TMC Political Crisis

নন্দীগ্রামে কংগ্রেসকে সমর্থন মমতার, ‘সিস্টার পার্টি’-র পাশে তৃণমূল! বিজেপিকে সমর্থন নয়, নিশানায় নির্বাচন কমিশন

তাঁর বক্তব্য, কংগ্রেস ‘সিস্টার পার্টি’ এবং তাঁদের ‘স্বাভাবিক জোটসঙ্গী’। তাই নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন করবে তাঁদের শিবির। তবে বিজেপিকে কোনওভাবেই সমর্থন করা হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
নিজস্ব সংবাদদাতা, নন্দীগ্রাম
  • শেষ আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:৫৮

দলীয় নাম ও প্রতীক হাতছাড়া হয়েছে। তার পরেই নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের প্রার্থীও সরে দাঁড়িয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে আসন্ন উপনির্বাচনে নন্দীগ্রাম আসনে কংগ্রেসকে সমর্থনের ঘোষণা করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, কংগ্রেস ‘সিস্টার পার্টি’ এবং তাঁদের ‘স্বাভাবিক জোটসঙ্গী’। তাই নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন করবে তাঁদের শিবির। তবে বিজেপিকে কোনওভাবেই সমর্থন করা হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। অন্য দিকে, রেজিনগর বিধানসভা আসনেও উপনির্বাচন রয়েছে। সেই আসনে কাকে সমর্থন করা হবে, তা পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মমতা। একই সঙ্গে দলের নাম ও প্রতীক সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। বার বার কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে মমতা আক্রমণ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, দলীয় নাম ও প্রতীক হারানোর ঘটনায় কমিশনের সিদ্ধান্তের পিছনে পক্ষপাত রয়েছে।

নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা দে প্রধান মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিলেন। সঞ্চিতা মমতার তৃণমূলের হয়ে নন্দীগ্রামে প্রার্থী হয়েছিলেন। সেই মতো তিনি মনোনয়নপত্রও জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু শুক্রবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সাক্ষাতের পরই হলদিয়ায় মহকুমাশাসকের দফতরে গিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন সঞ্চিতা। এর পরেই সমাজমাধ্যমে লাইভে এসে নন্দীগ্রামে কংগ্রেসকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করেন মমতা। ফলে ওই কেন্দ্রে কংগ্রেসের প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন করবে মমতার শিবির। তবে রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্র নিয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। মমতা জানিয়েছেন, ওই কেন্দ্রের বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

প্রায় ২৯ বছর আগে কংগ্রেস ছেড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস গড়েছিলেন। দলের প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন জোড়াফুল। তবে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে এ বার সেই দলীয় নাম এবং প্রতীক— দু’টিই হাতছাড়া হয়েছে। ফলে আসন্ন উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও শিবিরই জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না। ব্যবহার করা যাবে না ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নামটিও। শুক্রবার দুই শিবিরের নতুন নাম ও প্রতীক চূড়ান্ত হয়েছে। মমতা শিবিরের নাম রাখা হয়েছে ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’। তাদের নির্বাচনী প্রতীক ‘ফুটবল পায়ে ফুটবলার’। অন্য দিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের নাম ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস’। এই শিবিরের প্রতীক ‘খাম’।

সেই নিয়েই মমতা কমিশনকে নিশানা করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘আজ গণতন্ত্রের ইতিহাসে কালো দিবস। যা হচ্ছে দুর্ভাগ্যজনক, অসাংবিধানিক, গণতন্ত্র-বিরোধী, পলিটিক্যালি বায়াসড। একটা রাজনৈতিক দলের স্বার্থ চরিতার্থ করা হচ্ছে।’’ এই প্রসঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন উদ্ধব ঠাকরে, শারদ পাওয়ারের দলের ভাঙনের কথাও। সরাসরি নাম না করে নিশানা করেছেন কমিশনকে। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের আগে উদ্ধব ঠাকরের দলের প্রতীক কেড়েছে। এনসিপি-কে ভেঙেছে। এ বার আমাদের।’’ এখানেই থামেননি মমতা। তাঁর কটাক্ষ, ‘‘আমি ব্যক্তিকে সম্মান করি না। বিজেপির হয়ে কাজ করেন। ঝুটা এসআইআর, ঝুটা ভোট করেছে। গণনা করেছে সিআরপিএফ। কাউন্টিং এজেন্টকে বার করে দিয়েছে। পুরো হাইজ্যাক করেছে। মাস্টারমাইন্ড কে? আমাদের ভদ্রতা, নাম নিচ্ছি না। হাইজ্যাক করেছে ইভিএম মেশিন।’’ তাঁর আরও দাবি, ‘মধ্যরাতে গণতন্ত্র হত্যা’ করেছে কমিশন।

