Free Fare of Bus

সোমবার থেকেই মহিলারা পরিচয়পত্র দেখালেই সরকারি এসি ও দূরপাল্লার বাসেও মিলবে সুবিধা, ভর্তুকি দিয়ে কীভাবে চলবে প্রতিষ্ঠান, উঠছে প্রশ্ন

রাজ‍্য পরিবহণ দফতর জানিয়েছে, রাজ্যের সমস্ত মহিলা এই প্রকল্পের আওতায় আসবেন। ভবিষ্যতে প্রত্যেক উপভোক্তাকে একটি ডিজিটাল ‘স্মার্ট কার্ড’ দেওয়া হবে, যাতে নাম, ছবি এবং কিউআর কোড থাকবে। এই কার্ড পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট আবেদনপত্র বিডিও বা এসডিও অফিসে জমা দিতে হবে।

প্রতীকী চিত্র
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০১ জুন ২০২৬ ০২:০১

আজ ১ জুন। আর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করে সোমবার থেকেই রাজ্যের সমস্ত সরকারি বাসে মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে যাতায়াত পরিষেবা চালু করল নতুন রাজ্য সরকার। সাধারণ নন-এসি বাসের পাশাপাশি এসি ও দূরপাল্লার সরকারি বাসেও এই সুবিধা মিলবে। পরিবহণ দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, পরিষেবা শুরুর প্রথম দিনে কলকাতা ও শহরতলি জুড়ে প্রায় ৬০০টি এসি ও নন-এসি সরকারি বাস রাস্তায় নামানো হচ্ছে।

সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে অফিসযাত্রীদের ভিড় বেশি থাকায় যাত্রী পরিষেবা স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাসে ওঠা, পরিচয়পত্র যাচাই বা ভাড়া সংক্রান্ত কোনও সমস্যা এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাস ও পয়েন্টগুলিতে পরিবহণ দফতরের আধিকারিকদের মোতায়েন করা হবে। 

রাজ্যের পরিবহণ দফতর খরচ আগের থেকে বেড়েছে। কয়েক বছর আগে ঘটা করে এসি বাস কিনেছিল রাজ্য সরকার। পুরোনো বাসগুলির অবস্থা জরাজীর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোল এবং ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি খরচে আরও মাত্রা সংযোজন করেছে। সেই সঙ্গে বাসগুলির পরিচর্যা এবং আনুষঙ্গিক খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে।

গত ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের নেট স্টেট ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট ২০২৪-২৫ সালের চেয়ে ৯.৮৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৬.৩২ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছে গিয়েছে। আগের বছর এই বৃদ্ধির হার ছিল ৮.৯৪ শতাংশ। তবে এই বৃদ্ধি এখনও তামিলনাড়ু (১৫.৭৬%), উত্তরপ্রদেশ (১২.৬৪%) এবং মহারাষ্ট্র (১১.৮৫%)— এর তুলনায় কম। এমনকী, পূর্ব ভারতের বিহার, ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ডও পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বেশি বৃদ্ধির হার নথিভুক্ত করেছে। সিপিএম এবং তৃণমূল দুটি দলকেই ‘সমাজতান্ত্রবাদের পুজারি’ বলেও অনেকে বলছেন। তাঁদের মতে, রাজ‍্যে উৎপাদন নেই। রাজস্ব নেই। তার পরে দান-খয়রাতির রাজনীতি চলছে। এটার ফলে ভোটব‍্যাঙ্ক টিকে থাকতে পারে। কিন্তু ভোটারদের জীবনযাপনের সার্বিক উন্নতি সম্ভব নয়। 

৩৪ বছরের সিপিএম এবং ১৫ বছরের তৃণমূলের জমানায় রাজ্যে একটিই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হয়নি। সিপিএম জমানা থেকেই এই পতন শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালের নীতি আয়োগের বার্ষিক স্বাস্থ্য পরিসংখ্যানে রিপোর্টে পশ্চিমবঙ্গকে এমন রাজ্যগুলির মধ্যে রাখা হয়েছে, যেখানে ঋণের বোঝা উর্ধ্বমুখী। রাজ‍্যের ঋণের সঙ্গে জিএসডিপির অনুপাত দ্রুত বাড়ছে। ওই রিপোর্টে বিশেষ ভাবে পশ্চিমবঙ্গ ও পঞ্জাবকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকির মুখে থাকা রাজ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ সাত লক্ষ কোটি টাকারও বেশি।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, পর্যাপ্ত রাজস্ব বৃদ্ধি ছাড়া এ ভাবে একের পর এক বড় কল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করলে রাজ্যের আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে। অন্য দিকে, সরকারের সমর্থকদের মতে, সামাজিক সুরক্ষা ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে এই ধরনের প্রকল্প অত্যন্ত জরুরি।

বর্তমানে রাজ‍্যে মহিলা ভোটারের সংখ্যা রয়েছে তিন কোটি ৪৪ লক্ষের একটু বেশি। নন-এসি সরকারি বাসের নূন‍্যতম ভাড়া ৯ টাকা। ধরা যাক, যদি এই তিন কোটি ৪৪ লক্ষ মহিলা ভোটার একসাথে যদি একই দিনে নূন‍্যতম দূরে যাতায়াত করেন তাহলে সরকারের রাজস্ব বাবদ আয় হত ৬১ কোটি ৯২ লক্ষ টাকা। এক মাসে সেই অঙ্কটা দাঁড়ায় ১৮৫ কোটি টাকায়। এই বিপুল অঙ্কের টাকা সরকার ভর্তুকি দেবে বলেই মনে করছে অর্থনীতিবিদেরা। 

রাজ‍্য পরিবহণ দফতর জানিয়েছে, রাজ্যের সমস্ত মহিলা এই প্রকল্পের আওতায় আসবেন। ভবিষ্যতে প্রত্যেক উপভোক্তাকে একটি ডিজিটাল ‘স্মার্ট কার্ড’ দেওয়া হবে, যাতে নাম, ছবি এবং কিউআর কোড থাকবে। এই কার্ড পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট আবেদনপত্র বিডিও বা এসডিও অফিসে জমা দিতে হবে। তবে স্মার্ট কার্ড বিতরণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। ততদিন পর্যন্ত পরিচয় যাচাইয়ের জন্য একাধিক সরকারি নথি গ্রহণ করা হবে। আধার কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র, প্যান কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট, আয়ুষ্মান ভারত কার্ড, সরকারি কর্মস্থলের পরিচয়পত্র এবং স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড দেখিয়ে মহিলারা এই সুবিধা নিতে পারবেন।

স্মার্ট কার্ড চালু না হওয়া পর্যন্ত কন্ডাক্টররা পরিচয়পত্র যাচাই করে ‘জিরো ভ্যালু টিকিট’ বা থার্মাল পেপারে ছাপা বিশেষ টিকিট প্রদান করবেন। পরিবহণ দফতরের এক শীর্ষকর্তার বক্তব্য, নতুন ব্যবস্থা চালুর প্রথম কয়েক দিন কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও খুব দ্রুত যাত্রী এবং বাসকর্মীরা এই ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন।

এই স্মার্ট কার্ড ছাপাতেও সরকারের খরচা হবে। রাজ‍্যের মাথায় বিপুল অঙ্কের ঋণ থাকার পরে সেই টাকার জোগান কোথা থেকে হবে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।


Share