Annapurna Yojona

অন্নপূর্ণার টাকা না পেয়ে জেলায় জেলায় বিক্ষোভ, পোর্টালে আসছে ‘এডিট’ অপশন, জানা যাবে আবেদন বাতিলের আসল কারণ

পাশাপাশি, অন্নপূর্ণা যোজনা পোর্টালে নতুন একটি ‘এডিট’ অপশন যুক্ত করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে আবেদনকারীরা প্রয়োজন হলে জমা দেওয়া তথ্য সংশোধন করতে পারবেন।

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৯ জুলাই ২০২৬ ০১:০৮

ভোট-পরবর্তী সময়ে তৃণমূলের নেতা, সাংসদ, বিধায়ক, প্রাক্তন মন্ত্রী ও কাউন্সিলরদের লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার যে প্রতিবাদের ছবি বারবার সামনে এসেছে, এ বার সেই একই ধরনের বিক্ষোভের মুখে পড়লেন সরকারি আধিকারিক ও কর্মীরাও। অভিযোগ, অন্নপূর্ণা যোজনার অর্থ না মেলায় রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ক্ষোভে ফুঁসছেন উপভোক্তারা।

বিজেপি সরকারের এই প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ তুলে মঙ্গলবারও একাধিক জেলায় বিক্ষোভে শামিল হন অন্নপূর্ণা যোজনা থেকে বঞ্চিত মহিলারা। কোথাও বিডিওকে লক্ষ্য করে কাঁচা ডিম ছোড়া হয়েছে, কোথাও পুরকর্মীদের ঘিরে বিক্ষোভ দেখানো হয়েছে। আবার কোথাও পঞ্চায়েত প্রধানকে ঘেরাও করা হয়েছে, কোথাও পুরসভার আধিকারিককে আটকে রেখে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।

এ দিকে, অনেকের আশঙ্কা ছিল, এই পরিস্থিতির জেরে মাসিক আর্থিক সহায়তার প্রকল্পটিই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছে নবান্ন। রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, এক কোটিরও বেশি মহিলা যেমন নিয়মিত মাসে তিন হাজার টাকা পাচ্ছেন, ভবিষ্যতেও তা পেতে থাকবেন। পাশাপাশি, অন্নপূর্ণা যোজনা পোর্টালে নতুন একটি ‘এডিট’ অপশন যুক্ত করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে আবেদনকারীরা প্রয়োজন হলে জমা দেওয়া তথ্য সংশোধন করতে পারবেন।

নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্যের কোষাগারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত চাপে থাকলেও অন্নপূর্ণা যোজনা চালিয়ে যেতে সরকারের বিশেষ কোনও সমস্যার আশঙ্কা নেই। উল্লেখ্য, রাজ্যের বিজেপি সরকার তাদের প্রথম বাজেটেই অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। এর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় দু'কোটি ২০ লক্ষ মহিলাকে মাসিক আর্থিক সহায়তা দিত। গড়ে প্রত্যেক উপভোক্তা মাসে প্রায় এক হাজার ৫০০ টাকা পেতেন। এই প্রকল্পে সরকারের মাসিক ব্যয় ছিল প্রায় তিন হাজার ৩০০ কোটি টাকা এবং বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৩৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

নবান্নের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তথ্য যাচাইয়ের পর দেখা গিয়েছে, লক্ষ্মীর ভান্ডারের সুবিধাভোগীদের মধ্যে বহু অযোগ্য ব্যক্তিও ছিলেন। কর্মরত মহিলা, সরকারি কর্মী এবং আয়করদাতাদের মতো বেশ কয়েকটি শ্রেণিকে অন্নপূর্ণা যোজনার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, নতুন প্রকল্পের সুবিধা পাবেন প্রায় এক কোটি ৭০ লক্ষ মহিলা। প্রত্যেককে মাসে তিন হাজার টাকা করে দিলে সরকারের মাসিক ব্যয় দাঁড়াবে আনুমানিক পাঁচ হাজার ১০০ কোটি টাকা এবং বছরে মোট ব্যয় হবে প্রায় ৬১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। তবে বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, রাজ্যে এখন কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার থাকায় বা ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের সুবিধায় এই অতিরিক্ত ব্যয় সামলাতে কোনও আর্থিক ঘাটতি তৈরি হবে না।

