। তার Trainee Reserve বা TR নির্দেশিকা জারি করতে হয়। এই নির্দেশিকা জারি করার আগে স্বাস্থ্য দফতরের নজরদারি বিভাগ বা ভিজিল‍্যান্সের ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়। সেই সময় অভীক দে-র বিরুদ্ধে বিধাননগর আদালতে একটি ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন ছিল। রিপোর্টে ‘ME/TR-08-2023’ এবং ‘ME/MISC-435-2023’-এর উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বিভাগীয় নথিতে এই প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল। এই প্রক্রিয়া সম্প করতে প্রয়োজনীয় Vigilance Cell-এর বাধ্যতামূলক ছাড়পত্রই নেওয়া হয়নি।

চিকিৎসক নেতা যে তৃণমূল জমানায় ‘অত‍্যন্ত প্রভাবশালী’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই চার সদস্যের কমিটি চারটি সুপারিশ করেছে। তারা জানিয়েছে, সার্ভিস কোটা পাওয়ার জন্য করা দাবির ভিত্তিতে যে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হয়েছিল, তা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। অভীক দে-র বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট সরকারি পরিষেবা আইন ও বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

তদন্ত কমিটির আরও সুপারিশ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দফতরের যে আধিকারিকেরা অভীক দে-কে এমন শংসাপত্র দিয়েছিলেন, যেগুলিকে তদন্ত কমিটি তথ্যগত ভাবে ভুল বলে উল্লেখ করেছে। যাঁরা অভীককে এই শংসাপত্র বানিয়ে দিয়েছিলেন তাঁদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।


Share