Agnimitra Paul

আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে রহস্য, ‘আত্মহত্যা নাকি খুন?’ প্রশ্ন অগ্নিমিত্রার, প্ররোচনার অভিযোগ সরব কুণালের

তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়েই রবিবার সকালে ঋতব্রত শিবিরের একটি প্রতিনিধি দল রামপুরহাটের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। দলে রয়েছেন ঋতব্রত ছাড়াও আখরুজ্জামান, স্নেহাশিস চক্রবর্তী, নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং রিজু দত্ত। জেলার নেতারাও ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে গিয়েছেন।

(বাঁ দিক থেকে) কুনাল ঘোষ, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অগ্নিমিত্রা পাল।
নিজস্ব সংবাদদাতা, রামপুরহাট
  • শেষ আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬ ০৫:২৩

রামপুরহাটের প্রাক্তন বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু ঘিরে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। তিনি আত্মহত্যা করেছেন, নাকি তাঁকে খুন করা হয়েছে বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তাঁর মতে, উদ্ধার হওয়া সুইসাইড নোটটিও গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করা দরকার। অন্য দিকে, তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষের দাবি, আশিস আত্মহত্যা করে থাকলেও তা প্ররোচনার ফল হতে পারে। তাঁর অভিযোগ, আশিসকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি, একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করে কুণাল শক্তিগড়ে এক বিজেপি কর্মীর বিরুদ্ধে আশিসকে হেনস্থার অভিযোগও তুলেছেন। তবে ওই ভিডিয়োর সত্যতা স্বাধীন ভাবে যাচাই করেনি এখন কলকাতা ডট কম।

আশিস রামপুরহাটের পাঁচ বারের বিধায়ক ছিলেন। তবে তিনি গত বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হন। রবিবার সকালে পুলিশ বাড়ির পাশের দলীয় কার্যালয় থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করে। ঘটনাস্থল থেকে এক পাতার একটি ‘সুইসাইড নোট’-ও উদ্ধার হয়েছে। সেখানে আশিস লিখেছেন, তাঁর মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পর কালীঘাটের নেতৃত্বের সঙ্গে আশিসের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। পরে তিনি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যোগ দেন। তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়েই রবিবার সকালে ঋতব্রত শিবিরের একটি প্রতিনিধি দল রামপুরহাটের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। দলে রয়েছেন ঋতব্রত ছাড়াও আখরুজ্জামান, স্নেহাশিস চক্রবর্তী, নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং রিজু দত্ত। জেলার নেতারাও ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে গিয়েছেন।

আশিস আদৌ আত্মঘাতী হয়েছেন কি না, প্রশ্ন তুলে অগ্নিমিত্রা বলেন, ‘‘এটা দেখা দরকার। তিনি যে আত্মহত্যাই করেছেন, খুন হননি, দেখতে হবে। লিখে গিয়েছেন মানেই আত্মহত্যা, প্রথমেই সেটা আমি বলতে চাই না। এটা তো ঠিক, তৃণমূলের সবাই যে চোর, তা তো নয়। তাঁদের মধ্যেও কেউ কেউ আছেন, যাঁরা শিরদাঁড়া সোজা করে রাজনীতি করেছেন।’’ চিঠিতে আশিসের দাবি, তিনি কখনও কোনও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। বরং তাঁকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীরাও বিষয়টি স্বীকার করছেন বলে দাবি আশিসের। এই প্রসঙ্গে অগ্নিমিত্রা জানান, তৃণমূলের কয়েক জন নেতা সৎ পথেও রাজনীতি করেছেন এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না।

আশিসের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে কুণাল এক যুবককে চিহ্নিত করে গ্রেফতারের দাবি তুলেছেন। সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করে তাঁর দাবি, ভিডিয়োটিতে গাড়ির ভিতরে আশিসকে লক্ষ্য করে এক যুবককে কড়া ভাষায় কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘‘বয়স কম হলে না চাবকে ছাল তুলে দিতাম।’’ কুণালের দাবি, ভিডিয়োতে থাকা ওই যুবক বিজেপির কর্মী। তিনি আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন। পাশাপাশি, ওই ঘটনার পর আশিসের পাশে ঋতব্রত শিবিরের কেউ দাঁড়াননি বলেও কুণাল অভিযোগ করেছেন।