গত রবিবার মুখ্যসচিব মনোজকুমার আগরওয়াল জানান, অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য মোট এক কোটি ৬২ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে এক কোটি ২২ লক্ষ আবেদন ইতিমধ্যেই অনুমোদিত হয়েছে। অন্য দিকে, বিভিন্ন ত্রুটির কারণে ২৭ লক্ষেরও বেশি আবেদন বাতিল করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের লক্ষ্য, আগামী ১০ জুলাইয়ের মধ্যে বাতিল হওয়া সমস্ত আবেদনপত্রের যাচাই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করা।

এ দিকে, বিভিন্ন জেলায় অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা না পাওয়া নিয়ে যে ক্ষোভ ও বিক্ষোভের ঘটনা সামনে এসেছে, তা দ্রুত মিটে যাবে বলেই আশ্বাস দিয়েছে নবান্ন। কারণ, খুব শিগগিরই অন্নপূর্ণা যোজনার পোর্টালে ‘এডিট’ অপশন চালু করা হচ্ছে। এর ফলে যাঁদের আবেদন বাতিল হয়েছে, তাঁরা পুনরায় পোর্টালে লগ-ইন করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংশোধন বা নতুন তথ্য যোগ করার সুযোগ পাবেন। প্রথমবার আবেদনপত্র পূরণের সময় হওয়া ভুল সংশোধন করে ফের আবেদনটি গ্রহণযোগ্য করার সুযোগ মিলবে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে।

বাতিল হওয়া আবেদনগুলি নিয়ে প্রশাসনের তরফে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। আমলাদের দাবি, যাঁদের আয়কর দেওয়ার তথ্য বা আর্থিক সচ্ছলতার প্রমাণ মিলেছে, তাঁদের কিছু আবেদন বাতিল করা হয়েছে। তবে এমন আবেদনকারীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আবেদন বাতিলের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আধার কার্ড ও মোবাইল নম্বর সংক্রান্ত অসঙ্গতি।

নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, বহু আবেদনকারীর আধার কার্ডের সঙ্গে তাঁদের নিজস্ব মোবাইল নম্বর সংযুক্ত নেই। আবার অনেক ক্ষেত্রে আধারের সঙ্গে একটি নম্বর যুক্ত থাকলেও আবেদন করার সময় অন্য মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। এমন ঘটনাও সামনে এসেছে, যেখানে একই মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে আবেদনকারী ইতিমধ্যেই পিএম কিসান-সহ অন্য সরকারি প্রকল্পের সুবিধা নিচ্ছেন। ফলে তথ্য যাচাইয়ের সময় অসঙ্গতি ধরা পড়ায় অনেকের আবেদন আপাতত বাতিল হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, প্রকৃত যোগ্য আবেদনকারীদের চিহ্নিত করতে কিছুটা সময় লাগলেও প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। তাই যোগ্যদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও কারণ নেই। সমস্ত তথ্য যাচাই শেষে যাঁরা প্রকৃতপক্ষে যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন, তাঁরা অন্নপূর্ণা প্রকল্পের তিন হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা অবশ্যই পাবেন বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

জেলায় জেলায় অন্নপূর্ণা প্রকল্পের ভাতা না-পাওয়া নিয়ে বিক্ষোভের আবহে নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছে নবান্ন। প্রশাসনের দাবি, এমন বহু মহিলা রয়েছেন যাঁরা জুন মাসে প্রকল্পের টাকা পেলেও জুলাই মাসে তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ভাতা পৌঁছোয়নি। এর জেরে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

নবান্ন সূত্রের বক্তব্য, আগে লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের সুবিধাভোগী ছিলেন এমন কয়েক জন আবেদনকারীকে জুন মাসে অন্নপূর্ণা প্রকল্পের টাকা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী তথ্য যাচাইয়ে কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়ে। এক প্রশাসনিক আধিকারিকের কথায়, ‘‘এমন বেশ কিছু কেস রয়েছে, যেখানে আমরা টাকা পাঠাতে গেলেও যাচ্ছে না। এখন ‘এডিট’ অপশন চালু হচ্ছে। এ বার সমস্যা মিটবে।’’ প্রশাসন জানিয়েছে, এত দিন আবেদন বাতিল হওয়ার কারণ জানতে পারতেন না আবেদনকারীরা। তবে এবার অন্নপূর্ণা প্রকল্পের পোর্টালে লগ ইন করেই তাঁরা জানতে পারবেন, ভাতা পাওয়ার যোগ্য কি না এবং যদি নাম বাদ পড়ে থাকে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ কী। প্রশাসনের আশা, এই নতুন ব্যবস্থার ফলে আবেদনকারীদের বিভ্রান্তি অনেকটাই দূর হবে।


Share