Premananda Maharaj

উত্তরপ্রদেশে প্রেমানন্দ মহারাজের প্রাণনাশের আশঙ্কা! যোগী আদিত্যনাথকে চিঠি, মথুরার আশ্রম ঘিরে ‘মাফিয়া’ যোগের অভিযোগ

যোগী আদিত্যনাথের ওপর আস্থা প্রকাশ করে দীনেশ বলেন, “আমাদের মুখ্যমন্ত্রী সাধু-সন্তদের রক্ষাকর্তা। তিনি অত্যন্ত ভালো মুখ্যমন্ত্রী। আমাদের বিশ্বাস, তিনি অবশ্যই মহারাজের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবেন।”

প্রেমানন্দ মহারাজ।
নিজস্ব সংবাদদাতা, উত্তরপ্রদেশ
  • শেষ আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৫৭

প্রেমানন্দ মহারাজের নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি উঠল। তাঁকে ঘিরে নিরাপত্তার উদ্বেগ প্রকাশ করে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে চিঠি লিখেছেন শ্রীকৃষ্ণ জন্মভূমি সংঘর্ষ ন্যাসের সভাপতি দীনেশ শর্মা। তাঁর অভিযোগ, মথুরার আশ্রমকে কেন্দ্র করে দুটি পৃথক গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে একটি গোষ্ঠীতে জমি দখল এবং শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা রয়েছেন বলে দাবি করেছেন তিনি। এমনকী, ওই গোষ্ঠীর সদস্যদের থেকে প্রেমানন্দ মহারাজের প্রাণের আশঙ্কা রয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেছেন দীনেশ। অন্য দিকে, কয়েক দিন আগেই মহারাজের ২৫ বছর বয়সি শিষ্য দীপক লোধি ওরফে রসিক দুলারি শরণের বৃন্দাবনে রহস্যমৃত্যু হয়েছে। সেই মৃত্যুর তদন্ত করছে পুলিশ।

উত্তরপ্রদেশের মথুরা ও বৃন্দাবন দীর্ঘদিন ধরেই হিন্দুদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিশেষ করে বৃন্দাবনের আধ্যাত্মিক গুরু প্রেমানন্দ মহারাজের জনপ্রিয়তা বর্তমানে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর প্রবচন, ভক্তিমূলক আলোচনা এবং আধ্যাত্মিক উপদেশ শুনতে প্রতিদিনই বহু ভক্ত ভিড় করেন। তবে এ বার সেই জনপ্রিয় আধ্যাত্মিক গুরুর নিরাপত্তা নিয়েই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। আশ্রমের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, একাধিক গোষ্ঠীর সক্রিয়তা এবং অপরাধমূলক কার্যকলাপের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে।

শ্রীকৃষ্ণ জন্মভূমি সংঘর্ষ ন্যাসের সভাপতি দীনেশ শর্মা উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে চিঠি লিখে প্রেমানন্দ মহারাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে একাধিক ছোট-বড় আশ্রমের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছেন। তাঁদের কার্যকলাপের ফলে প্রেমানন্দ মহারাজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দীনেশ শর্মা।

দীনেশ শর্মার দাবি, প্রেমানন্দ মহারাজকে কেন্দ্র করে বর্তমানে দুটি পৃথক গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। একটি গোষ্ঠীতে রয়েছেন প্রকৃত সাধুসন্তরা, যাঁরা আধ্যাত্মিক সাধনা, প্রার্থনা এবং তপস্যার মধ্যে নিজেদের জীবন অতিবাহিত করছেন। অন্য দিকে, দ্বিতীয় গোষ্ঠীতে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁরা সাধুর পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ।

সংবাদসংস্থা আইএএনএস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দীনেশ শর্মা বলেন, প্রকৃত সাধুসন্তরা আশ্রম থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে যমুনার তীরে প্রেমানন্দ মহারাজের সঙ্গে রয়েছেন। সেখানে তাঁরা নিয়মিত প্রার্থনা, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং তপস্যায় মগ্ন থাকেন। অন্য দিকে, দ্বিতীয় গোষ্ঠীর মধ্যে জমি দখল এবং শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি অনুপ্রবেশ করেছেন বলে তাঁর অভিযোগ। এই গোষ্ঠীটি প্রেমানন্দ মহারাজের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১৫টি ছোটবড় আশ্রমের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।

