Space X

চাঁদের মাটিতে স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯-এর আঘাত! ৬০ ফুট গর্তে মিলল গভীর স্তরের পদার্থ, বাড়ল মহাকাশ-বর্জ্য নিয়ে উদ্বেগ

বর্তমানে ওই গর্তের অবস্থা কী, সংঘর্ষের পর চাঁদের পৃষ্ঠে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে এবং এর প্রভাব কতটা, তা নিয়ে বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা চলছে।

চাঁদের মাটিতে আছড়ে পড়েছে ইলন মাস্কের সংস্থার রকেট।
নিজস্ব সংবাদদাতা, দিল্লি
  • শেষ আপডেট: ২৪ আগস্ট ২০২৬ ১০:১২

ইলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ রকেটের উপরের অংশ চাঁদের মাটিতে আছড়ে পড়ে প্রায় ৬০ ফুট চওড়া একটি বিশাল গর্ত তৈরি হয়েছে। গত ৫ অগস্ট এই সংঘর্ষ ঘটে। সেই সময় রকেটটির গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় পাঁচ হাজার ৪০০ মাইল, শব্দের গতির কয়েক গুণ বেশি। পৃথিবীও বিরল এই মহাজাগতিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে। সংঘর্ষের মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করতে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা চাঁদের দিকে নজর রেখেছিলেন। বর্তমানে ওই গর্তের অবস্থা কী, সংঘর্ষের পর চাঁদের পৃষ্ঠে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে এবং এর প্রভাব কতটা, তা নিয়ে বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা চলছে।

ফ্যালকন-৯ রকেটটির ওজন প্রায় চার হাজার কিলোগ্রাম। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে স্পেসএক্স এই রকেটটি উৎক্ষেপণ করেছিল দু’টি বাণিজ্যিক লুনার ল্যান্ডারকে চাঁদের দিকে পাঠানোর উদ্দেশ্যে। সেই কাজ সফলভাবেই সম্পন্ন করেছিল ফ্যালকন-৯। কিন্তু বিপত্তি ঘটে পরবর্তী পর্যায়ে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রকেটটির পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী সব কিছু ঘটেনি। বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসার পরিবর্তে রকেটটি পৃথিবীর চারপাশে কক্ষপথে ঘুরতে থাকে। এমনকি চাঁদের কক্ষপথের কাছাকাছি পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েও সেটি পৃথিবীকে প্রদক্ষিণকারী কক্ষপথে থেকে যায়। ফলে শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষের আশঙ্কা ক্রমেই অনিবার্য হয়ে ওঠে।

মহাকাশে ফ্যালকন-৯-এর গতিপথ বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা চাঁদের পৃষ্ঠে রকেটটির সম্ভাব্য আছড়ে পড়ার সময় নির্ধারণ করেছিলেন। এরপর ১১-১২ অগস্ট নাসার লুনার রিকনাইস্যান্স অরবিটার (এলআরও) চন্দ্রপৃষ্ঠে তৈরি হওয়া নতুন গর্তটি শনাক্ত করে। চাঁদের মাটি থেকে প্রায় ৬০ মাইল উচ্চতায় থাকা অরবিটারটির তোলা ছবিতে দেখা যায়, ফ্যালকন-৯-এর আঘাতে প্রায় ৬০ ফুট চওড়া একটি গর্ত তৈরি হয়েছে। গর্তটির গভীরতা ১০ ফুটেরও কম। বিজ্ঞানীদের হাতে ইতিমধ্যেই সেই গর্তের একাধিক ছবি এসেছে। শুধু নাসাই নয়, ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থাও চাঁদের সঙ্গে রকেটটির সংঘর্ষ এবং তার পরবর্তী প্রভাব পর্যবেক্ষণ করেছে। ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজ়ার্ভেটরির শক্তিশালী টেলিস্কোপে সংঘর্ষের ফলে ছিটকে পড়া ধ্বংসাবশেষে লিথিয়াম ও সোডিয়ামের উপস্থিতিরও সন্ধান মিলেছে। পাশাপাশি, দক্ষিণ কোরিয়ার একটি চন্দ্রপ্রদক্ষিণকারী যন্ত্রও চন্দ্রপৃষ্ঠে তৈরি হওয়া গর্তটি শনাক্ত করেছে।

