TMC Political Crisis

‘সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এত তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় না,’ পুলিশকে প্রশ্ন বিচারপতির, ফ্রিজ হওয়া ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পরিচালনায় অনুমতি পেল তৃণমূল

তৃণমূলের অন্দরে কোন্দলের কথা উল্লেখ করে বেসরকারি ব‍্যাঙ্কে থাকা তিনটি অ‍্যাকাউন্টে লেনদেন স্থগিত রাখার জন‍্য আবেদন জানিয়েছিলেন অরূপ বিশ্বাস। পরে কালীঘাট গোষ্ঠীর ‘বিদ্রোহী’ বিধায়ক বিশ্বনাথ দাস বিধাননগর সাইবার থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। গত ১৮ জুন তিনি অভিযোগ করেন।

(বাঁ দিক থেকে) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৯ জুলাই ২০২৬ ০১:১৯

কলকাতা হাই কোর্টে স্বস্তি পেল তৃণমূল। তৃণমূলের তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পরিচালনার জন্য আদালত বিশেষ আধিকারিক নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছে। প্রাক্তন বিচারপতি সুব্রত তালুকদারকে বিশেষ আধিকারিক হিসেবে হাই কোর্ট নিয়োগ করেছে। একই সঙ্গে আদালত জানিয়েছে, নির্দিষ্ট শর্ত মেনেই এই অ‍্যাকাউন্টগুলি ব‍্যবহার করা যাবে। পুলিশের ভূমিকা নিয়েও বিচারপতি প্রশ্ন তুলেছেন।

তৃণমূলের অন্দরে কোন্দলের কথা উল্লেখ করে বেসরকারি ব‍্যাঙ্কে থাকা তিনটি অ‍্যাকাউন্টে লেনদেন স্থগিত রাখার জন‍্য আবেদন জানিয়েছিলেন অরূপ বিশ্বাস। পরে কালীঘাট গোষ্ঠীর ‘বিদ্রোহী’ বিধায়ক বিশ্বনাথ দাস বিধাননগর সাইবার থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। গত ১৮ জুন তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ওই তিনটি অ‍্যাকাউন্টের মধ্যে সাইবার অপরাধের টাকা জমা পড়েছে। ১৯ জুনই পুলিশ ওই তিনটি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেয়।

তৃণমূলের ব‍্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা নিয়ে পুলিশকেও আদালতের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। বিচারপতি ভট্টাচার্যের পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ দায়ের এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার ক্ষেত্রে পুলিশের ‘অস্বাভাবিক তৎপরতা’ তাঁর চোখে পড়েছে। রাজ‍্য পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিচারপতি ভট্টাচার্য মন্তব্য করেন, “একজন সাধারণ মানুষ থানায় অভিযোগ নিয়ে গেলে পুলিশ এত দ্রুত সক্রিয় হয় না। অথচ এখানে সন্ধ্যা ৬টায় অভিযোগ দায়ের হওয়ার পরের দিনই তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে।” অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নেপথ্যে পুলিশের কাছে কী কী উপাদান ছিল, তা আদালত খতিয়ে দেখার চেষ্টা করলেও এই পর্যায়ে এসে তেমন কোনও নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

কলকাতা হাই কোর্টে ‘বিদ্রোহী’ বিধায়ক বিশ্বনাথ দাসের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেছে। বিচারপতির সৌগত ভট্টাচার্যের পর্যবেক্ষণ, সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের আগে তিনি এই অভিযোগ তোলেননি। আদালতের প্রাথমিক ধারণা, অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করানোর উদ্দেশ্যেই ‘সুযোগসন্ধানী’ পদক্ষেপ করা হয়েছে।

তৃণমূলের কালীঘাট গোষ্ঠীর দাবি, বিদ্রোহী বিধায়কের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে এই কাজ করা হয়েছে। তাঁরা রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবিত। তাঁদের বক্তব্য, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হয়ে যাওয়ায় দলের দৈনন্দিন সাংগঠনিক কাজ ব্যাহত হয়েছে। তাই তা ব‍্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হোক বলে দাবি করে।

উভয় পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করে আদালত বিশেষ আধিকারিক নিয়োগের নির্দেশ দেয়। কলকাতা হাই কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি সুব্রত তালুকদারকে বিশেষ আধিকারিক হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। তার পাশাপাশি কিছু শর্ত হাই কোর্ট বেধে দিয়েছে। আদালতের নির্দেশ, সংশ্লিষ্ট তিনটি অ্যাকাউন্টের যে কোনও দু’জন অনুমোদিত স্বাক্ষরকারী বিশেষ আধিকারিকের কাছে চেক পেশ করবেন। বিশেষ আধিকারিক ওই চেকে পাল্টা স্বাক্ষর করার পরই তা ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে অর্থ তোলা যাবে। ওই অর্থ শুধুমাত্র দলের দৈনন্দিন প্রশাসনিক খরচ এবং আইনি ব্যয় মেটানোর ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যাবে। অন্য কোনও ছোট বা বড় খাতে ব্যয় করতে  অনুমতি থাকবে না। বিশেষ আধিকারিক সুব্রত তালুকদার মাসিক ১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা সাম্মানিক হিসেবে পাবেন বলে কলকাতা হাই কোর্ট জানিয়েছেন।

শুনানির সময় আদালত স্বীকার করেছে— বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রকৃত নেতৃত্ব নিয়ে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ রয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশন বিবেচনা করছে। বিদ্রোহী বিধায়কের দাবি, তাঁদের গোষ্ঠীই প্রকৃত তৃণমূল। তবে আদালত জানায়, এই মামলায় কে প্রকৃত তৃণমূল, এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এই বিষয়টি নির্বাচন কমিশনই নির্ধারণ করবে।

রাজ্যের পক্ষে সওয়াল করেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তিনি বলেন, জনগণের অর্থ ও সম্পত্তি সুরক্ষার স্বার্থেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আদালত রাজ‍্যকে পাল্টা জানায়, ভবিষ্যতে যদি নির্বাচন কমিশন কোনও একটি গোষ্ঠীকে ‘প্রকৃত তৃণমূল’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে তাঁরা আদালতে পদ্ধতি মেনে আবেদন করতে পারবে। বিদ্রোহী বিধায়কের পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী নীরজ কিশন কাউল। তৃণমূলের পক্ষে সওয়াল করেন সিনিয়র আইনজীবী অভিষেক মনুসিঙ্ঘভি ও কিশোর দত্ত।


Share