প্রেমানন্দ মহারাজের আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত জমি ও সম্পত্তি নিয়েও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন দীনেশ শর্মা। তাঁর দাবি, দ্বিতীয় গোষ্ঠীর সদস্যরা যমুনার বন্যাপ্রবণ এলাকার বিপুল পরিমাণ জমি বিক্রি করে প্রচুর সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। জমি দখল এবং বেআইনি লেনদেনের মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের আর্থিক ও সাংগঠনিক প্রভাব বাড়িয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা, এই গোষ্ঠীর প্রভাব ক্রমশ বাড়তে থাকায় প্রেমানন্দ মহারাজের নিরাপত্তা নিয়েও বিপদ তৈরি হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখতে প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন দীনেশ শর্মা। একই সঙ্গে আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কার্যকলাপ তদন্তের আওতায় আনার আবেদন জানিয়েছেন তিনি। যোগী আদিত্যনাথের ওপর আস্থা প্রকাশ করে দীনেশ বলেন, “আমাদের মুখ্যমন্ত্রী সাধু-সন্তদের রক্ষাকর্তা। তিনি অত্যন্ত ভালো মুখ্যমন্ত্রী। আমাদের বিশ্বাস, তিনি অবশ্যই মহারাজের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবেন।”

প্রেমানন্দ মহারাজের বিপুল জনপ্রিয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন দীনেশ শর্মা। তাঁর দাবি, লক্ষ লক্ষ মানুষ মহারাজের বক্তব্য ও আধ্যাত্মিক শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হন। বহু সনাতন হিন্দুর কাছে তিনি আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। ফলে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন তিনি।

শুধু জমি দখল বা আশ্রমের নিয়ন্ত্রণ নয়, আশ্রমের আশপাশে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্ব্যবহার এবং বিশৃঙ্খলার ঘটনাও বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দীনেশ। তাঁর দাবি, একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিজেদের লোকজনকে ভিড়ের মধ্যে পাঠিয়ে ইচ্ছাকৃত ভাবে অশান্তি সৃষ্টি করছে। এই গোষ্ঠীকে ‘মাফিয়া’ বলে উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেছেন, আশ্রমের পরিবেশ নষ্ট করা এবং সাধুসন্তদের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই তাদের উদ্দেশ্য।

দীনেশ শর্মার কথায়, এই মাফিয়া গোষ্ঠী ভিড়ের মধ্যে নিজেদের লোক পাঠিয়ে গুন্ডামি করায়। সাধুদের খুন করা হচ্ছে, শিশুরা নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। এই সমস্ত ঘটনার পিছনে ওই মাফিয়া গোষ্ঠী রয়েছে। তবে দীনেশ শর্মার এই সমস্ত অভিযোগের সপক্ষে এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনও প্রমাণ মেলেনি। নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও প্রতিষ্ঠিত নয়। ফলে তদন্তের আগে এই দাবিগুলিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এ দিকে, প্রেমানন্দ মহারাজের আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে উদ্বেগের আবহে সামনে এসেছে ১৭ বছরের শিষ্য অনুজ চৌধুরীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও। গত জুলাই মাসে প্রেমানন্দ মহারাজের কাছ থেকে দীক্ষা নেওয়ার পর নিখোঁজ হয়ে যায় অনুজ। এরপর তার পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং তাকে খুঁজে বের করার দাবিতে বিক্ষোভ দেখান। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে। পরে মথুরার বরসানা এলাকার অন্য একটি আশ্রম থেকে অনুজকে খুঁজে পাওয়া যায়। যদিও এই ঘটনার সঙ্গে দীনেশ শর্মার অভিযোগ করা গোষ্ঠীর কোনও যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

