Murder Case

দুপুরে ডেকে বিকেলে খুন, রাতে দেহ লোপাট করতে গিয়ে ধরা পড়ল প্রেমিক, পুলিশ কনস্টেবল ও অগ্নিবীর দু'টি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল অভিযুক্ত

পুলিশ সূত্রে খবর, অমিত পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষা এবং অগ্নিবীর—দু’টি পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। প্রেমিকাকে খুনের কথা স্বীকার করে পুরো ঘটনা একাই ঘটিয়েছেন বলে দাবি অভিযুক্তের।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র
নিজস্ব সংবাদদাতা, পুরুলিয়া
  • শেষ আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৩০

চার বছরের সম্পর্ক। দুই পরিবারের কেউই জানতেন না সেই সম্পর্কের কথা। শুক্রবার দুপুরে প্রেমিকের মেসে গিয়েছিলেন তরুণী। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই সম্পর্কের ভয়াবহ পরিণতি হয়। প্রেমিকাকে গলা কেটে খুন করার অভিযোগ উঠেছে প্রেমিক অমিতকুমার মাহাতোর বিরুদ্ধে। দেহ লুকিয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে সেটি বস্তায় ভরে বাইকে চাপিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন বলে অভিযোগ। অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে যাওয়ার পথে টামনা থানার পুলিশের নাকা চেকিংয়ে তিনি ধরা পড়েন।

পুলিশ সূত্রে খবর, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তবে আইনি জটিলতায় সেই নিয়োগ আটকে রয়েছে। এর পর অগ্নিবীরের পরীক্ষাতেও অমিত সফল হন। পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পরও অমিতের মুখে তেমন কোনও কথা শোনা যায়নি। থানা থেকে রবিবার আদালতে তোলা পর্যন্ত তিনি কার্যত নীরবই ছিলেন। পরে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে খুনের কথা স্বীকার করেছেন বলে তদন্তকারীরা দাবি করছে। যদিও পুরো ঘটনাটি তিনি একাই ঘটিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

ঘটনার দিন দুপুর আড়াইটে নাগাদ অমিতের মেসে পৌঁছেছিলেন তাঁর প্রেমিকা। পুলিশকে অমিত জানিয়েছেন, সেই সময় ঘরে তাঁর কোনও রুমমেট ছিলেন না। ঘরের ভিতরে ঠিক কী নিয়ে দু’জনের কথা হয়েছিল, তা এখনও তদন্তকারীদের কাছে পরিষ্কার নয়। তবে পুলিশের অভিযোগ, সেখানেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে তরুণীর গলা কেটে দেন অমিত। পরে তাঁর দেহ একটি বস্তায় ভরে রাখা হয়।

শুক্রবার রাতে সেই দেহ নিয়েই বাইকে বেরিয়েছিলেন অমিত। পুলিশের অনুমান, দেহটি অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে নিয়ে গিয়ে কোথাও ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু পুরুলিয়া শহরের কাছেই টামনা থানার এলাকায় নাকা চেকিংয়ের সময় বাইকটি আটকানো হয়। পিছনে বস্তা দেখে পুলিশের সন্দেহ হয়। বস্তায় রক্তের দাগ দেখতে পাওয়ার পর তল্লাশি চালানো হয়। তখনই উদ্ধার হয় তরুণীর দেহ।

অমিতকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেহ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। মেসবাড়িতেও তদন্ত চালায় পুরুলিয়া সদর এবং টামনা থানার পুলিশ। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তরুণীকে খুনের আগে কোনও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, সম্পর্কের মধ্যে কিছুদিন ধরেই টানাপোড়েন চলছিল। পুলিশ সূত্রে খবর, তাঁদের সম্পর্কে তৃতীয় এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিকও হয়েছিল। তার পরেই শুক্রবার অমিতের সঙ্গে দেখা করতে তরুণী তাঁর মেসে গিয়েছিলেন।

এ দিকে, দেহ নিয়ে অমিত রাত পর্যন্ত মেসে ছিলেন কেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। পুলিশের অনুমান, খুনটি সন্ধ্যার দিকে হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু দেহ সরানোর জন্য মাঝরাত পর্যন্ত অমিত অপেক্ষা করেছিলেন। সেই সময়ে মেসের অন্য বাসিন্দাদের কেউ তাঁর ঘরে ঢোকেননি কেন, পুলিশ তারও উত্তর খুঁজছে। স্থানীয় কয়েক জনের সন্দেহই শেষ পর্যন্ত তদন্তকে মেসবাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেয় বলে জানা গিয়েছে।

অমিতের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি তাঁর সাম্প্রতিক চাকরির পরীক্ষায় সাফল্যের বিষয়টিও এখন আলোচনায়। পুলিশ সূত্রে খবর, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তবে আইনি জটিলতায় সেই নিয়োগ আটকে রয়েছে। এর পর অগ্নিবীরের পরীক্ষাতেও অমিত সফল হন।

অন্যদিকে, মৃত তরুণী নার্সিংয়ের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। তাঁর বাবার দাবি, আর মাত্র দু’দিন পরই পশ্চিম মেদিনীপুরের একটি হাসপাতালে কাজে যোগ দেওয়ার কথা ছিল মেয়ের। শনিবার সন্ধ্যা ৭টার পর মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে প্রথমে মেসের মালিকের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেন। কোনও খোঁজ না পেয়ে পুরুলিয়া শহরে আসেন। পরে পুলিশের কাছ থেকে জানতে পারেন মেয়ের মৃত্যুর কথা।

অমিত এবং ওই তরুণীর বাড়ি একই এলাকার, পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি থানা এলাকায়। প্রায় চার বছর ধরে সম্পর্ক থাকলেও দুই পরিবারের দাবি, তাঁরা বিষয়টি জানতেন না।

রবিবার আদালতে তোলা হলে অমিতকে ৯ দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। তদন্তে আরও তথ্য পেতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।

ছেলের গ্রেফতারির খবর পেয়ে পুরুলিয়ায় পৌঁছেছেন অমিতের বাবা গণেশ মাহাতো। রেডিমেড পোশাক বিক্রি করে তিনি সংসার চালান। তাঁর মেয়ে, অর্থাৎ অমিতের দিদি, সন্তানসম্ভবা। তাঁকে বাঘমুন্ডির স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে। পরিবারের নজর যখন তাঁর দিদির দিকে, তখনই ছেলের গ্রেফতারির খবর আসে।

ছেলের এমন পরিণতিতে কার্যত বাকরুদ্ধ গণেশ। তিনি জানিয়েছেন, ছেলেকে ঘিরে তাঁর অনেক আশা ছিল। ভেবেছিলেন, চাকরি পেয়ে ছেলে একদিন সংসারের দায়িত্ব নেবে। কিন্তু কীভাবে পরিস্থিতি এতটা বদলে গেল, তা তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না।


Share