বীরভূমের নেতা অনুব্রত মণ্ডল জানিয়েছেন, শক্তিগড়ে আশিসের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পূর্ণ অন্যায়। এ বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গেও তাঁর কথা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। অনুব্রতের কথায়, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। উনি আশিসের পরিবারের পাশে আছেন। শক্তিগড়ের ঘটনা ১০০ বার অন্যায়। মুখ্যমন্ত্রী এফআইআর করতে বলেছিলেন। উনি কেন করলেন না, জানি না।’’

ঋতব্রত শিবিরে যোগ দেওয়ার জন্য আশিসকে চাপ দেওয়া হয়েছিল, দাবি কুণালের। সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘‘আশিসদাকে চাপ দিয়েই ওই শিবিরে নেওয়া হয়েছিল। তিনি দলীয় নেতাদের বলার চেষ্টা করছিলেন, মমতাদির নেতৃত্বে থাকা ভাল। কিন্তু দুর্নীতির তদন্ত থেকে বাঁচতে ওদিকে যাওয়া কয়েক জন আশিসদাকে চাপ দিয়ে সঙ্গে থাকতে বাধ্য করেছিলেন। ‘ভাল তৃণমূল’ হয়েও বাঁচা যায় না। কারণ, ওখানকার পাঁচ-ছ’জন নিজের পাপ ঢাকার জন্য বিজেপির পা চাটতে গিয়েছে। সসম্মানে ওই রাজনীতি করা যায় না।’’ আশিসের সমাজমাধ্যমের পাতায় এখনও মমতা এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি রয়েছে। কুণাল তা-ও তুলে ধরেছেন।

আশিসের মৃত্যু নিয়ে কুণাল বিজেপিকেও নিশানা করেছেন। অভিযোগ, ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তারা তৃণমূল নেতাদের নানা ভাবে সামাজিক দিক থেকে অপদস্থ করছে। কুণালের কথায়, ‘‘কোনও দোষ প্রমাণের আগেই কারও বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া, কাউকে কলঙ্কিত করা, সামাজিক ভাবে অপদস্থ করার যে প্রবণতা বিজেপি শুরু করেছে, এই ঘটনা তার পরিণাম।’’ বেলেঘাটার বিধায়ক উপযুক্ত তদন্তের মাধ্যমে আশিসের মৃত্যুর রহস্য উন্মোচনের ডাক দিয়েছেন। বলেছেন, ‘‘আত্মহত্যাই, না কি অন্য রহস্য আছে, তদন্তকারীরা দেখুন। পুলিশ-প্রশাসন নিরপেক্ষ তদন্ত করুক। প্রকৃত সত্য সামনে আসুক।’’

ঋতব্রত বলেন, ‘‘আশিসদার চলে যাওয়া নিয়ে কিছু বলার ভাষা আমাদের নেই। তিনি সর্বজনশ্রদ্ধেয়। ওঁর সুইসাইড নোট হৃদয়বিদারক। নানা বিষয়ে ওঁর আক্ষেপ আমরা শুনেছি। সরকার বদলের পর যা কিছু সামনে আসছিল, আমাদের মতো আশিসদাও তা নিয়ে ভেঙে পড়েছিলেন। গত ১৫ বছরে রাজ্য জুড়ে যে সংগঠিত লুট এবং অপরাধ চলেছে, তার কুশীলব হাতে গোনা কয়েক জন হলেও খেসারত আমাদের সকলকে দিতে হচ্ছে।’’

তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও আশিসের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর জন্য বিজেপির ‘অপপ্রচার’-কে দায়ী করে সরব হয়েছেন তিনি। অভিষেক লিখেছেন, আজীবন শিক্ষক ও জনসেবক আশিসদা সততা, মর্যাদা ও সরলতার সঙ্গে দীর্ঘদিন মানুষের সেবা করেছেন। রামপুরহাটের মানুষের কাছে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ছিলেন এবং সমগ্র বীরভূমের গর্ব ছিলেন। আত্মহত্যার আগে লেখা সুইসাইড নোটে তিনি ধারাবাহিক অপপ্রচার ও তাঁকে কালিমালিপ্ত করার যন্ত্রণার কথা উল্লেখ করে গিয়েছেন বলেও অভিষেক দাবি করেন। তিনি জানান, যাঁরা এই অপপ্রচারের অংশ ছিলেন, তাঁদের নিজেদের কথা ও কাজের মানবিক পরিণতি নিয়ে ভাবা উচিত। রাজনৈতিক লড়াই চলবে, কিন্তু একটি জীবন চলে গেলে তা আর কখনও ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।


Share