প্রেমানন্দ মহারাজকে ঘিরে নিরাপত্তার দাবি ওঠার কয়েক দিন আগেই বৃন্দাবনে তাঁর এক শিষ্যের মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছিল। মৃত শিষ্যের নাম দীপক লোধি, যিনি রসিক দুলারি শরণ নামেও পরিচিত ছিলেন। ২৫ বছর বয়সি এই যুবক মধ্যপ্রদেশের জবলপুরের বাসিন্দা ছিলেন।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ সেপ্টেম্বর বৃন্দাবনের গুরু কৃপা কুঞ্জের চারতলা থেকে পড়ে গুরুতর জখম হন দীপক। দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। প্রাথমিকভাবে পুলিশ আত্মহত্যার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে শুরু করে। তবে পরবর্তী সময়ে সিসি ফুটেজ এবং অন্যান্য তথ্য সামনে আসায় তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়।

দীপক লোধির মৃত্যুর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ। তদন্তকারীদের হাতে আসা ফুটেজে দেখা যায়, নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে চারতলার ছাদে পৌঁছেছিলেন তিনি। এরপর ছাদ থেকে নীচে পড়ে যান। ২ অক্টোবর প্রকাশ্যে আসা নতুন একটি ভিডিয়োতে আরও কিছু তথ্য সামনে এসেছে। ওই ফুটেজে দেখা যায়, ছাদের উপর প্রায় ১১ সেকেন্ড বসেছিলেন দীপক। এরপর তিনি উঠে দাঁড়িয়ে ছাদ থেকে ঝাঁপ দেন।

এই ভিডিয়োতে আরও এক শিষ্যকে ছাদের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা গিয়েছে। দীপকের পড়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ আগেই ওই ব্যক্তিকে ছাদের দিকে যেতে দেখা যায় বলে জানা গিয়েছে। এই দৃশ্য সামনে আসার পর তদন্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ঠিক কী কারণে দীপক ছাদে গিয়েছিলেন? তাঁর সঙ্গে অন্য কারও কোনও কথাবার্তা বা বিরোধ হয়েছিল কি না? তাঁর মৃত্যুর আগে কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

দীপক লোধির মৃত্যুর তদন্তে তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্ন এবং ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া একটি গ্রাইন্ডার নিয়েও তদন্ত করছে পুলিশ। তদন্তকারীরা তাঁর গোপনাঙ্গে আঘাতের বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। কীভাবে ওই আঘাত লেগেছিল, মৃত্যুর সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা জানার চেষ্টা চলছে। এছাড়াও তাঁর ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া গ্রাইন্ডারটির ফরেনসিক পরীক্ষা করা হচ্ছে। ওই যন্ত্রের সঙ্গে ঘটনার কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা জানার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছেন তদন্তকারীরা।

পাশাপাশি দীপকের মোবাইল ফোনের ডিজিটাল তথ্যও পরীক্ষা করা হচ্ছে। তাঁর ফোন থেকে মুছে ফেলা চ্যাট, ভিডিয়ো এবং অন্যান্য তথ্য উদ্ধার করার চেষ্টা চলছে। তদন্তকারীদের ধারণা, মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে কারও যোগাযোগ হয়েছিল কি না, কোনও বিরোধ বা মানসিক চাপের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কি না, সে সম্পর্কে ফোনের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই সমস্ত বিষয় নিয়ে নিশ্চিত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।

সব মিলিয়ে, বৃন্দাবনে প্রেমানন্দ মহারাজের আশ্রমকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা, সম্পত্তি এবং শিষ্যদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দেওয়ার পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। তবে দীনেশ শর্মার তোলা অভিযোগগুলি এখনও প্রমাণিত নয়। একইভাবে, দীপক লোধির মৃত্যুর কারণও এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

প্রেমানন্দ মহারাজকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এবং তাঁর শিষ্যের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে নানা প্রশ্ন উঠলেও দুটি ঘটনার মধ্যে এখনও কোনও প্রতিষ্ঠিত যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। একদিকে আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জমি দখল ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন, অন্যদিকে দীপক লোধির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করাও পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তের অগ্রগতি এবং প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর রয়েছে।


Share