তবে বিজেপি কিংবা নির্বাচন কমিশনের সামনে তিনি মাথা নত করবেন না— স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, দীর্ঘ লড়াইয়ের পরই তিনি তৃণমূল কংগ্রেস গড়ে তুলেছেন। ইতিমধ্যেই দলের ২৮ বছর পূর্ণ হয়েছে, ২৯তম বছরে পা দিয়েছে তৃণমূল। মমতার কথায়, তিনি শুধু দলের নেত্রী নন, দলই তাঁর কাছে ‘সব’।

তবে আসন্ন নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে নিজের শিবিরের প্রার্থী না রেখে কংগ্রেসকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। মমতার দাবি, বৃহস্পতিবার কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী তাঁকে ফোন করেছিলেন। ফোন করেছিলেন দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবালও। সেই সূত্রেই বিরোধী শিবিরের ‘স্বাভাবিক জোট’-এর পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। মমতার কথায়, ‘‘রাহুল গাঁধী বৃহস্পতিবার ফোন করেছিলেন। অরবিন্দও (কেজরীবাল) করেছেন। আমরা একসঙ্গে লড়ব। বিজেপি-কে ছাড়ব না। সিস্টার পার্টিকে সাপোর্ট করব। ন্যাচরাল জোটকে সাপোর্ট করব। বিজেপি-কে না।’’

নন্দীগ্রামে সঞ্চিতা মনোনয়ন প্রত্যাহারের পরেই কি কংগ্রেসকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মমতার দল? নেত্রী তা মানতে চাননি। তিনি দাবি করেছেন, আগে থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে কংগ্রেসকে জানানো হয়নি। তাঁর কথায়, ‘‘আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কংগ্রেসকে সমর্থন করব। নিজেদের মধ্যেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কংগ্রেস জানত না।’’ কংগ্রেস কি সম্মত হয়েছে? তার জবাবে মমতা বলেন, ‘‘কংগ্রেস সম্মত হওয়ার কী আছে! যে কোনও শর্তে আমাদের হেল্প করতে রাজি ওরা। আমরা প্রার্থী দিচ্ছি না। সাপোর্ট দিচ্ছি।’’ প্রশ্ন উঠেছে, তা হলে সঞ্চিতাকে প্রার্থী কেন করা হয়েছিল? পাশে বসে থাকা কুণাল ঘোষকে দেখিয়ে তখন মমতা জানান, বিষয়টি জানতেন তিনিও। তাঁর কথায়, ‘‘ও (সঞ্চিতা) বলেছিল লড়বে। ওকে ভয় দেখিয়েছে। কী করবে?’’ তার পরেই মমতা দাবি করেন, এই নিয়ে তাঁর কোনও ‘ক্ষোভ’ নেই। কারণ তিনি আগে থেকেই স্থির করেছিলেন যে, নন্দীগ্রাম আসন কংগ্রেসকে দেবেন। মমতা বলেন, ‘‘ভবিষ্যতের জোটের জন্য বার্তা দিতে চাই। বাংলা থেকে শুরু হোক সেই কাজ। তবে আমরা মনে মনে রেখেছিলাম বিষয়টি। সারপ্রাইজ়।’’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বক্তব্যে ঋতব্রত শিবিরকেও তীব্র আক্রমণ করেন। তাদের ‘বিজেপির দালাল’ বলে কটাক্ষ করে মমতা বলেন, ‘‘যদি কেউ তৃণমূলকে ভালবাসত, তা হলে এ ভাবে মা-কে কেড়ে নিত না, মাতৃহারা করত না। জোড়াফুল রক্ত দিয়ে গড়া। মা-মাটি-মানুষের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই দল তৈরি হয়েছে। আজ প্রমাণ হয়ে গেল, ওরা তৃণমূলকে ভালবাসে না। ভালবাসে নিজেদের এবং নিজেদের পরিবারকে।’’ 


Share