Chor Bagan Incident

উৎসবের আনন্দ মুহূর্তে বদলে গেল মৃত্যুমিছিলে! চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে শিশু-সহ ১৯ জনের মৃত্যু, জুতো ছড়ানো রাস্তায় শোকস্তব্ধ পাড়া, উঠছে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

আহত ২৫ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রবিবার সকালে চোরবাগানে ঢুকতেই চোখে পড়ল থমথমে পরিবেশ। উৎসবের উচ্ছ্বাসের বদলে সর্বত্র আতঙ্ক, শোক আর অবিশ্বাসের ছাপ।

চোরবাগানে দুর্ঘটনা।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ০২:০২

শনিবার রাতেও উৎসবের আনন্দে মেতে উঠেছিল চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব প্রাঙ্গণ। কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বদলে গেল গোটা এলাকার ছবি। ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে এক শিশু-সহ ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় শোকস্তব্ধ উত্তর কলকাতার এই পাড়া। আহত ২৫ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রবিবার সকালে চোরবাগানে ঢুকতেই চোখে পড়ল থমথমে পরিবেশ। উৎসবের উচ্ছ্বাসের বদলে সর্বত্র আতঙ্ক, শোক আর অবিশ্বাসের ছাপ।

মণ্ডপ সংলগ্ন অধিকাংশ বাড়ির জানলা বন্ধ। দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশের রাস্তায় নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। স্থানীয় বাসিন্দারা এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না, কয়েক ঘণ্টা আগেই তাঁদের পরিচিত এলাকায় এমন ঘটনা ঘটে গিয়েছে। এক বাসিন্দার কথায়, “শনিবার সন্ধ্যার সেই দৃশ্য মনে পড়লেই শিউরে উঠছি। এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না, আমাদের এলাকায় এত বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেল। সারারাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারিনি। শুধু সেই ভয়াবহ দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠছে।”

মণ্ডপে পৌঁছোনোর আগেই চোখে পড়ছে পুলিশের ব্যারিকেড। দুর্ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২০ মিটার পর্যন্ত রাস্তা ঘিরে রাখা হয়েছে। মোতায়েন রয়েছেন কয়েক জন পুলিশকর্মী। সরু গলি ধরে মণ্ডপের দিকে এগোতেই রাস্তার পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট-বড় জুতো চোখে পড়ে। সেই দৃশ্যই যেন শনিবার রাতের ভয়াবহ পরিস্থিতির নীরব সাক্ষী। কী কারণে এই বিপর্যয়, তা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, বিপুল জনসমাগমের তুলনায় পর্যাপ্ত পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন করা হয়নি।

বাসিন্দাদের দাবি, প্রতি বছরই চোরবাগানের এই পুজো দেখতে মানুষের ঢল নামে। এ বারও দিন যত গড়িয়েছে, ভিড় তত বেড়েছে। শনিবার সন্ধ্যাতেও সরু গলি দিয়ে দলে দলে মানুষ মণ্ডপের দিকে এগোচ্ছিলেন। হঠাৎই শোনা যায় চিৎকার। এক বাসিন্দার কথায়, “জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখি প্রবল ধাক্কাধাক্কি হচ্ছে। অনেকেই চিৎকার করছেন। তার মধ্যেই অঝোরে বৃষ্টি শুরু হয়। ফলে ঠেলাঠেলি আরও বেড়ে যায়। তার পরেই শুনতে পাই, অনেকে পদপিষ্ট হয়েছেন। পরের দৃশ্য ছিল শিউরে ওঠার মতো।”

প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের দাবি, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বহু মানুষ একসঙ্গে মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। তাতেই বাড়তে থাকে ধাক্কাধাক্কি। কয়েক জন পড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সূত্রের খবর, মণ্ডপে প্রবেশের পর একটি বৃত্তাকার ‘এলিভেটেড করিডর’ রয়েছে। ওই পথ দিয়ে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে বেরোতে হয় দর্শনার্থীদের। সেই করিডরেই বিপত্তি ঘটে বলে জানা যাচ্ছে। যদিও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনও তদন্তসাপেক্ষ।

এই বিপর্যয়ের পর উঠছে একাধিক প্রশ্ন। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, মণ্ডপে প্রবেশ ও বেরোনোর রাস্তা যথেষ্ট সরু। প্রতি বছর বিপুল ভিড় হওয়া সত্ত্বেও কী ভাবে এ বার এমন পরিস্থিতি তৈরি হল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, পুলিশ ও দমকলের তরফে পরিদর্শন এবং অনুমতি দেওয়ার পরেও কেন ভিড় নিয়ন্ত্রণে এই বিপর্যয় এড়ানো গেল না?

এই পুজোর সঙ্গে জড়িত রয়েছেন জোড়াসাঁকোর বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভাইপো দেবদীপ অধিকারী এবং উত্তর কলকাতা জেলা বিজেপির সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষ। দুর্ঘটনার পর পুজো পরিচালনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তবে ঠিক কী কারণে এত বড় বিপর্যয় ঘটল, তা জানতে তদন্তের দিকেই এখন নজর স্থানীয় বাসিন্দা ও মৃতদের পরিবারের।


Share