Narendra Modi

ভারতীয় রেলে যুক্ত নতুন পালক, মোদীর হাত ধরে উদ্বোধন দেশের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন, ধোঁয়া নয় নির্গত হবে শুধু জলীয় বাষ্প

হরিয়ানার জিন্দ-সোনিপত রেলপথে এই বিশেষ ট্রেনের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটে চলবে সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত ট্রেন, যা যাত্রীদের দেবে আরও পরিচ্ছন্ন, নীরব ও পরিবেশবান্ধব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা।

হাইড্রোজেন-চালিত ট্রেনের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
নিজস্ব সংবাদদাতা, হরিয়ানা
  • শেষ আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২৬ ০২:৩৮

ভারতীয় রেলের ইতিহাসে শুরু হল এক নতুন অধ্যায়। পরিবেশবান্ধব ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে দেশের মাটিতে আত্মপ্রকাশ করল ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন-চালিত ট্রেন। হরিয়ানার জিন্দ-সোনিপত রেলপথে এই বিশেষ ট্রেনের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটে চলবে সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত ট্রেন, যা যাত্রীদের দেবে আরও পরিচ্ছন্ন, নীরব ও পরিবেশবান্ধব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা।

উদ্বোধনের আগে সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্স হ্যান্ডেলে  প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লেখেন, 'এই বিশেষ ট্রেন রয়েছে এমন অল্প কয়েকটি দেশের এলিট গ্রুপে জায়গা করে নিল ভারত। রেলের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ব্যবহারে এই পদক্ষেপ দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।' এই পরীক্ষামূলক পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতে সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত রেল পরিষেবার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হল। ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব রেল যোগাযোগের প্রসারে এই উদ্যোগ নতুন দিগন্ত খুলে দেবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

সাধারণ ডিজেল বা বৈদ্যুতিক ট্রেনের তুলনায় এই হাইড্রোজেনচালিত ট্রেনের প্রযুক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এতে অত্যাধুনিক হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রেনের মধ্যেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। ট্রেনটি চালানোর জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে ১২০০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন 'প্রোটন এক্সচেঞ্জ মেমব্রেন ফুয়েল সেল'। উচ্চচাপে সংরক্ষিত হাইড্রোজেন গ্যাস বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে, আর সেই বিদ্যুৎই ট্রেনের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।

এই ট্রেনের বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোনও ধোঁয়া বা ক্ষতিকর কার্বন নির্গমন হয় না। ফুয়েল সেল থেকে উৎপন্ন একমাত্র উপজাত হলো বিশুদ্ধ জলীয় বাষ্প এবং সামান্য তাপ, যা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। একই সঙ্গে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ট্রেনের লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারিতে সঞ্চিত থাকে। এই হাইব্রিড ব্যবস্থা প্রয়োজনের সময় অতিরিক্ত শক্তি জোগায়, ফলে ট্রেনের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, গতি বজায় থাকে এবং জ্বালানির ব্যবহার আরও সাশ্রয়ী হয়।

১০ কোচের এই অত্যাধুনিক ট্রেনে থাকবে দু'টি ড্রাইভিং পাওয়ার কার এবং আটটি ট্রেলার কোচ। একসঙ্গে প্রায় দু'হাজার ৬০০ জন যাত্রী বহনের ক্ষমতা রয়েছে এই ট্রেনের। ট্র্যাকে সর্বোচ্চ পরিচালনগত গতি ঘণ্টায় ৭৫ কিলোমিটার হলেও, ট্রেনটির নকশাগত সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার। নতুন এই হাইড্রোজেনচালিত ট্রেনটি জিন্দ জংশন, গোহানা জংশন এবং সোনিপতের মধ্যে চলাচল করবে। পথে জিন্দ সিটি, পান্ডু পিন্ডারা জংশন, ললিত খেরা হল্ট, ভাম্ভেওয়া, ইসাপুর খেরি হল্ট, বুটানা হল্ট, খান্দ্রাই হল্ট, রাবরা হল্ট, লাঠ হল্ট, মোহানা এবং বারওয়াসনি হল্ট স্টেশনে নির্ধারিতভাবে থামবে।

এই প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে হরিয়ানার জিন্দে গড়ে তোলা হয়েছে দেশের বৃহত্তম হাইড্রোজেন সংরক্ষণ ও রিফুয়েলিং স্টেশন। প্রায় তিন হাজার কিলোগ্রাম হাইড্রোজেন সংরক্ষণের সক্ষমতাসম্পন্ন এই কেন্দ্রকে ইতিমধ্যেই পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভস সেফটি অর্গানাইজেশন অনুমোদন দিয়েছে।

এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপের মাধ্যমে হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন পরিচালনাকারী বিশ্বের নির্বাচিত কয়েকটি দেশের কাতারে জায়গা করে নিল ভারত। এর আগে জার্মানি, জাপান, চিন এবং আমেরিকা পরিবেশবান্ধব এই প্রযুক্তির ব্যবহারে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা নিয়েছিল। ২০২২ সালে জার্মানিই প্রথম দেশ হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে অ্যালস্টম করাদিয়া আইলিন্ট হাইড্রোজেন ট্রেন চালু করে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও কোনও রকম আপস করেনি ভারতীয় রেল। ট্রেনজুড়ে বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক হাইড্রোজেন লিক ডিটেক্টর, ফ্লেম ডিটেকশন সিস্টেম এবং স্বয়ংক্রিয় গ্যাস শাট-অফ ভালভ। পাশাপাশি লোকো পাইলটদের জন্য রাখা হয়েছে রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা, যাতে প্রতিটি মুহূর্তে ট্রেনের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করা যায়। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত এই হাইড্রোজেন ট্রেন শুধু পরিবেশবান্ধব পরিবহণের নতুন অধ্যায়ই নয়, আত্মনির্ভর ভারতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতারও এক উজ্জ্বল নিদর্শন।


Share