Praveen Nettaru Murder Case

কর্নাটকের বিজেপি নেতা প্রবীণ নেত্তারু হত্যা মামলায় চার বছর পর আবার ধরপাকড়, এনআইএর জালে নওশাদ-আব্বুল, মাথার দাম ছিল দু’লক্ষ টাকা

নওশাদ ও আব্দুল নাসিরের গ্রেফতারি এই মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করছে এনআইএ। কেন্দ্রীয় সংস্থার দাবি, এখনও পলাতক অন্যান্য অভিযুক্তদের খুঁজে বের করার চেষ্টা জারি রয়েছে। এই দীর্ঘদিন ধরে চলা তদন্তকে শেষ করাই এখন তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য।

প্রবীণ নেত্তারু খুনের মামলায় গ্রেফতার আরও দু’জন।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কর্ণাটক
  • শেষ আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৬ ১২:০৮

দক্ষিণ কন্নড় জেলার বিজেপি যুব মোর্চার নেতা প্রবীণ নেত্তারু হত্যাকাণ্ডের প্রায় চার বছর পর সাফল্য পেল জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা, এনআইএ। দেশজুড়ে তল্লাশি চালানোর পর অবশেষে মামলার দুই পলাতক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের নাম— নওশাদ এবং আব্বুল নাসির। নওশাদ বেলথাঙ্গাডির পাডাঙ্গাডি গ্রামের বাসিন্দা। আব্দুল নাসির কোডাগু জেলার সোমওয়ারপেটের চৌডলু এলাকার কনভেন্ট রোডের বাসিন্দা। নওশাদকে বেঙ্গালুরু থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কেরলের কোচি থেকে আব্দুল নাসিরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এনআইএয়ের দাবি, প্রবীণকে হত্যার পর মূল হামলাকারীদের কর্নাটকের কোডাগু ও মাইসুরু এবং তামিলনাড়ুর ইরোডে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন এই দুই অভিযুক্ত। মামলায় নাম থাকা ২৭ জন অভিযুক্তের মধ্যে নওশাদ এবং আব্বুল রয়েছে। তদন্ত শুরু হওয়ার পর থেকেই এই দু’জন পলাতক ছিল। তাদের প্রতি জনের মাথার দাম ছিল দু’লক্ষ টাকা। এই মামলায় এর আগে এনআইএ ২১ জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছিল। এখনও এফআইআরে নাম থাকা ছ’জন অভিযুক্ত পলাতক। এই ছ’জনের মাথাপিছু ২ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং কর্নাটক, কেরল ও তামিলনাড়ু জুড়ে দীর্ঘদিনের অভিযানের ফলেই এই দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে এনআইএ।

কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দাবি, হত্যাকাণ্ডের আগে আব্দুল নাসির সোমওয়ারপেট বাজারের কাছে একটি অটোমোবাইল দোকানে সহকারী হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। একে বারে সাধারণ জীবনযাপন করত। অন্যান্য গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ করার পরেই ষড়যন্ত্রে আব্দুলের ভূমিকার বিষয়টি সামনে আসে। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটি রাজ্যজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতেই আব্দুল সেই সুযোগে গা ঢাকা দেয়। কয়েক বছর ধরে গ্রেফতার এড়িয়ে পালিয়ে বেড়ায়।

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে এনআইএ চারজন পলাতক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে একটি সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করেছিল। অভিযুক্তদের তালিকায় নওশাদ ও আব্দুল নাসিরের নামও ছিল। আব্দুল নাসির উপসাগরীয় কোনও দেশে পালিয়ে গিয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর গতিবিধির ওপর নজরদারি চালিয়ে শেষ পর্যন্ত আব্দুলকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় এনআইএ।

গ্রেফতারের পর দুই অভিযুক্তকেই বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বেঙ্গালুরুর এনআইএ দফতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে বাকি ছয় পলাতক অভিযুক্তদের অবস্থান, কেন প্রবীণকে হত্যা করা হল, কীভাবে ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল, কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তির যোগ রয়েছে কি না এবং দীর্ঘদিন ধরে অভিযুক্তদের পালিয়ে থাকতে সহায়তা করা নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে।

২০২২ সালের ২৬ জুলাই দক্ষিণ কান্নড় জেলায় সুলিয়া তালুকের বেল্লোরের বিজেপি যুবমোর্চা নেতা প্রবীণ নেত্তারুকে তাঁর পোলট্রি দোকান বন্ধ করার সময় একদল সশস্ত্র হামলাকারী কুপিয়ে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ড কর্নাটকজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে। এনআইএ-র চার্জশিটে দাবি করা হয়েছে, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন পপুলার ফ্রন্ট অফ ইন্ডিয়া (পিএফআই)-এর সঙ্গে যুক্ত সদস্যরা পরিকল্পিত ভাবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে। তদন্তকারীদের মতে, হিন্দু কর্মীদের টার্গেট করে হত্যা এবং দেশের সীমানায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করার বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছিল।

এই হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগেই পাশের কলিঞ্জা গ্রামের ১৯ বছর বয়সি মহম্মদ মাসুদ খুন হন। সেই ঘটনার পর থেকেই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। এলাকায় অশান্তির আশঙ্কায় বহু দোকান আগেভাগেই বন্ধ হয়ে যেত। ওই পরিস্থিতির মধ্যেই প্রবীণ নেত্তারুকে তাঁর পোলট্রি দোকানের শাটার নামানোর সময় প্রাণঘাতী অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় একদল দুষ্কৃতী।

উল্লেখ্য, ৩২ বছর বয়সি প্রবীণ নেত্তারু চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবচেয়ে ছোট। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব তাঁর কাঁধেই এসে পড়ে। প্রথমে ক্যাব ট‍্যাক্সি চালাতেন। বিভিন্ন পেশায় কাজ করার পর তিনি বেল্লোরে একটি পোলট্রি ব্যবসা শুরু করেন। তাঁর স্ত্রী নূতনাও ওই ব্যবসায় তাঁকে সহযোগিতা করতেন। হত্যার মাত্র তিন বছর আগে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। প্রবীণ নেত্তারু এলাকায় একটি বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনাও করছিলেন।

বিজেপি যুবমোর্চা ও সঙ্ঘের সঙ্গে সক্রিয় ভাবে যুক্ত ছিলেন। প্রবীণ স্থানীয় সব সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন বলে পরিচিত ছিলেন। তাঁর হত্যার পর বিজেপির মধ্যেই ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এমনকী, তাঁর বাড়িতে আসা দলের শীর্ষ নেতাদের দেখে ক্ষুব্ধ কর্মীরা বিক্ষোভ দেখান। পরে পিএফআই-এর সম্ভাব্য যোগসূত্র এবং আন্তঃরাজ্য ষড়যন্ত্রের অভিযোগ সামনে আসায় তৎকালীন বিজেপি সরকার মামলার তদন্তভার এনআইএর হাতে তুলে দেয়। প্রবীণ নেত্তারু মৃত্যুর পর কর্নাটক সরকার তাঁর বিধবা স্ত্রীকে মুখ্যমন্ত্রীর দফতর চুক্তিভিত্তিক একটি চাকরি দেয়।

নওশাদ ও আব্দুল নাসিরের গ্রেফতারি এই মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করছে এনআইএ। কেন্দ্রীয় সংস্থার দাবি, এখনও পলাতক অন্যান্য অভিযুক্তদের খুঁজে বের করার চেষ্টা জারি রয়েছে। এই দীর্ঘদিন ধরে চলা তদন্তকে শেষ করাই এখন তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য।


Share