Fugitive Offender

গত ২০১৯ সাল থেকে ২৭৪ জন পলাতক আসামিকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা, জানাল কেন্দ্রীয় সরকার

কেন্দ্রীয় সরকারের মতে, পলাতক অপরাধীদের সমস্যা শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়। এই সমস্যা দেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। কেন্দ্রের দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার বিদেশে পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণের বিষয়টিকে ‘জাতীয় অগ্রাধিকার’ হিসেবে গ্রহণ করেছে।

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৬ ০৫:৫০

গত ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ২৭৪ জন পলাতক আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ফিরিয়ে আনা আসামিদের মধ্যে খুন, ধর্ষণ, গ‍্যাংস্টার, দেশ বিরোধী কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা অভিযুক্তদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এর পাশাপাশি ১৭ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।

মঙ্গলবার এই সংক্রান্ত একটি প্রেস বিবৃতি জারি করেছে পিআইবি। কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য, গত ২০১৪ সালের আগে বিদেশ থেকে অপরাধীদের ভারতের প্রত্যর্পণ ব্যবস্থা যথেষ্ট দুর্বল ছিল। সেই সময় মাত্র ৩৭টি দেশের সঙ্গে প্রত্যর্পণ চুক্তি ছিল। আর্থিক তছরুপ মামলায় অভিযুক্ত পলাতকদের বিরুদ্ধে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার জন্য আলাদা কোনও আইন ছিল না। ২০০৪ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে গড়ে প্রতি বছরে মাত্র চারজন পলাতককে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। এর কারণ হিসেবে বলতে গিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, বহু প্রত্যর্পণ আবেদন নথি অসম্পূর্ণ ছিল। আইনি জটিলতার পাশাপাশি এবং বিভিন্ন মন্ত্রকের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল। তাই প্রত‍্যার্পণ আটকে থাকত।

পিআইবির দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ন’জন আর্থিক প্রতারণার অভিযুক্ত, ১৭ জন সন্ত্রাস বা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে অভিযুক্ত, ৪২ জন সংগঠিত অপরাধ, গ‍্যাংস্টার বা তোলাবাজি মামলায় অভিযুক্ত, ৬২ জনকে খুন, ডাকাতি বা অন্যান্য হিংসাত্মক অপরাধে অভিযুক্ত, ৫৩ জন ধর্ষণ ও পকসো মামলার অভিযুক্ত, ১৬ জন মাদক পাচারকারী, ১২ জন জাল নোট, সাইবার অপরাধের অভিযুক্ত, মামলার অভিযুক্ত এবং ৪৫ জন অন্যান্য মামলায় অভিযুক্তেরা এর মধ্যে রয়েছে। সব মিলিয়ে গত ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ২৭৪ জন আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, অর্থিক তছরুপ প্রতিরোধ আইনের প্রয়োগ করে গত ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে পলাতক অপরাধীদের ১৭ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। একই সময়ে অর্থনৈতিক অপরাধে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে ১৮ হাজার ৭৬২ কোটি টাকার সম্পদ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।

এ ছাড়াও, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ইন্টারপোলের রেড কর্নার নোটিস জারির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। ২০২২ সালে ৪০টি, ২০২৩ সালে ১০০টি, ২০২৪ সালে ১০৭টি, ২০২৫ সালে ১১২টি এবং ২০২৬ সালে এখনও পর্যন্ত ১৮২টি রেড কর্নার নোটিস জারি হয়েছে। গত তিন বছরে মোট ৪০১ জন পলাতকের বিরুদ্ধে রেড কর্নার নোটিস জারি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের মতে, পলাতক অপরাধীদের সমস্যা শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়। এই সমস্যা দেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। কেন্দ্রের দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার বিদেশে পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণের বিষয়টিকে ‘জাতীয় অগ্রাধিকার’ হিসেবে গ্রহণ করেছে। পিআইবি জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশে পলাতকদের ফিরিয়ে আনার কৌশলকে তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিযান, একে অপরের সঙ্গে শক্তিশালী সমন্বয় এবং কৌশলগত কূটনীতি।

গত ২০১৮ সালে পলাতক অর্থনৈতিক অপরাধী আইন কার্যকর হয়েছে। এর মাধ্যমে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এরপর ২০১৯ সালে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা সংশোধনী আইন এবং দেশবিরোধী কার্যকলাপ সংশোধনী আইন কার্যকর হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে বিদেশে থাকা জঙ্গি, তাদের হ্যান্ডলার, অর্থের জোগানদাতা এবং সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা আরও বাড়ানো হয়েছে।

গত ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে ভারত ইন্টারপোলের ৯০তম সাধারণ অধিবেশনের আয়োজন করে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে চালু করা হয় ‘BHARATPOL’ প্ল্যাটফর্ম চালু করে। যেখানে সিবিআই, রাজ্য পুলিশ, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা-সহ এক হাজার ৪০০-রও বেশি ইউনিটকে ইন্টারপোলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে তথ্য আদানপ্রদানের সময় উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে এসেছে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ৩ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

পিআইবি আরও জানিয়েছে, এই সাফল্যের নেপথ্যে আইবি, সিবিআই, আর অ‍্যান্ড এডব্লুউ, আইবি, এনআইএ, ইডি, বিদেশ মন্ত্রক, এনসিবি, ডিজিজিআই এবং বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ রয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মাল্টি এজেন্সি সেন্টার (ম‍্যাক)-এর অধীনে একটি ‘Standing Focus Group’ গঠন করা হয়েছে। এই দলটি গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে নজরদারি, তথ্য সমন্বয় এবং বিদেশি সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে।

উল্লেখ্য, গত ২০২৪ সালে কার্যকর হওয়া তিনটি নতুন ফৌজদারি আইনের মধ্যে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ৩৫৫ ও ৩৫৬ ধারায় প্রথম বার পলাতক অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতেই বিচার শুরুর বিধান রয়েছে। এর ফলে অভিযুক্ত উপস্থিত না থাকলেও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।


Share