Indian Railways

রেলের এক হাজার ৬৮ হেক্টর জমি এখনও জবরদখলের কবলে! আয়তনে প্রায় ৪২টি নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের সমান, পাঁচ বছরে বেড়েছে অবৈধ দখল, আরটিআইয়ে উদ্বেগজনক তথ্য

এর ফলে নতুন রেললাইন, স্টেশন সম্প্রসারণ ও অন্যান্য পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজে বড় বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে এশিয়ার বৃহত্তম রেল নেটওয়ার্ককে।

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, দিল্লি
  • শেষ আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৬ ০৩:১৬

ভারতীয় রেলের বিপুল পরিমাণ জমি এখনও বেআইনি দখলের কবলে। দেশের অন্যতম বৃহৎ সরকারি সম্পদ হওয়া সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে রেলের বিস্তীর্ণ জমি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে একাংশ মানুষ। এর ফলে নতুন রেললাইন, স্টেশন সম্প্রসারণ ও অন্যান্য পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজে বড় বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে এশিয়ার বৃহত্তম রেল নেটওয়ার্ককে।

সম্প্রতি তথ্যের অধিকার আইনে প্রকাশিত রেল বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ভারতীয় রেলের মোট এক হাজার ৬৮.৫৪ হেক্টর জমি বেআইনিভাবে দখল হয়ে রয়েছে। আয়তনের নিরিখে এই জমি প্রায় ৪২টি নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামের সমান। একই জায়গায় প্রায় এক হাজার ৪৯৬টি ফিফা মানের ফুটবল মাঠ তৈরি করা সম্ভব।

এতেই শেষ নয়। রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে রেলের জমি অবৈধ দখলের প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জবরদখলের পরিমাণ আগের তুলনায় প্রায় ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে রেলের বিপুল পরিমাণ জমির নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

আরটিআইয়ের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে অবৈধ দখলে থাকা রেলের জমির পরিমাণ এতটাই বিশাল যে সেখানে বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিকেট স্টেডিয়াম নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের মতো প্রায় ৪২টি স্টেডিয়াম নির্মাণ করা সম্ভব। উল্লেখ্য, আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম প্রায় ৬৩ একর বা প্রায় ২৫.৫ হেক্টর জমির উপর বিস্তৃত। একইভাবে, জবরদখল হওয়া এই জমির আয়তন ফিফা মানের প্রায় এক হাজার ৪৯৬টি ফুটবল মাঠের সমান বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রেল বোর্ডের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে রেলের জমি জবরদখলের চিত্র উদ্বেগজনক। ২০২০-২১ অর্থবর্ষে অবৈধ দখলে থাকা জমির পরিমাণ ছিল ৮১০.৩১ হেক্টর। ২০২১-২২ সালে তা সামান্য কমে দাঁড়ায় ৭৮২.৮১ হেক্টরে। তবে এরপর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে জবরদখল বেড়ে পৌঁছোয় এক হাজার ৭৮.৫৫ হেক্টরে, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরের অর্থবর্ষ অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে এই পরিমাণ সামান্য কমে এক হাজার ৬৮.৫৪ হেক্টর হলেও, রেলের বিপুল পরিমাণ জমি এখনও অবৈধ দখলে থাকায় পুরো পরিস্থিতি যথেষ্ট উদ্বেগের বলে মনে করা হচ্ছে।

সংসদে রেল মন্ত্রকের পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল পর্যন্ত ভারতীয় রেলের মোট জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪.৯৯ লক্ষ হেক্টর। এর মধ্যে এক হাজার ৬৮ হেক্টর জমি অবৈধ দখলের আওতায় রয়েছে, যা মোট জমির প্রায় ০.২১ শতাংশ। শতাংশের হিসেবে এই পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম মনে হলেও, বাস্তবে দখল হওয়া জমির পরিমাণ যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য।

রেল বোর্ডের তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে ৯৮.০২ হেক্টর জমি দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তবে একই সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন করে আরও জমি দখল হয়ে যাওয়ায় অবৈধ দখলের সমস্যা এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।

রেল মন্ত্রকের বক্তব্য, উদ্ধার হওয়া জমি নতুন রেললাইন, মালবাহী ও যাত্রী টার্মিনাল, রেল ওয়ার্কশপ-সহ বিভিন্ন রেল পরিকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার করা হবে। যে জমিগুলির তাৎক্ষণিকভাবে রেলের প্রয়োজন নেই, সেগুলি বাণিজ্যিক উন্নয়নের উদ্দেশ্যে রেল ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটির কাছে হস্তান্তর করা হবে।

উল্লেখ্য, আরটিআই আবেদনে গত ২৫ বছরে রেলের জমি দখলের পরিসংখ্যান চাওয়া হয়েছিল। তবে রেল বোর্ড জানিয়েছে, তাদের কাছে মাত্র গত পাঁচ বছরের তথ্য সংরক্ষিত থাকে। ফলে গত ২৫ বছরের সামগ্রিক প্রবণতা বা পরিবর্তনের বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়।

এ ছাড়া, কোন রাজ্যে বা কোন অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি রেলের জমি দখল হয়েছে, সেই সংক্রান্ত কোনও কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারও রেল বোর্ডের কাছে নেই। বোর্ডের বক্তব্য, রাজ্য বা জোনভিত্তিক তথ্য জানতে হলে সংশ্লিষ্ট জোনাল রেলের পাবলিক ইনফরমেশন অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। অর্থাৎ, সারা দেশের রেল জমি দখলের তথ্য একত্রিত করে রাখার মতো কোনও কেন্দ্রীয় ডেটাবেস বর্তমানে রেল বোর্ডের কাছে নেই।

রেল বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন রেললাইন নির্মাণ, ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডর, স্টেশনের আধুনিকীকরণ এবং অন্যান্য পরিকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিপুল পরিমাণ জমির প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে রেলের নিজস্ব জমিতে অবৈধ দখল ভবিষ্যতের উন্নয়ন প্রকল্পগুলির অন্যতম বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি, হালনাগাদ তথ্যের অভাব এবং রাজ্যভিত্তিক কেন্দ্রীভূত জমির রেকর্ড না থাকায় সমস্যার প্রকৃত পরিসর নির্ধারণ ও কার্যকর সমাধানের পরিকল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।


Share