Stone Syndicate

এক চালানেই বারবার চলত পাথরের ট্রাক! টুলু মণ্ডলের 'পাথর সাম্রাজ্যের’ নেপথ্যে জাল চালান, কোটি টাকার রাজস্ব লোপাট

বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও সোনা উদ্ধারের পর এ বার তদন্তকারীদের নজরে এসেছে ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দফতরের জাল চালান ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব তছরুপের অভিযোগ।

বীরভূমের পাথর মাফিয়া টুলু মণ্ডল।
নিজস্ব সংবাদদাতা, বীরভূম
  • শেষ আপডেট: ৩১ জুলাই ২০২৬ ০১:৩৫

বীরভূমের পাথর মাফিয়া টুলু মণ্ডল ওরফে নাজিমুদ্দিন শেখকে ঘিরে তদন্তে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য সামনে আসছে। বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও সোনা উদ্ধারের পর এ বার তদন্তকারীদের নজরে এসেছে ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দফতরের জাল চালান ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব তছরুপের অভিযোগ। একই সঙ্গে টুলুর নির্দেশে গুরুত্বপূর্ণ নথি সরিয়ে ফেলার চেষ্টাও ভেস্তে দিয়েছে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে খবর, সেখান থেকেও জাল চালান উদ্ধার হয়েছে।

বীরভূমের একাধিক রাজস্ব গেট রয়েছে। পাথরের গাড়ি বেরোতে গেলে সেই গেট পার হতে হয়। তার জন্য ডুপ্লিকেট চালান রিসিপ্ট বা ডিসিআর লাগে। তদন্তকারীদের দাবি, একটি নির্দিষ্ট চালানের নম্বর ব্যবহার করে বারবার একাধিক পাথর ও বালি বোঝাই ট্রাক চলাচল করানো হত। নিয়ম অনুযায়ী, একটি চালান একটি গাড়ির জন্যই বৈধ। কিন্তু তা করা হয়নি। সেই একই চালানের নকল বা জাল কপি তৈরি করে অন্তত ১০ থেকে ২০টি গাড়ির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হত। ফলে  বাকি গাড়িগুলির ক্ষেত্রে সরকারি রাজস্বে ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।

গত পাঁচ বছরের ডুপ্লিকেট ডিসিআর ও কার্বন রিসিপ্ট গেট সংক্রান্ত নথি খতিয়ে দেখে তদন্তকারীরা একাধিক অসঙ্গতি পেয়েছেন। চলতি মাসেই ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দফতর এ সংক্রান্ত একটি বিশেষ মেমোরেন্ডাম জারি করেছিল। তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, এই জালিয়াতির মাধ্যমে দিনে আড়াই থেকে তিন কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। সেই টাকা চলে গিয়েছে পাথর মাফিয়া টুলু মন্ডলের কাছে। পাশাপাশি এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মাথাপিছু অন্তত দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত অবৈধ উপার্জনের অভিযোগও উঠেছে।

এ দিকে বৃহস্পতিবার মহম্মদবাজার থানার অন্তর্গত নদোহরি এলাকায় টুলু মণ্ডলের খামারবাড়ি থেকে বস্তাভর্তি নথি সরানোর সময় একটি বোলেরো গাড়ি আটক করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে পুলিশ এসে গাড়িটি বাজেয়াপ্ত করে এবং বস্তাভর্তি ফাইল নিজেদের হেফাজতে নেয়। তদন্তকারী সূত্রের খবর, উদ্ধার হওয়া নথির মধ্যে পাথর ও বালি ব্যবসার চালান, ট্রাকের কাগজপত্র, খাদান সংক্রান্ত নথি, ডিসিআর গেটের রেকর্ড এবং বিভিন্ন হিসাবের খাতা রয়েছে। এই নথিগুলি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

খামারবাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সুজিত বর্ম জানান, চালকের নির্দেশেই তিনি ফাইলগুলি গাড়িতে তুলে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে টুলু মণ্ডলের ম্যানেজার পার্থসারথি ঠাকুরও স্বীকার করেছেন যে, টুলু মণ্ডলের নির্দেশেই সমস্ত কাগজপত্র গাড়িতে তুলে রাখতে বলা হয়েছিল। যদিও সেই নথি কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি।

অন্য দিকে, টুলুর ভগ্নিপতি মহম্মদ মিনার মণ্ডলকে বৃহস্পতিবার সিউড়ি আদালতে তোলা হলে আদালত তাঁকে আট দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয়। সরকার পক্ষের আইনজীবী আদালতে দাবি করেন, টুলু মণ্ডল দেশ ছেড়ে বিদেশে পালিয়ে গিয়েছে এবং সেখান থেকেই পুরো চক্র পরিচালনা করছে।

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার গভীর রাতে মহম্মদবাজার থানার পুলিশ মিনার মণ্ডলের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের সন্ধান পায়। পাঁচটি টাকা গণনার মেশিন ও তিনটি টিনের ট্যাঙ্ক এনে দীর্ঘক্ষণ ধরে টাকা গোনার পর মোট ২৮ কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে দাবি। পাশাপাশি ২৫টি ব্যাগ ভর্তি নগদ অর্থ এবং অন্যান্য নথিও উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে মহম্মদ মিনার মণ্ডলকে গ্রেফতার করা হয়।

তদন্তকারীদের মতে, উদ্ধার হওয়া নথি ও জাল চালান সংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখলে সরকারি রাজস্ব তছরুপের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। পুরো চক্রে আর কারা জড়িত এবং জাল চালানের মাধ্যমে কত বছর ধরে এই কারবার চলেছে, তা জানতে তদন্ত আরও জোরদার করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বীরভূমের পাথর মাফিয়া হিসেবে টুলু মন্ডল ওরফে নাজিমুদ্দিনের নাম উঠে আসে। গরুপাচার মামলাতেও তৃণমূল নেতা অনুব্রত মন্ডলের সায়গল হোসেনের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ে। টুলু প্রথমে ছোটখাটো পাথর সরবরাহ করার ব‍্যবসা ছিল। পরে শেয়ারে একটি ডাম্পার কেনে। তৃণমূলের সংস্পর্শে থাকায় অবৈধ পাথর পাচারের ব‍্যবসা বাড়তে শুরু করে। ব‍্যবসা বাড়াতে থাকায় নামে-বেনামে একাধিক দু’শোর বেশি ডাম্পার রয়েছে তাঁর। তৃণমূল জমানায় পরবর্তীতে পাঁচটি সরকারি গেট— পাঁচামি, শালবদরা, রায়পুর এবং নলহাটির সরকারি টোল আদায়ের গেট টুলুর দখলে চলে যায়। সেখান থেকে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকা আদায় হত। জেলার একাধিক পাথর খাদানের মালিক এই টুলু মন্ডল। শালবদরায় বৃহত্তম পাথর খাদান ভাঙার মেশিন টুলুর রয়েছে বলেই জানা যায়।

টুলু মন্ডল ওরফে নাজিমুদ্দিন মহম্মদবাজার থানার সোঁতশালের মোড়লপাড়ায় বাসিন্দা। এর পরে একাধিক সম্পত্তির মালিক হল। বোলপুর, সিউড়ির সাজানোপল্লি, নতুনপাড়া, সুভাষপল্লিতেও বাড়ি রয়েছে টুলুর। স্থানীয়দের দাবি, তিনি এক আদিবাসী মহিলাকে নিকাহ করেন। তাঁর জমির ওপরেই পাথর খাদান শুরু করেন। তৃণমূল জমানায় এর পর থেকেই রকেটের গতিতে উত্থান হয়েছে। কলকাতাতেও টুলু মন্ডলের একাধিক সম্পত্তি রয়েছে বলে জানা যায়।


Share