Shantiniketan Medical College

বেডে ‘সাজানো’ রোগী, নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক, শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হওয়ার অনুমতি দিল না কলকাতা হাই কোর্ট

আদালতের পর্যবেক্ষণ, দ্বিতীয় আপিল কর্তৃপক্ষ যথাযথ ভাবে মনোযোগ দেয়নি। যে আদেশটি তারা দিয়েছেন, তা মূলত প্রথম আপিল কর্তৃপক্ষের আদেশ থেকে ‘কপি-পেস্ট’ করা হয়েছে। আদালত আরও উল্লেখ করেছে, যে ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশন আইন, ২০১৯-এর ধারা ২৯ অনুযায়ী আর্থিক সম্পদ, শিক্ষক ও হাসপাতাল সুবিধার মতো গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়নি।

শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজ।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:২০

বেডে যাঁরা শুয়ে রয়েছেন, তাঁরা আদতে রোগী নন। হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই। আদালতে বীরভূমের বেসরকারি শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজ নিয়ে হাই কোর্টে এমনটাই জানিয়েছে জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন বা এনএমসি। ওই কলেজে স্নাতকোত্তরে ভর্তিতে আপাতত অনুমতি দিল না কলকাতা হাই কোর্ট। কলকাতা হাই কোর্ট জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনকে বিষয়টি পুনরায় খতিয়ে দেখে বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছে। তাঁরা প্রয়োজনে ‘সারপ্রাইজ ভিজিট’ করতে পারবে বলে জানিয়েছে হাই কোর্ট।

সম্প্রতি শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজে স্নাতকোত্তর বা পিজি কোর্স চালুর অনুমতিকে কেন্দ্র করে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে সামনে এসেছে। কলকাতা হাই কোর্টে মামলা দায়ের হয়েছে। জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের অধীনে থাকা মেডিকেল অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড রেটিং বোর্ডের বা এমএআরবি-র নজরে আসে এই অনিয়ম। গত মঙ্গলবার বিচারপতি ঋতব্রত কুমার মিত্রের বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়।

ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশন কলকাতা হাই কোর্টকে রিপোর্টে জানায়, কলেজ কর্তৃপক্ষ ১৬টি বিভাগে স্নাতকোত্তর বা পিজি কোর্স চালুর আবেদন করে। অভিযোগ, সেখানে প্রয়োজনীয় অধ্যাপক নেই। নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসকও। কমিশন বলছে, পাঁচটি বিভাগে পিজি কোর্স চালুর জন্য ন্যূনতম ১৫ জন অধ্যাপকের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তাঁদের প্রতিনিধিরা সেখানে পরিদর্শনে গিয়ে তিন জন চিকিৎসকের উপস্থিতির হদিশ পাওয়া গিয়েছে।

জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের আরও অভিযোগ, হাসপাতালের বেডে ‘সাজানো’ রোগী রাখা হয়েছিল। তাঁরা আদতে রোগী নন। তাঁদের চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনও লিখিত নথি বা ইতিহাস পাওয়া যায়নি। এ ছাড়াও, কলেজে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি চালু রয়েছে। তা থাকলেও বাস্তবে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের হাসপাতালে উপস্থিতি মেলেনি বলেও হাই কোর্টে দাবি করেছে জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন। সেখানে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির নেই।

মঙ্গলবার শুনানিতে জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের আইনজীবী সুনীতকুমার রায় গোটা ঘটনাকে ‘বলিউডের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করে আদালতকে জানান, এমন একটি কলেজে কোর্স চালু করার অনুমতি দেওয়া যায় না। এটা সমাজের পক্ষে ক্ষতিকারক হবে। প্রথম থেকেই মিথ্যের ভিত্তিতে সবটা চলছে।

বিষয়টির গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে করতে নির্দেশ দিয়েছে বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্র। হাই কোর্ট, মেডিকেল কলেজে ‘সারপ্রাইজ ভিজিট’ করার নির্দেশ দেন। বর্তমানে পিজি কোর্স চালুর অনুমতি এবং কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কলেজ কর্তৃপক্ষ কোনও ভাবেই পিজি কোর্সে ভর্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারবে না বলে নির্দেশে জানিয়েছে আদালত।আগামী ১০ দিনের মধ্যে এমএআরবি-কে রিপোর্ট জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাই কোর্ট।

ঘটনাচক্রে মেডিকেল অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড রেটিং বোর্ডের বা এমএআরবি-র প্রতিনিধিরা পরিদর্শনের পর পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড রেটিং বোর্ড বেসরকারি শান্তিনিকেতনের মেডিকেল কলেজটির বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলে অনুমোদন প্রত্যাখ্যান করে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রথম আপিল করে। প্রথম আপিল কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করে, এমএআরবি মাত্র ১৬টি বিভাগের মধ্যে ৩টি বিভাগ পরিদর্শন করেছে। ফলে সব বিভাগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। এর পরে সেখানে নতুন করে সব বিভাগে ‘আকস্মিক’ পরিদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়। যদিও এই মামলায় দ্বিতীয় আপিল কর্তৃপক্ষ প্রথম আপিলের আদেশ বহাল রাখলেও নতুন পরিদর্শনের নির্দেশ দেয়নি। এই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে কলেজ কর্তৃপক্ষ হাই কোর্টে  মামলা দায়ের করে।

মামলায় আদালতের পর্যবেক্ষণ, দ্বিতীয় আপিল কর্তৃপক্ষ যথাযথ ভাবে মনোযোগ দেয়নি। যে আদেশটি তারা দিয়েছেন, তা মূলত প্রথম আপিল কর্তৃপক্ষের আদেশ থেকে ‘কপি-পেস্ট’ করা হয়েছে। আদালত আরও উল্লেখ করেছে, যে ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশন আইন, ২০১৯-এর ধারা ২৯ অনুযায়ী আর্থিক সম্পদ, শিক্ষক ও হাসপাতাল সুবিধার মতো গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়নি।

এর আগে গরুপাচার কান্ডে বেআইনি আর্থিক লেনদেনের মামলায় এই শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজের কর্ণধার মলয় পিঠকে একাধিক বার জেরা করেছে সিবিআই এবং এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। কখনও বোলপুরে অস্থায়ী ক্যাম্প অফিসে, কখনও কলকাতায় নিজাম প্যালেসে, কখনও দিল্লিতে ডেকেও মলয় পিঠকে জেরা করা হয়েছে। এমনকী, তাঁর বেসরকারি পলিটেকনিক কলেজেও অভিযান চালিয়েছিল গোয়েন্দারা ৷

গত ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে এনআরআই কোটায় ভর্তির ক্ষেত্রে দুর্নীতির তদন্তে শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজে অভিযান চালায় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। অভিযোগ, বিদেশি পড়ুয়া ভর্তির সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়নি। নিয়মবর্হিভূত ভাবে ভর্তি করিয়ে ঘুরপথে কোটি কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে। সেদিন ১২ ঘন্টা ধরে তল্লাশি চলে। সন্ধ্যায় আধিকারিকের বেরিয়ে যান। আবার মলয় পিঠের বেসরকারি মেডিকেল কলেজের নাম জড়ালো।


Share