IB Officer Murder Case

‘মৃতদেহকে পশুর দেহের মতো ফেলে দেওয়া হয়েছিল নর্দমায়,’ বিচার পেলেন আইবি আধিকারিক অঙ্কিত, তাহির হোসেন-সহ চার দোষীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ আদালতের

তাহির হেসেনকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ (খুন), ৩৬৫ (গোপনে ও বেআইনি ভাবে আটক করার উদ্দেশ্যে অপহরণ), ১৪৭ (দাঙ্গা), ১৪৮ (প্রাণঘাতী অস্ত্র নিয়ে দাঙ্গা), ১৫৩এ (দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ানো) এবং ১৮৮ (সরকারি কর্মচারীর জারি করা আদেশ অমান্য করা) ধারায়, ১৪৯ (বেআইনি জমায়েত)-এর অধীনে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

বিচার পেলেন নিহত আইবির আধিকারিক অঙ্কিত শর্মা।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২৬ ০১:২৪

২০২০ সালে আইবি (ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো)-র আধিকারিক অঙ্কিত শর্মাকে হত্যার মামলায় রায় দিল দিল্লির কারকারদোমা আদালত। এই মামলায় আম আদমি পার্টির প্রাক্তন কাউন্সিলর তাহির হেসেনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হল। তাহির ছাড়া, নাজিম কাশিম, জাভেদ এবং আনাসকেও এই মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, অঙ্কিতের ধর্ম নিশ্চিত করে খুন করেছিল তাহির হোসেন এবং তার দলবল। 

গত ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দিল্লিতে নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন এবং জাতীয় নাগরিকত্ব পঞ্জিকা নিয়ে তথাকথিত আন্দোলন হয়। সেই বিক্ষোভ চলাকালীন উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। হিংসার ঘটনায় ৫৩ জন নিহত হন। বহু মানুষ আহত হন। জানা যায়, ২৫ ফেব্রুয়ারি বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আইবি আধিকারিক অঙ্কিত শর্মা নিখোঁজ হন। পরের দিন, চাঁদবাগ পুলিয়ার কাছে খাজুরি খাস এলাকার একটি নর্দমা থেকে অঙ্কিত শর্মার দেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর বাবা রবিন্দর কুমার দয়ালপুর থানায় আম আদমি পার্টির তৎকালীন কাউন্সিলর তাহির হোসেন-সহ অন্যদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগে এফআইআর দায়ের করেন। ৩ জুন দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ কারকারদোমা আদালতে তাহির হোসেন-সহ ১০ জনের বিরুদ্ধে অপহরণ, খুন এবং দাঙ্গার অভিযোগে চার্জশিট দাখিল করে। ওই বছরের অগস্ট মাসে আদালত চার্জশিট গ্রহণ (কগনিস্যান্স) করে। এর পরে গত ২০২৩ সালের ২৪ মার্চ আদালত তাহির হোসেন-সহ ১০ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে খুন, দাঙ্গা, বিদ্বেষ ছড়ানো এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র-সহ বিভিন্ন ধারায় চার্জ গঠন করে। 

এর পরে চলতি বছরের ১৩ জুলাই আদালত তাহির হোসেন এবং আরও চার জনকে অঙ্কিত শর্মাকে ‘নৃশংস ভাবে’ হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে। তাহির হোসেন খুনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলেও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনার অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস পেয়েছে। আরও ছ’জন সহ-অভিযুক্তও বেকসুর খালাস পায়। গত ২৭ জুলাই সাজা ঘোষণা নিয়ে উভয় পক্ষের যুক্তি শোনার পরে আদালত রায় সংরক্ষণ করে। আজ, শুক্রবার  সাজা ঘোষণার দিন ধার্য করে।

এ দিন অতিরিক্ত সেশন জজ প্রবীণ সিংহ রায় পড়ে শোনান। আদালত জানিয়েছে, নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলাকালীন উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় আইবির আধিকারিক অঙ্কিত শর্মাকে ‘চূড়ান্ত নৃশংসতার’ সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা হয়। তাঁকে যে ভাবে হত্যা করা হয়েছে তা ‘নারকীয়’ এবং ‘গা শিউরে ওঠার মতো’।

আইবি আধিকারিক অঙ্কিত শর্মার ধর্ম নিশ্চিত করে হত‍্যা করা হয়েছে। শুধু মাত্র ধর্মীয় কারণে তাঁকে ‘রক্তপিপাসু হত্যাকারী’ জনতার মধ্যে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে আদালত রায়ে উল্লেখ করেছে। বিচারকের পর্যবেক্ষণ, অঙ্কিতের ওপর হামলা ঘটনা এতটাই হিংস্র, নিরবচ্ছিন্ন এবং এত কাছ থেকে করা হয়েছিল যে মৃত্যু হওয়ার পরেও অঙ্কিত শর্মার দেহ সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়েনি। মৃত্যুর পরেও তাঁর ওপর বর্বরতা চলতে থাকে। তাঁর মৃতদেহটিকে একটি পশুর মতো বেঁধে চাঁদবাগ পুলিয়ার দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। তাতেও অপরাধিদের ‘ঘৃণার তৃষ্ণা’ না মিটলে মৃতদেহটিকে রাস্তার পাশে নর্দমায় ফেলে দেওয়া হয়। তাই এই ‘চরম নৃশংসতা’ অত্যন্ত গুরুতর মাত্রার একটি গুরুতর প্রতিকূল পরিস্থিতি। অপরাধের প্রকৃতি এই মামলাটিকে ‘বিরলের মধ্যে বিরল’ দিকে নিয়ে যায়।