নাসার তোলা ছবিতে চাঁদের বুকে ধাক্কার পর তৈরি হওয়া বিশেষ কিছু দৃশ্য ধরা পড়েছে। ছবিতে বিস্ফোরণের মতো ঘটনারও ইঙ্গিত মিলেছে। দেখা গিয়েছে, ফ্যালকন-৯-এর আঘাতে চাঁদের পৃষ্ঠে তৈরি হওয়া গর্তের কিনারা থেকে উজ্জ্বল রশ্মির মতো রেখা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। বিজ্ঞানীদের অনুমান, রকেটের ধাক্কায় চন্দ্রপৃষ্ঠের গভীর স্তর থেকে বিভিন্ন উপাদান ছিটকে বেরিয়ে এসেছে। সেই চন্দ্রগর্ভস্থ পদার্থই সম্ভবত উজ্জ্বল রেখাগুলির উৎস। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও বিশদ পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

পৃথিবীর মতো চাঁদের কোনও বায়ুমণ্ডল নেই। তাই চন্দ্রপৃষ্ঠে এক বার কোনও দাগ বা গর্ত তৈরি হলে তা সহজে মুছে যায় না। প্রায় ৫০ বছর আগে নাসার অ্যাপোলো অভিযানের সময় তৈরি হওয়া চিহ্নগুলিও এখনও চাঁদের বুকে স্পষ্ট। বড় কোনও পরিবর্তন না ঘটলে সেগুলি আরও হাজার হাজার বছর টিকে থাকতে পারে। একই ভাবে ফ্যালকন-৯-এর আঘাতে তৈরি হওয়া গর্তটিও দীর্ঘ সময় ধরে চাঁদের পৃষ্ঠে থেকে যাবে।

চাঁদে মাস্কের সংস্থার রকেট আছড়ে পড়ে বিস্ফোরণ ঘটলেও পৃথিবীর উপর তার সরাসরি কোনও বড় প্রভাব পড়েনি। তবে এই ঘটনার পর নতুন করে সামনে এসেছে মহাকাশ-বর্জ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। মহাকাশ গবেষণা ও নানা অভিযানের ফলে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় নানা ধরনের পরিত্যক্ত বস্তু মহাকাশে জমা হচ্ছে। সেগুলির অনেকটাই পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ মহাকাশ-বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে এখনও কোনও সুস্পষ্ট আন্তর্জাতিক আইন বা বিধি নেই। বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন। মহাকাশে বর্জ্যের পরিমাণ এ ভাবে বাড়তে থাকলে আগামী দিনে মহাকাশ অভিযানের পথে বড় বাধা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ভবিষ্যতের গবেষণা ও মহাকাশ-ভিত্তিক বিভিন্ন প্রযুক্তি।

মহাকাশের বিভিন্ন পাথরখণ্ড, গ্রহাণু এবং পৃথিবী থেকে পাঠানো পরিত্যক্ত বস্তুর গতিবিধির উপর নজর রাখে নাসার সেন্টার ফর নিয়ার আর্থ অবজেক্ট স্টাডিজ় এবং আমেরিকার স্পেস সার্ভিল্যান্স নেটওয়ার্ক। বড় আকারের গ্রহাণু বা পাথরখণ্ড সহজেই শনাক্ত করা গেলেও অপেক্ষাকৃত ছোট বহু মহাকাশ-বর্জ্যই বিজ্ঞানীদের নজর এড়িয়ে যায়। স্পেসএক্সের রকেটের ধ্বংসাবশেষের ঘটনা সেই আশঙ্কাকেই আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। 


Share