চার দোষীর সকলের জন্যই মৃত্যুদণ্ড চেয়েছিল দিল্লি পুলিশ। তাদের যুক্তি ছিল, অঙ্কিত শর্মার ওপর নিরন্তর হামলা চালানোর সময় তারা ‘পশুর পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল’। সরকারি আইনজীবী মধুকর পাণ্ডে আদালতে বলেন, “অঙ্কিত শর্মাকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। দোষীরা তাঁর প্রতি কোনও দয়া দেখায়নি। যাঁরা আজ দয়া চাইছেন, তাদের নিজেদেরই দয়া দেখানো উচিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। কেউ অঙ্কিতকে হাসপাতালে পর্যন্ত নিয়ে যায়নি। এত নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর আজ তারা দয়া চাইছেন।”

হত্যার নৃশংসতা সম্পর্কে এত কঠোর পর্যবেক্ষণ সত্ত্বেও আদালত মৃত্যুদণ্ড দিতে অস্বীকার করেছে। আদালতের বক্তব্য, “বিশেষ সরকারি কৌঁসুলির এই বক্তব্যের সঙ্গে আমি একমত হতে পারছি না যে দোষীরা সংশোধনের অতীত। অথবা তাদের চরিত্র এতটাই পাশবিক যে কারাগারে থাকলেও তারা সমাজের জন্য বিপজ্জনক হয়ে থাকবে।” 

এই বিষয়ে বিচারকের বক্তব্য, মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে আইনের শেষ যে পরীক্ষাটি করতে হয় তা হল— দোষীদের সংশোধনের কোনও সম্ভাবনা নেই এবং তাদের পুনর্বাসনের কোনও সুযোগ আছে কি না। এর পরেই আদালত জানায়, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী, শেষ অবলম্বন মৃত্যুদণ্ড। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষ এমন কোনও তথ্য আদালতের কাছে উপস্থাপন করতে পারেনি যা প্রমাণ করে যে দোষীদের মধ্যে কারও হিংস্র মানসিকতা রয়েছে। অথবা ভবিষ্যতেও এমন অপরাধ করতে পারে।

আদালত স্বীকার করেছে যে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৪৯ ধারার অধীনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে আদালত জানায়, মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে এর চেয়ে অনেক বেশি কঠোর মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। আদালত বলে,  এই অপরাধগুলি আইনকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে। জীবন ও সম্পত্তির প্রতি চরম অবহেলা দেখিয়ে সংঘটিত করা হয়েছে। বিচারক স্পষ্ট করে দেন যে, যেসব অপরাধে দোষীরা দোষী সাব্যস্ত হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে তাদের আইনের পূর্ণ কঠোরতার মুখোমুখি হতে হবে।

বিচারক বলেন, “আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে পারছি না যে দোষীরা সংশোধনের অতীত। তাদের চরিত্র এতটাই পাশবিক যে কারাগারে থাকলেও তারা সমাজের জন্য বিপজ্জনক হবে তা-ও মনে করছি না। তবে যেসব অপরাধে তারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে তাদের আইনের পূর্ণ কঠোরতার মুখোমুখি হতে হবে।”

বিচারক আরও বলেন, “এটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধের একটি ঘটনা। আইবি আধিকারিক অঙ্কিত শর্মাকে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়েছে।তাঁর মৃতদেহকে পশুর দেহের মতো ফেলে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনা সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। গোটা অপরাধ যেভাবে সংঘটিত হয়েছে, তা সমাজকে আত্মসমালোচনায় বাধ্য করেছে।”

রায়ে আদালত জানিয়েছে, তাহির হোসেন এমন একটি ভারী অস্ত্র-সহ দলবল নিয়ে জড়ো হয়েছিল। এরা হিন্দুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর উদ্দেশ্যে নিয়েই জড়ো হয়েছিল। দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট চালানোর উদ্দেশ্যে নিয়েই এসেছিল। রাষ্ট্রপক্ষ এটা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে তাহিরের দলবল জানত, তাদের অভিন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সময় কারও মৃত্যু ঘটতে পারে। আবার কাউকে হত্যা করাও হতে পারে। এরই মাঝে আইবির আধিকারিক অঙ্কিত শর্মাকে ‘নৃশংস ভাবে’ হত্যা করেছিল।

তাহির হেসেনকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ (খুন), ৩৬৫ (গোপনে ও বেআইনি ভাবে আটক করার উদ্দেশ্যে অপহরণ), ১৪৭ (দাঙ্গা), ১৪৮ (প্রাণঘাতী অস্ত্র নিয়ে দাঙ্গা), ১৫৩এ (দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ানো) এবং ১৮৮ (সরকারি কর্মচারীর জারি করা আদেশ অমান্য করা) ধারায়, ১৪৯ (বেআইনি জমায়েত)-এর অধীনে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তবে আদালত তাহির হেসেনকে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং প্ররোচনার অভিযোগ থেকে খালাস দেয়। পাশাপাশি এই নারকীয় ঘটনার আরও ছ’জন সহ-অভিযুক্তকেও আদালত বেকসুর খালাস করে দিয়েছে। 


Share